মো. রাশেদ আহমেদ

  ১১ অক্টোবর, ২০২১

বিশ্লেষণ

ত্রিদেশীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি ও এশিয়ার রাজনীতি

আফগান ইস্যুর পর বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে অন্যতম আলোচিত বিষয় হচ্ছে অকাস চুক্তি। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র ত্রিদেশীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি যা এরই মধ্যে অকাস (AUKUS) চুক্তি হিসেবে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের অভিমত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সাম্প্রতিক অকাস নামে প্রতিরক্ষা চুক্তির গুরুত্বভার সবচেয়ে বেশি। এই চুক্তির শিকড় অত্যন্ত গভীরে প্রথিত বলেই মনে হচ্ছে। যা এশিয়া কেন্দ্রিক বিশ্ব রাজনীতির নতুন সমীকরণ।

কার্যত, এই চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে ইন্দো প্যাসিফিক প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চল তথাকথিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সন্দেহ নেই, এই চুক্তির অন্তরালে রয়েছে চীনের হুমকি মোকাবিলা করে উক্ত অঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। অকাস চুক্তি মোতাবেক অস্ট্রেলিয়াকে পারমাণবিক চালিত সাবমেরিন তৈরিতে সার্বিক সহযোগিতা করবে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial intelligence) সাইবার নিরাপত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে সহযোগিতা করবে পারমাণবিক পরাশক্তি দুই দেশ। এর ফলে ক্যানবেরার সামরিক সক্ষমতা অনেকাংশ বেড়ে যাবে। বিশ্লেষকদের অভিমত, পারমাণবিক সাবমেরিন চুক্তির ফলে বিশ্বে নতুন করে পারমাণবিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা এই চুক্তিকে যুক্তরাজ্যকে নতুন করে পারমাণবিক যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনার কথা ব্যক্ত করেছেন। তবে বিশ্ব পুনরায় হিরোসিমা, নাগাসিমা যুগে যাবে কি না তা সময় বলে দিবে।

মূলত, ত্রিদেশীয় অকাস চুক্তিতে তীব্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অন্যতম দেশ ফ্রান্স। অপর দিকে চীন, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। কার্যত প্যারিস এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করার পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে ২০১৬ সালে করা ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ১২টি সাবমেরিন চুক্তি বাতিল করে অস্ট্রেলিয়া। এতে ফ্রান্সের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় চার হাজার কোটি মার্কিন ডলার। এ বিশাল আর্থিক ক্ষতি প্যারিস সহসাই মেনে নেবে না তা অনুমেয়। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাঁ ইউ লে দিয়াঁ এটিকে পিঠে ছুরিকাঘাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সেইসঙ্গে মিত্র এবং অংশীদারদের মধ্যে অগ্রহণযোগ্য আচরণ হিসেবে বর্ণনা করেন। অপরদিকে বেইজিং এই প্রতিরক্ষা চুক্তির সমালোচনা করে দায়িত্ব জ্ঞানহীন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। চীনের গ্লোবাল টাইমস পত্রিকা বলছে, অস্ট্রেলিয়া নিজ থেকে চীনের শত্রুতে পরিণত হলো। উল্লেখ্য বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের ৬৮টি রাশিয়ার ২৯টি, চীনের ১২ সাবমেরিন রয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের ১১ এবং ফ্রান্সের আটটি সাবমেরিন ব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করেছে। ধারণা করা হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া আগামীতে সপ্তম সাবমেরিন মালিক হওয়ার পথে একধাপ এগিয়ে গেল।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে অকাস প্রতিরক্ষা চুক্তি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? অথবা আগামীতে এশিয়া অঞ্চলের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব বিস্তার করবে। একটু পেছনে ফেরা যাক, আফগান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং শেষ মুহূর্তে প্রাণহানি প্রভৃতি কারণে জো বাইডেন প্রশাসন নিজ দেশে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বৈদেশিক রাজনীতিতে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। এমনকি পশ্চিমা গণমাধ্যম কাবুলে ওয়াশিংটনের কবর রচিত হয়েছে বলে উল্লেখ করে। সঙ্গত এই অবস্থায় সেনা প্রত্যাহারের মাত্র ১৫ দিন পর অকাস চুক্তি কিছুটা জো বাইডেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। যেখানে তিনি পরোক্ষভাবে চীনবিরোধী প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন। আলোচিত দ্য প্রিন্স বইয়ের লেখক ম্যাকেয়াভ্যালি উল্লেখ করেন, কোনো রাষ্ট্রের ব্যর্থতার পারদ চাপা দিতে নতুন কোনো ইস্যুকে সামনে আনা হয়। যাতে দেশটির জনগণ ব্যর্থতা ভুলে নতুন ইস্যুর প্রতি মনোনিবেশ করে। অনেকটা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো অবস্থা। জো বাইডেন প্রশাসন সেই নীতি বাস্তবায়ন করেছে বলে মনে হচ্ছে।

মূলত, বর্তমান মার্কিন নীতি সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ওয়াশিংটন সর্বদা চীনবিরোধী কিংবা চ্যালেঞ্জ জানানোর নীতি গ্রহণ করছে। গত এ-৭ সম্মেলনে ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রস্তাবক ছিল ই৩ড। যার লক্ষ্য ছিল কম উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আর্থিক সহায়তা প্রদান। যা চীনের বেল্ট রোডইনিশেয়েটিভ কর্মসূচির বিপরীত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তরঙ্গ বন্ধু যুক্তরাজ্য। যেকোনো ক্রান্তিকাল সময়ে প্রয়োজনে উভয় দেশ পাশে দাঁড়িয়েছে। তাদের বোঝাপড়া ও আন্তরিক সম্পর্কের ফল অকাস চুক্তি। যুক্তরাজ্য ইইউ থেকে প্রত্যাহারের পর এই বড় কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত হলো দেশটি। অর্থাৎ বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে এশিয়া অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলো লন্ডন। যদিও এই চুক্তি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে দেশটির জনগণ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেরেসার অভিমত, এই চুক্তির ফলে পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে ধাপিত হলো যুক্তরাজ্য। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অভিমত, অকাস চুক্তিতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে অস্ট্রেলিয়া। দেশটির সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে আঞ্চলিক প্রভাব। অর্থাৎ এশিয়া অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে কদর বাড়বে ক্যানবেরার তা অনুমেয়। তবে অস্ট্রেলিয়ার প্রধান চ্যালেঞ্জ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। কার্যত, দেশটি পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির স্বাক্ষরকারী একটি দেশ। এখন দেখার বিষয় অস্ট্রেলিয়া পরমাণু উচ্চাভিলাষ অর্জনে আগ্রহী হয়ে ওঠে কি না। এরই মধ্যে যদিও এমন সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন।

বলতে সংকোচ নেই, একটা চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হতে হলে বিভিন্ন সমীকরণ সমন্বয় কিংবা ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করতে হবে। এই পরীক্ষায় আপাতত উতরে গেলেও পরীক্ষিত দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অব্যাহত রাখাই এখন জোটটির প্রধান চ্যালেঞ্জ। স্পষ্ট করে বলতে গেলে, ফ্রান্সের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। তাদের দীর্ঘতর পথচলা বর্তমানের মতো এত ফাঁটল অবস্থা আগে কখনো সৃষ্টি হয়নি। মূলত, এই টানাপড়েন সম্পর্কের প্রধান কারণ যে অকাস চুক্তি তাতে বিন্দু পরিমাণ সন্দেহ। আশা করা যায়, বাইডেন প্রশাসন শিগগিরই সম্পর্ক মজবুত করতে ম্যাক্রোঁ প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় বসবে। তাতে বরফগলা সম্পর্ক হয়তো উষ্ণ হতে পারে। কিন্তু তাদের যে সন্দেহের বীজ অঙ্কুরোদগম তার রেশ থেকে যাবে দীর্ঘদিন। প্রসঙ্গত যে, ব্রিটেন ইইউ ত্যাগ করার পর মূলত ফ্রান্সকে জোটটির নেতা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। অপর দিকে ন্যাটোর সক্রিয় সদস্য প্যারিস। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্র যেকোনোভাবে ফ্রান্সের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে মরিয়া থাকবে তা সন্দেহাতীত।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, অকাস চুক্তি মূলত এশিয়াকেন্দ্রিক প্রশান্ত মহাসাগরীয় (ইন্দো প্যাসিফিক) অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য হলেও রাখা হয়নি এশিয়ার কোনো প্রতিনিধি। অথচ ওশেনিয়া ইউরোপ আর উত্তর আমেরিকা মহাদেশ থেকে এশিয়া অঞ্চলে শান্তির বার্তা পৌঁছাতে আগ্রহী অকাস জোট। সংগত যে, ওয়াশিংটন এশিয়া অঞ্চলে চার দেশীয় জোট কোয়াড (যুক্তরাষ্ট্র, জাপান অস্ট্রেলিয়া, ভারত) প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘদিন হতে চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের অভিমত, অকাস জোট স্পষ্ট হওয়ার মধ্যে দিয়ে অপমৃত্যু ঘটল কোয়াড নামের জোটটির। যার অন্যতম সদস্য ছিল জাপান ও ভারত। তবে নিকট ভবিষ্যৎ সময় বলে দিবে অকাস জোটের সঙ্গে এশিয়া অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সম্পর্ক কেমন হবে।

মূলত,আগামী দিনে এশিয়া অঞ্চল বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু পরিণত হবে এমনটাই মনে করছে বিশেষজ্ঞরা। কার্যত, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি থেকে ওয়াশিংটন দিন দিন গুটিয়ে নিয়ে এশিয়ার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। ইরাক, সিরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহার যার অংশবিশেষ। উক্ত অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র যতটা না ব্যর্থ ইসরায়েলকে প্রক্সি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ঠিক ততটাই সফল ওয়াশিংটন। সার্বিক দিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র যে অঞ্চলকে তাদের স্বার্থের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করে, সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা দুরূহ। যে অগ্নিগর্ভ তারা সৃষ্টি করে, সহসা তা নিভে না। লিবিয়া, ইরাক যার জ্বলন্ত উদাহরণ। অপর দিকে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া অঞ্চলে নিজেদের স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে অস্ট্রেলিয়াকে প্রক্সিমেট হিসেবে তৈরি করবে বলে মনে হচ্ছে।

বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্র বদলে যাচ্ছে। অকাস চুক্তি যেখানে আঞ্চলিক রাজনীতিতে আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে মাত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী দীর্ঘ সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ান। কিন্তু সোভিয়েত পতনের পর ওয়াশিংটনের সমীকরণ পাল্টাতে শুরু করে। সময়ের পরিক্রমায় এখন তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের অধিক অর্থনীতির বিপরীতে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বেইজিং। যার পরিমাণ ১৪ দশমিক ১৭ ট্রিলিয়ন ডলার। কিন্তু পিপিপি হিসেবে প্রথম। বিশ্ব ব্যাংকের পূর্বাভাস, ২০৩০ সালে চীনের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, সামরিক খাতে যুক্তরাষ্ট্রের পর সর্বোচ্চ অর্থ ব্যয় করে চীন। বর্তমান বিভিন্ন মহাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাড়ছে ত্বরিত গতিতে। তারা অর্থনীতি সমৃদ্ধির জন্য বেল্ট রোড ইনেশিয়েটিভের মতো কর্মসূচি হাতে নিয়েছে তা এখন পুরোনো গল্প।

সঙ্গত যে, আগামীর বিশ্ব রাজনীতিতে দুই বিপরীত গোল পোস্টের খেলোয়াড়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। কার্যত, ওয়াশিংটনের ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও চীনবিরোধী নীতি থেকে সরে আসবে না এটা নিশ্চিত। অপর দিকে বেইজিংয়ের ক্ষমতার রদবদলের আপাতত কোনো সম্ভাবনা নেই। বলা যায়, প্রতিরক্ষা অকাস এই অঞ্চলে উত্তেজনা নতুন করে বৃদ্ধি করবে। উল্লেখ্য চীন এশিয়া অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বরদাস্ত করবে না। সুতরাং এশিয়া অঞ্চলের বিশ্বের দুই পরাশক্তি চীন-যুক্তরাষ্ট্র আধিপত্য বিস্তৃতির রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয় তা নিকট সময় বলে দিবে। তবে, এই অঞ্চলের রাজনীতির উত্তাপ দিন দিন বৃদ্ধি পাবে তা হলফ করে বলা যায়।

লেখক : শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close