মূসা কালিমুল্লাহ

  ১১ অক্টোবর, ২০২১

মতামত

গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের নোবেল বিজয়

নোবেল শান্তি পুরস্কার। যদিও প্রতিটি বিভাগের নোবেল পুরস্কার অতি মর্যাদাপূর্ণ কিন্তু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নোবেল শান্তি পুরস্কার অন্যান্য বিভাগ থেকে মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। যথারীতি প্রতি বছরের মতো এবারও শান্তিতে নোবেল ঘোষণা করা হয়েছে। গণতন্ত্র এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পূর্বশর্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় প্রচেষ্টার জন্য এ বছর যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য চূড়ান্তভাবে নাম ঘোষণা করা হয়েছে ফিলিপাইন এবং রাশিয়ান সাংবাদিক মারিয়া রেসা ও দিমিত্রি মুরাতভকে। ফিলিপাইন এবং রাশিয়ায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় সাহসী লড়াইয়ের জন্য নোবেল শান্তি কমিটি তাদের নাম ঘোষণা করে।

মারিয়া রেসা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যবহার করে ক্ষমতার অপব্যবহার, সহিংসতার ব্যবহার এবং তার জন্মস্থান ফিলিপাইনে বর্ধিত কর্তৃত্ববাদকে প্রকাশ করেছেন। ২০১২ সালে, তিনি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য একটি ডিজিটাল মিডিয়া কোম্পানি র‌্যাপলার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার তিনি এখনো প্রধান। একজন সাংবাদিক এবং র‌্যাপলারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে, রেসা নিজেকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার একজন নির্ভীক রক্ষক হিসেবে দেখিয়েছেন। র‌্যাপলার দুতার্তে শাসনের বিতর্কিত, হত্যাকারী মাদকবিরোধী অভিযানের ওপর সমালোচনা করেছেন। মাদকবিরোধী সহিংস যুদ্ধে তার বেশিরভাগ কাজকে কেন্দ্র করেছেন। নোবেল কমিটি উল্লেখ করেছে, তিনি কীভাবে ভুয়া খবর ছড়াতে, বিরোধীদের হয়রানি করতে এবং জনসাধারণের বক্তব্যে হেরফের করতে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে তাও নথিভুক্ত করেছেন। মৃত্যুর সংখ্যা এত বেশি যে, প্রচারণাটি দেশের নিজস্ব জনসংখ্যার বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধের অনুরূপ। মিসেস রেসা এবং র‌্যাপলার ভুয়া খবর ছড়ানোর জন্য, বিরোধীদের হয়রানি করতে এবং জনসাধারণের বক্তব্যে হেরফের করতে কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে তা নথিভুক্ত করেছেন। এ ছাড়া রেসা, একজন সাবেক সিএনএন ব্যুরো চিফ এবং টাইম পার্সন অব দ্য ইয়ার, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছেন এবং বলেছেন যে ডিউটার্টে তার নিউজ সাইটের সমালোচনামূলক প্রতিবেদনের কারণে তাকে লক্ষ্য করা হয়েছে। এই পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিককে গত বছর মানহানির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল এবং কারাগারে সাজা দেওয়া হয়েছিল, যা বিশ্বব্যাপী স্বাধীনতার জন্য একটি বড় আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি এই বছর নোবেলপ্রাপ্ত প্রথম নারী।

অন্য দিকে, দিমিত্রি আন্দ্রেইভিচ মুরাতভ কয়েক দশক ধরে রাশিয়ায় ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে বাকস্বাধীনতা রক্ষা করেছেন। ১৯৯৩ সালে, তিনি স্বাধীন সংবাদপত্র নোভাজা গেজেটার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ১৯৯৫ সাল থেকে তিনি মোট ২৪ বছর ধরে সংবাদপত্রের প্রধান সম্পাদক ছিলেন। ক্ষমতার প্রতি মৌলিকভাবে সমালোচনামূলক মনোভাব নিয়ে নোভাজা গেজেটা আজ রাশিয়ার সবচেয়ে স্বাধীন সংবাদপত্র। সংবাদপত্রের সত্য-ভিত্তিক সাংবাদিকতা এবং পেশাগত সততা এটিকে রাশিয়ান সমাজের নিন্দনীয় বিষয়গুলোর তথ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত করেছে যা অন্যান্য মিডিয়া দ্বারা খুব কমই উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৯৩ সালের শুরুর পর থেকে নোভাজা গাজেটা দুর্নীতি, পুলিশি সহিংসতা, বেআইনি গ্রেপ্তার, নির্বাচনী জালিয়াতি এবং ‘ট্রল কারখানা’ থেকে রাশিয়ার অভ্যন্তরে এবং বাইরে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর ব্যবহার পর্যন্ত সমালোচনামূলক নিবন্ধ প্রকাশ করেছে।

নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত এই দুই সাংবাদিক সম্পর্কে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির সভাপতি বেরিট রিস-অ্যান্ডারসেন বলেন, ‘একই সঙ্গে, তারা এমন সব সাংবাদিকের প্রতিনিধি যারা এই আদর্শের পক্ষে দাঁড়িয়ে এমন একটি বিশ্বে গণতন্ত্র এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ক্রমবর্ধমান প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘স্বাধীন, স্বাধীন এবং সত্য-ভিত্তিক সাংবাদিকতা ক্ষমতার অপব্যবহার, মিথ্যা এবং যুদ্ধের প্রচার থেকে রক্ষা করার জন্য কাজ করে।’

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে প্রধান সহায়ক ভূমিকা পালন করে তার মধ্যে অন্যতম মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিয়ে ইতিপূর্বে অনেক আন্তর্জাতিক ঘোষণা জারি করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে যেগুলো বিভিন্ন দেশ তাদের সংবিধানের মৌলিক অধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে লক্ষ্য করা গিয়েছে স্বৈরতন্ত্রের ভয়াল থাবা। যে থাবা মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে কুক্ষিগত করার ভয়ংকর অভিযাত্রায় মেতে উঠেছে। স্বৈরাচারী এই শাসকরা মিডিয়া এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্বকে করেছে তাদের হাতের পুতুল। টুটি ধরে চেপে ধরেছে তাদের কণ্ঠকে। রুদ্ধশ্বাস করেছে তাদের কণ্ঠস্বর। আর এই ভয়াল থাবা থেকে বাদ যায়নি প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ রাষ্ট্র ফিলিপাইন। ফিলিপাইনের কর্তৃত্ববাদী রদ্রিগো দুতার্তে সরকারের বিতর্কিত মাদকবিরোধী অভিযানে এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিংয়ের মাধ্যমে শত শত মানুষকে হত্যা এবং সরকারের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় ইতিপূর্বে র‌্যাপলারকে বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং প্রধান নির্বাহী রেসাকে সরকারের রোষানলে পড়তে হয়। কিন্তু তিনি থেমে থাকেনি বরং এইসব দুর্নীতি, অনিয়ম তুলে ধরেছেন সাহসিকতার সঙ্গে।

অন্য দিকে রাশিয়াতে ক্ষমতাসীনদলের নানা অনিয়ম, বিরোধীদলের প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণ, রাজনৈতিকভাবে বিরোধীদের দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে নিজেদের কলম চালানোর মাধ্যমে তারা উভয়ে একবিংশ শতাব্দীর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পথকে আরো দৃঢ় করেছেন। আর ২০২১ সালে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি কর্তৃক নোবেল শান্তি বিভাগে পৃথিবীর অন্যতম স্বাধীনতা হরণকারী তুই জনপদের সাংবাদিকদের সাহসিকতার স্বীকৃতি প্রদান করার মাধ্যমে নতুন করে যেন মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুসংহত করার পথকে অনেকাংশে মসৃণের দিকে ধাবিত করেছে। তাদের স্বীকৃতির ওপর ভিত্তি করে আবারও সম্ভাবনা জাগিয়েছে মাথা উঁচু করে কথা বলার, নিজের কণ্ঠস্বরকে পৌঁছে দেওয়ার স্বৈরতন্ত্রের কর্ণকুহরে। এই ঐতিহাসিক স্বীকৃতির ওপর ভিত্তি করে আবারও বেজে উঠুক ব্যক্তিস্বাধীনতার জয়গান। মতপ্রকাশ ফিরে পাক তার স্বাতন্ত্রতা এবং সার্বজনীনতা।

লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

[email protected]

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close