বাসস

  ১৪ অক্টোবর, ২০২১

আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

যতই ঝুঁকি আসুক উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হবে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সবাইকে দুর্যোগের ঝুঁকি বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। এই দেশটা আমাদের, কাজেই যত ঝুঁকি আসুক দেশের উন্নয়ন আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হবে। দারিদ্র্যের হাত থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে হবে।’ জাতির পিতার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের বিখ্যাত উক্তি- ‘আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না’র উদ্ধৃতি তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘যত দুর্যোগই আসুক বাঙালিকে, বাংলাদেশকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না- এটাই হচ্ছে আমাদের কথা।’

শেখ হাসিনা গতকাল বুধবার সকালে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) ৫০ বছর পদার্পণ ও আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস-২০২১ উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন।

তিনি গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানের অন্যপ্রান্তে মুক্তিযোদ্ধা মাঠ কক্সবাজার প্রান্তও সংযুক্ত ছিল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ সারা বিশ্বে আজকে দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি আদর্শ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আমাদের এই সম্মান যাতে বজায় থাকে সেজন্য ভবিষ্যতে সে বিষয়েও সবাইকে সচেতন থাকতে হবে এবং এ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে।’

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর সংসদে আওয়ামী লীগের এই নিয়ে কথা তোলার পরিপ্রেক্ষিতে সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উক্তি ‘যত মানুষ মরার কথা ছিল তত মানুষ মারা যায় নাই’ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই কথা জীবনে যেন আর শুনতে না হয় সেজন্য সবাইকে সচেতন থাকতে হবে এবং মানুষকে সচেতন করতে হবে।’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান এবং ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসীন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে চারটি ইউনিটেরও উদ্বোধন করেন। এগুলো হচ্ছে- দ্রুত সাড়াদান ইউনিট, পানি থেকে উদ্ধার ইউনিট, অতি জোয়ার মনিটরিং ও সাড়াদান ইউনিট এবং খেলায় খেলায় দুর্যোগ প্রস্তুতি ইউনিট (স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে জনসচেতনতামূলক)। এ ছাড়া, ‘দুর্যোগ সহনশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণে শেখ হাসিনা’ শীর্ষক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাবিষয়ক একটি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন তিনি এবং দুর্যোগ প্রশমনবিষয়ক আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচেষ্টা সম্পর্কিত ভিডিও চিত্র ‘দুর্যোগ প্রশমনের ৫০ বছর বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা’ শীর্ষক ভিডিও চিত্র অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ডা. এনামুর রহমান সিপিপির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তিনজন সংগঠক এবং ছয়জন স্বেচ্ছাসেবক নারী-পুরুষকে আজীবন সম্মাননা দেন।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব ড. আহমদ কায়কাউস গণভবন প্রান্ত থেকে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, সংসদ সদস্য, তিনবাহিনীর প্রধানসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিদেশি কূটনীতিক ও মিশন প্রধান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

সরকার প্রধান বলেন, ‘আগামীতে বাংলাদেশ উন্নতসমৃদ্ধ দেশ হিসেবে যে এগিয়ে যাবে সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি রেখেই আমরা বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করে দিয়ে গেলাম। আওয়ামী লীগ সব সময় জনগণের পাশে আছে। দুর্যোগে আর কেউ না থাকুক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা সব সময় পাশে রয়েছেন।’

জাতির পিতা ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাসে ‘ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি)’ গ্রহণ করেন, যা আজ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু ঘূর্ণিঝড় থেকে জনগণের জানমাল রক্ষায় সে সময় ১৭২টি উঁচু মাটির কিল্লা তৈরি করেন, যা পরে জনগণ ‘মুজিব কিল্লা’ নামকরণ করেন। আমরা আগের মুজিব কিল্লাসমূহ সংস্কারসহ নতুন করে আরো ৩৭৮টি মুজিব কিল্লা নির্মাণ করছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিল গঠন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়ন করেছে এবং এ আইনের আওতায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর গঠন করেছে, যা দুর্যোগ মোকাবিলা, ঝুঁকি হ্রাসকরণ ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পাশাপাশি, সরকার ২০২১-২৫ সাল মেয়াদের জন্য জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভ্যন্তরীণ বাস্তুহারা মানুষের দুর্দশার বিষয়গুলো আমলে নিয়ে সরকার ২০১৫ সালে একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করে এবং জাতীয় রিজিলিয়েন্স পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক ও এসডিজির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।’

এই ব-দ্বীপ অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নে শতবর্ষ মেয়াদি ডেল্টা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ তার সরকার শুরু করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বন্যা আমাদের আসবেই, কাজেই বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা বা বন্যার সঙ্গে বসবাস করার অভ্যাস আমাদের করতে হবে। আমরা ২০২২ সালের মধ্যে ৫১০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিংয়ের পরিকল্পনা নিয়েছি এবং গ্রীষ্মকালে সেচের পানি সংরক্ষণের জন্য জলাধার নির্মাণ, ৪ হাজার ৮৮৩ কিলোমিটার খাল খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, সংস্কারসহ নানান প্রকল্প গ্রহণ করেছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাসে আমাদের সময়ে সারা দেশে ২৩০টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র ও ৩২০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। আরো ২২০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ও ৪২৩টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। ৬৪ জেলায় ৬৬টি জেলা ত্রাণ গুদাম কাম দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তথ্যকেন্দ্র স্থাপন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ভূমিকম্প ও নগর এলাকায় রাসায়নিক দুর্যোগসহ অগ্নিœকাণ্ড ঝুঁকিহ্রাস ও সাড়াদান কার্যক্রমে নতুন করে আমরা আরো ২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছি। এর আগে দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাসে ফায়ার সার্ভিস, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ও সহযোগী সংস্থার সক্ষমতা বাড়াতে যথাক্রমে ৬৯ কোটি এবং ২৩৪ কোটি টাকার সরঞ্জাম ক্রয় করেছি।’

জাতিসংঘের দুর্যোগ প্রশমন কার্যালয় (ইউএনডিআরআর) এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্বাচন করেছে- ‘দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাসে, কাজ করি একসঙ্গে’। আর আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসে এ বছর জাতীয়ভাবে প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘মুজিববর্ষের প্রতিশ্রুতি, জোরদার করি দুর্যোগ প্রস্তুতি।’

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close