ফারিয়া ইয়াসমিন

  ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

উপলব্ধি

আত্মহত্যা নয় জীবনকে ভালোবাসি

‘আত্মহত্যা’ শব্দটির সঙ্গে একজনের জীবন জড়িয়ে থাকে না আরো অনেকের জীবন জড়িয়ে থাকে। আত্মহত্যা কোনো প্রশ্নের সমাধান হতে পারে না তবুও এ আত্মহত্যার পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। আমাদের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতা যে কতটা প্রয়োজন তা আমরা ধাপে ধাপে অনুধাবন করতে পারছি। মানসিকভাবে সুস্থ থাকাটা বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। আমরা অনেকেই শারীরিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দিলেও মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দিই না। ২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে। আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের গুরুত্ব অন্য দিবসগুলো থেকে একটু হলেও ভিন্ন। কেননা দিন দিন যে পরিমাণ আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে চলেছে তাতে সবার মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা একান্ত প্রয়োজন। যদি খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করি তাহলে আমরা দেখতে পাব, আত্মহত্যার কারণ বেশির ভাগই খুবই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়। আমরা মানবজাতি অনেক ছোট ছোট বিষয় নিয়ে আমরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে জীবন একটাই কোনো কিছুর মূল্য জীবন দিয়ে হতে পারে না। বর্তমানে আত্মহত্যা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন মিলছে আত্মহত্যার খবর। স্বজনদের হাহাকার যেন বেড়েই চলেছে। যেকোনো সংকট বা সমস্যা সমাধানের পথ কখনোই আত্মহত্যা হতে পারে না। আত্মহত্যার সঙ্গে শুধু একজন ব্যক্তির জীবন শেষ হয় না বরং শেষ হয়ে যায় পরিবারের আশা-আকাক্সক্ষার স্বপ্ন। সামান্যতম কারণে জীবনকে যারা তুচ্ছ মনে করেন তারাই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

কেন এই আত্মহত্যা? এর সমাধান কী? প্রতিনিয়ত প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন হচ্ছি আমরা আর খুঁজে চলেছি এর উত্তর। প্রতিটি আত্মহত্যার পেছনে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট তবে এর কারণগুলো অজানা নয়। শুধু সমাধানের পথ সংকীর্ণ। আত্মহত্যার কারণ অনুধাবনের জন্য আমাদের সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্র কাঠামোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়- আত্মহত্যার অন্যতম কারণ হলো মানসিক সমস্যা। মানসিক রোগ বা হতাশায় ভোগে নিজের আশপাশের সবকিছু নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখে যা তাদের চিন্তাভাবনার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বিশ্বের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীদের আত্মহত্যার প্রধান কারণ হতাশা। বাংলাদেশের শতকরা ১৮ থেকে ২০ ভাগ মানুষ কোনো না কোনো কারণে হতাশায় ভুগছেন। পারিবারিক সমস্যা, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া, বেকারত্ব, বৈবাহিক সমস্যা, প্রেমে ব্যর্থ, স্বামীর নির্যাতন, ইভটিজিং এবং অর্থনৈতিক সংকট আত্মহত্যার অন্যতম কারণ। সামাজিক সংহতি যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বোধ জন্ম নেয় যার ফলস্বরূপ হতাশা ঘিরে ধরে। হতাশার ফলে মানুষের মনে জীবনের প্রতি হতাশার মনোভাব চলে আসে যা তাকে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত করে। পরিবার হলো অন্যতম শিক্ষাকেন্দ্র। পরিবার থেকে যেমন ভালো কিছু শেখা যায় তেমনি খারাপ প্রভাবগুলো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করে পরিবারের সদস্যদের। পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যার কারণে আত্মহত্যা করাটা এখন সাধারণ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরুণ-তরুণীদের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার অন্যতম কারণ হলো স্বাধীনচেতা মনোভাব। বর্তমানে সন্তান স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পছন্দ করে কিন্তু স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা মানে যে, পরিবারের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করা নয় এটা তারা ভুলে যায়। বাবা-মার সঙ্গে সন্তানের একটা দূরত্ব বজায় থাকার ফলে হতাশার কারণটাও তারা শেয়ার করে না বাবা-মায়ের সঙ্গে। ফলে সৃষ্টি হয় একাকিত্ব মনোভাব। যার ফলস্বরূপ আত্মহত্যার মতো ঘৃণিত সিদ্ধান্ত নেয় তারা।

পরীক্ষায় ভালো ফলাফল না করলে শিক্ষার্থীদের ওপর পারিবারিক ও সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব ভর করে। বর্তমানে প্রেমে ব্যর্থতার ফলে আত্মহত্যা অনেক বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক কিছু আত্মহত্যার কারণ উদঘাটন করলেই বোঝা যায়। বাংলাদেশে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার ফলে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ভালোবাসায় কষ্ট পাওয়ার ফলে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। ইভটিজিং, স্বামীর নির্যাতন ও যৌন হয়রানি এগুলোর ফলে অনেক মেয়েরা আত্মহত্যা করে। নির্যাতিত নারীরা মুক্তির পথ খোঁজে কিন্তু আসল মুক্তির পথ তারা জানে না; তারা জানে, আত্মহত্যায় মুক্তি মিলবে। আত্মহত্যা বন্ধে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। সচেতনতা সবার আগে প্রয়োজন। নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষা, সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক এইগুলো আত্মহত্যা রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মাদকাসক্তদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা প্রদানের ক্ষেত্রে জোর দিতে হবে। যাদের আত্মহত্যা প্রবণতা বেশি যেমন মাদকাসক্ত ব্যক্তি, মানসিক রোগী, বেকার, সাংস্কৃতিকভাবে শ্রেণিচ্যুত এদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। যৌতুক, নির্যাতন ও উত্ত্যক্তকরণ এর ফলে যাতে আত্মহত্যা না ঘটে সে জন্য নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়ন প্রয়োজন।

প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসে সবাইকে জীবনের মূল্য কতটা সেটা মনে করিয়ে দেওয়া হয়। সেইসঙ্গে আরো মনে করিয়ে দেওয়া হয় আমাদের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতা কেউ গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে যেমন ডাক্তারের কাছে যাই ঠিক তেমনি মানসিক অশান্তি থাকলে আমাদের সেটাকে স্বাভাবিক পর্যায়ে আনতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য যেন আমাদের জীবনের পথে হুমকি না হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের ব্যস্তময় জীবনে নিজেদের জন্য সময় খুজে বের করা অনেক কঠিন। তাই বিনোদনের দিকে আমরা অনেকেই গুরুত্ব দেই না। কিন্তু জীবনে সবকিছুরই প্রয়োজন আছে। ব্যস্তময় জীবনের টাকা উপার্জন করা ছাড়াও আমাদের নিজস্বতা বলে কিছু আছে এটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। মনকে উৎফুল্ল রেখে বাকি সব কাজ করলে আমাদের মধ্যে আত্মহত্যা করার এই ঘৃণিত চিন্তা আসবে না। পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। পরিবার থেকে সহায়তা না পেলে বা পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না থাকলে অনেকেই হীনমন্যতায় ভোগে। এটাই স্বাভাবিক। এজন্য পরিবারকে সবার সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে হবে।

বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ, জরিপ গবেষণা চলছে আত্মহত্যা নিয়ে। তবু কেন কমছে না আত্মহত্যার হার? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় আমাদের আরো সচেতন হতে হবে। বিভিন্ন কর্মসূচি ও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে তবে আমাদের মাঝে এগুলো মেনে চলার ঘাটতি রয়েছে। সমস্যা সমাধানের পথ হিসেবে আত্মহত্যাকে বেছে না নিয়ে, আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। জীবনকে ভালোবাসতে হবে। আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের পরিবার, সমাজ ও দেশ। আত্মহত্যা কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়, তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধ এর দায় আমাদের সবার। তাই আত্মহত্যাকে না বলা শিখতে হবে। আগামী প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা

ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close