রেজাউল করিম হীরা

  ১৬ আগস্ট, ২০১৬

এখনো সক্রিয় ২০ জঙ্গি সংগঠন

জামিন নিয়ে পলাতক তিন শতাধিক সদস্য

দেশে এখনো কমপক্ষে ২০টি জঙ্গি সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ছয়টি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এসব সংগঠনের প্রায় দুই হাজার সক্রিয় সদস্য বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছে বলে জানা গেছে। কিন্তু গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে আবার বিভিন্ন সময় জামিন নিয়ে পলাতক রয়েছে তিন শতাধিক সদস্য। গোয়েন্দা ও র‌্যাব সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্রগুলো বলছে, সক্রিয় জঙ্গি সংগঠনগুলো উগ্রবাদ ও জঙ্গি কর্মকা-ের অংশ হিসেবে সদস্য সংগ্রহের কাজ অব্যাহত রেখেছে। চলছে গোপনে আদর্শিক প্রশিক্ষণের কাজ। এজন্য তারা খুবই গোপনে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগও অব্যাহত রেখেছে। দেশজুড়ে চলা র‌্যাব ও পুলিশের জঙ্গিবিরোধী অভিযানের মুখে বারবার তাদের আস্তানা বদলের তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি এসব জঙ্গি সংগঠনের নেতারা ছদ্মবেশও নিয়েছে।

এ পর্যন্ত সরকার যে ছয়টি জঙ্গি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেছে, সেগুলো হলোÑজামা’আতুল মুজাহিদিন (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ (হুজি), আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এটিবি), জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), শাহাদত-ই-আল হিকমা ও হিযবুত তাহ্রীর। নিষিদ্ধের সময় তো বটেই এখনো এই ছয় সংগঠন তাদের সন্ত্রাসী কর্মকা- অব্যাহত রেখেছে। এদের মধ্যে ২০০৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সে সময়ের সরকার প্রথমে শাহাদাত-ই-আল হিকমা নামে জঙ্গি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করে। এরপর ২০০৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) ও জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশকে (জেএমজেবি) এবং ওই বছরের ১৭ অক্টোবর হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশকে (হুজিবি) নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর হিযবুত তাহ্রীরকে ও ২০১৫ সালের ২৫ মে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে (এটিবি) নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

এছাড়া হিযবুল মুজাহিদিন, আল্লাহর দল, শহীদ হামজা ব্রিগেড, হিযবুত তাওহীদ, আল হিকমা, তাআমীর উদ্দীন, লস্কর-ই-তৈয়বা, আসিফ রেজা কমান্ডো ফোর্স, জয়শ-ই-মোহাম্মদ, ইসলাম ও মুসলিম, তাসাউফ মহল ও সম্প্রতি খোঁজ পাওয়া আনসার আল ইসলামসহ দেশে অন্তত ২০টি জঙ্গি সংগঠন এখনো সক্রিয় রয়েছে বলে র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে।

জানা গেছে, ২০০৩ সালের শুরুর দিকে যাত্রা শুরু করে জামা’আতুল মুজাহিদিন (জেএমবি)। সংগঠনটির প্রধান ছিলেন শায়খ আবদুর রহমান। আর শুরা কমিটির প্রধান ছিলেন সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই। ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ এ দুই শীর্ষ নেতাসহ কয়েকজনের ফাঁসি কার্যকর করার পর অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে উগ্রপন্থি এই সংগঠনটি। সম্প্রতি গুলশানের অভিজাত রেস্টুরেন্ট হলি আর্টিজানে হামলা চালিয়ে ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনকে হত্যা ও ঈদের দিন শোলাকিয়ায় হামলার ঘটনার পর এই জঙ্গি সংগঠনটি আবার আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনায় জেএমবি জড়িত বলে দাবি করেছে পুলিশ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যেসব সন্দেহভাজন সংগঠন নিষিদ্ধ করার পর্যালোচনার তালিকায় আছে, তাদের মধ্যে অন্যতম হিযবুত তাওহীদ। দৈনিক বজ্রশক্তির উপদেষ্টা ও দৈনিক দেশেরপত্রের সাবেক সম্পাদক রুফায়দাহ পন্নীর হাত ধরেই যাত্রা শুরু করে কালো তালিকাভুক্ত এই সংগঠনটি। এখন আমির মসীহ-উর রহমান এবং ঢাকার আমির আলী হোসেন সংগঠনকে চাঙ্গা করে তুলেছেন।

২০০১ সালে ধানমন্ডিতে একটি সেমিনার আয়োজনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে হিযবুত তাহ্রীর। কিন্তু আন্তর্জাতিক ইসলামী সংগঠন হিসেবে পরিচিত হিযবুত তাহ্রীরের প্রতিষ্ঠা ১৯৫৩ সালে জেরুজালেমে। এই সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতার নাম তকিউদ্দিন আল নাভানী। অনেকটা প্রকাশ্যেই তৎপর রয়েছে এই সংগঠনটি। ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া যুবকদের টার্গেট করে তাদের কর্মতৎপরতা পরিচালিত হচ্ছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে।

২০০৪ সালে শাহাদাত-ই আল হিকমা নামের জঙ্গি সংগঠন গড়ে ওঠে। এর প্রতিষ্ঠাতা কাওসার হুসাইন সিদ্দিকী একই বছরের ৬ নভেম্বর নগরীতে সরকারের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে সংবাদ সম্মেলন করতে এসে পুলিশের হাতে বেশ কয়েকজন সহযোগীসহ ধরা পড়েন। এ নিয়ে সারা দেশে তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। সরকার ওই সময় জঙ্গি সংগঠন আখ্যায়িত করে সংগঠনটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদোহ মামলা হয়। তবে আদালত থেকে জামিন নেওয়ার পর সে গা ঢাকা দেয়। এরপর ২০১১ সালের ২৬ জুলাই শাহাদাত-ই-আল হিকমা প্রধান কাওসার হুসাইনকে রাজশাহী থেকে আবারো গ্রেফতার করে পুলিশ।

এর আগে ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আত্মপ্রকাশ হরকাতুল জিহাদ আল ইসলাম বা হুজির। কিন্তু ১৯৯৬ সালে কক্সবাজারের উখিয়ায় হুজির ৪১ সশস্ত্র নেতাকর্মী আটক হলে হোঁচট খায় সংগঠনের অগ্রযাত্রা। তবে প্রকাশ্যে আত্মপ্রকাশ করার ছয় বছর আগে আফগান মুজাহিদদের অন্যতম কমান্ডার পাকিস্তানি নাগরিক সাইফুল্লাহ আখারের নেতৃত্বে তারা গোপন তৎতপরতা চালায়।

এছাড়া শুরুতে জামায়াত উল মুসলেমিন নামের সংগঠনের আড়ালে চলে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের তৎপরতা। তবে ব্লগার রাজীব হায়দার খুনের ঘটনায় ২০১৩ সালে পাঁচজন গ্রেফতার হওয়ার পর জানা যায় সংগঠনের আসল নাম। গ্রেফতার হন এর প্রধান মুফতি জসিমউদ্দীন রাহমানী।

২০১৩ সালের শেষের দিকে চট্টগ্রামের নগরের ফয়’স লেক এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় বসে নতুন জঙ্গি সংগঠন শহীদ হামজা ব্রিগেড গঠন করে জঙ্গিরা। বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়ে কলেজ ও মাদরাসাপড়–য়া ছাত্রদের এই সংগঠনে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। পরে তাদের পাহাড়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো দাবি করে র‌্যাব। মাওলানা মোবারক ও আবদুল আজিজ নামে দুই জঙ্গি সংগঠনটি পরিচালনা করতেন।

র‌্যাব সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময় জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এসব সংগঠনের এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ১৮৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে জেএমবির সদস্যই ৬১০ জন। বাকিরা অন্য সংগঠনের। ২০১৩ সালে র‌্যাবের পক্ষ থেকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ও হিযবুত তাওহীদসহ অন্য জঙ্গি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেয়। এর মধ্যে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে নিষিদ্ধ করা হলেও হিযবুত তাওহীদকে নিষিদ্ধ করা হয়নি।

এ ব্যাপারে র‌্যাব সদর দফতরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, বিভিন্ন সময় জঙ্গি সংগঠনগুলোর প্রায় ১ হাজার ২০০ জঙ্গি সদস্যকে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়েছে র‌্যাব। কিন্তু শিক্ষিত উচ্চবিত্ত ঘরের আধুনিক তরুনদের টার্গেট করে কৌশলী হয়ে গোপনে এসব সংগঠন এখনোকাজ করে যাচ্ছে। তাদের ধরতে র‌্যাব এখন আরো বেশি সক্রিয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম (সিটি) ইউনিটের এক কর্মকর্তা জানান, নিষিদ্ধঘোষিত হওয়ায় জঙ্গি সংগঠনগুলো নতুন নতুন নামে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। এখনও দেশে জঙ্গি সংগঠন নামে বেনামে সক্রিয় রয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তৎপর থাকায় তারা প্রকাশ্যে আসার সুযোগ পাচ্ছে না। তবে সেব জঙ্গি সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে তারাই এখন বেশি সক্রিয় বলে ওই কর্মকর্তা দাবি করেন।

জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়া এসব জঙ্গি সংগঠনের তিন শতাধিক ভয়ংকর জঙ্গি জামিন নিয়ে পালিয়ে গেছেন। এর মধ্যে অন্তত দুই ডজন দুর্ধর্ষ জঙ্গি রয়েছে, যারা সমরাস্ত্র পরিচালনাসহ শক্তিশালী বিস্ফোরক তৈরিতে পারদর্শী। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন নামে জঙ্গি সংগঠনগুলোর উত্থানের নেপথ্যে জামিনে পলাতক দুর্ধর্ষ জঙ্গিরাই কলকাঠি নাড়ছে। এর মধ্যে জেএমবির ৬৭, জেএমজেবির ১৮, হরকাতুল জিহাদের ৩২, শাহাদত-ই-আল হিকমার ১২, হিযবুত তাহ্রীরের ৫২, আল হিকমার ১২, আসিফ রেজা কমান্ডো ফোর্সের ২৫, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ৩৮, হিযবুত তাওহীদের ১৫, লস্কর-ই-তৈয়বার ৩২, জয়শ-ই-মোহাম্মদের ২২ জন জামিন নিয়ে দীর্ঘদিন পলাতক রয়েছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, জামিন নিয়ে পলাতক এসব জঙ্গি সংগঠনগুলোর সদস্যরা বেরিয়ে আবারো জঙ্গি সংগঠনে জড়িয়ে পড়েছে। অনেকে জড়িত লিস্টেট ব্যক্তিদের খুনে। আত্মগোপনে গিয়ে সেখান থেকেই ফের সক্রিয় হয়ে জঙ্গি তৎপরতা চালাচ্ছে। মাসের পর মাস এরা আদালতে হাজিরাও দিচ্ছে না। ফলে জামিন বাতিল করে এসব জঙ্গির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করছেন আদালত।

জানতে চাইলে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম (সিটি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মাঝে মধ্যেই পলাতক জঙ্গিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের ফলে দেশে কোনো জঙ্গি সংগঠনই শক্তিশালী অবস্থানে নেই। তাদের গতিবিধির ওপর কঠোর নজরদারি রয়েছে। গত কয়েক বছরে কয়েকটি ডিসপারেট উগ্রপন্থি সংগঠনের কর্মকা- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশি নজরে রেখেছে। এর মধ্যে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ও জামা’আতুল মুজাহিদিনের (জেএমবি) নৃশংসতার ঘটনা বেশি।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist