আশিক অমি

  ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১

বিশ্লেষণ

আন্তিগোনের বাস্তবিক অবয়ব শেখ রেহানা

আজ ১৩ সেপ্টেম্বর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানার জন্মদিন। ১৯৫৫ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মধুমতীর তীরে জন্মগ্রহণ করেন আমাদের ছোট আপা শেখ রেহানা। বঙ্গবন্ধু ১৯৫৪ সালের ৩০ মে থেকে ১৯৫৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছিলেন কারাগারে। আবার তিনি কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন ১৯৫৮ সালের ১২ অক্টোবর। অর্থাৎ আমাদের ছোট আপা শেখ রেহানার জন্ম থেকে বেশ কয়েক বছর বঙ্গবন্ধুর মুক্ত জীবনে বিচরণের সুযোগ ঘটেছিল। মায়ের ডাক নাম রেণুর প্রথম অক্ষর আর বড় বোন হাসিনার শেষের অক্ষর অক্ষুণ্ন রেখে নাম দেওয়া হয়েছিল রেহানা। পারিবারিক পদবী যুক্ত হয়ে পরিপূর্ণ নাম শেখ রেহানা। অতি আদরের ছোট ভাই রাসেলের কাছে যিনি ছিলেন ‘দেনা’ আপা। রাসেলের দেনা আপা কিংবা বাবা-মায়ের আদরের রেহানা বা মুন্নার জন্ম ও বেড়ে ওঠা এমন একসময়ে যখন বঙ্গবন্ধু ধীরে ধীরে হয়ে উঠছেন বাঙালি জাতির সব আশা-ভরসার মূর্ত প্রতীক। বাংলা ও বাঙালির মুক্তির পথিকৃত। জেল, জুলুম, নির্যাতন যার নিত্যসঙ্গী। শেখ রেহানা যখন বুঝতে শিখেছেন, তখনই দেখেছেন বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাঙালি জাতির শোষণ মুক্তির জন্য আন্দোলন, সংগ্রাম করতে গিয়ে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কারাগারে। কারাগারই যেন তার মূল বাড়ি। সেই ছেলেবেলা থেকেই তিনি সাক্ষী হয়েছেন দেশের জন্য নিজের পিতার যাপিত জীবন সংগ্রামের। সেটি যেন তাকে কোমল হৃদয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করেছিল।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান শেখ রেহানা। যার পিতা একটি দেশের জাতির পিতা। যার বড় বোন চারবারের প্রধানমন্ত্রী অথচ ক্ষমতার বিন্দুমাত্র প্রভাব নেই তার জীবনে। একাধিকবার তার জীবনে সুযোগ আসে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশ হওয়ার। কিন্তু ক্ষমতার মোহ তাকে ছুঁতে পারেনি, যেমন পারেনি বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে। বরং বড় বোন শেখ হাসিনাকে দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য উৎসর্গ করে দিয়ে তিনি সময় দিয়েছেন পরিবারের সদস্যদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে আধুনিক হিসেবে গড়ে তুলতে। নিজের ও বড় বোনের সন্তানদের গড়ে তুলেছেন মাতৃস্নেহে। সজীব ওয়াজেদ জয় আর সায়মা ওয়াজেদ পুতুল মায়ের চেয়ে যেন তাদের খালামনিকেই সুখে-দুঃখে কাছে পেয়েছেন বেশি। বাবা রাষ্ট্রপ্রধান কিন্তু তার ছোট মেয়েকে দেখে তা বোঝার কোনো উপায় ছিল না। তিনি কখনো স্কুলে আসেননি বাবার পতাকাবাহী গাড়িতে করে। মেয়ের ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময় পরীক্ষাকেন্দ্র ছিল ধানমন্ডি বয়েজ স্কুল। বাবা বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমার অফিসে যাওয়ার পথেই পরীক্ষা কেন্দ্র। আয় তোকে আমি নামিয়ে দেব।’ কিন্তু মেয়ে নারাজ। সে বাবার গাড়িতে করে পরীক্ষা দিতে গেল না। সে বছর ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অষ্টম হয়েছিল মেয়েটি। এভাবেই ছোটবেলা থেকেই ঠিক যেন মায়ের আদলে গড়ে উঠতে থাকেন বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা। যার প্রভাব আজও তার জীবনে বিদ্যমান।

বিশ্বের প্রথিত যশাদের মাঝে বসবাস করেও শেখ রেহানা ঔদার্য দেখিয়েছেন জীবনের নানা ক্ষেত্রে। বিগত মহাজোট সরকারের সময় শেখ রেহানার নামে বরাদ্দ করা বাড়িটি সরকারি কাজে ফিরিয়ে দিয়েছেন শেখ রেহানা। সে সময়ের প্রেক্ষাপটে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানার ঘটনাটি মানুষের কাছে উদারনৈতিক বলেই মনে হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের শেষ দিকে ২০০১ সালে ১১ জুলাই মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ধানমন্ডিতে এক বিঘা জমির প্লটে একতলা একটি বাড়ির মালিকানা পান শেখ রেহানা। তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বিক্রয় দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রেশন করে দেওয়া হয় এবং বাড়িটি তার নামে নামজারিও হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এসে সেই বরাদ্দ না মেনে বাড়িটি ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশকে দিয়ে দেয়। তবে শেখ রেহানার পক্ষ থেকে হাইকোর্টে রিট করায় মামলাধীন বাড়িটির বরাদ্দপত্র বাতিল করতে ব্যর্থ হয় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। প্রায় ২০০ কোটি টাকা মূল্যের সরকারি সূত্রে পাওয়া বাড়িটি নিজের দখলে আনার চেষ্টা না করে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন শেখ রেহানা। নামমাত্র ১০০১ টাকা মূল্যে সরকারের কাছে বাড়িটি দলিল করে দিয়েছেন তিনি। এ ঘটনা কেবল বঙ্গবন্ধু পরিবারের সন্তান বলেই তার পক্ষে ঘটানো সম্ভব। কারণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বাল্যকাল থেকে পরের দুঃখ, কষ্টকে উপলব্ধি করতে শিখেছিলেন আর নিজে ধনপতি না হয়ে সাধারণ জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত ছিলেন।

বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্তে তার মা বেগম ফজিলাতু নেছা মুজিব সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন পরিবারটির প্রেরণা। দুই বোন বড় আপা শেখ হাসিনা ও ছোট আপা এক স্মৃতি কথায় জানিয়েছেন, ‘মার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল দেশ স্বাধীন হবে।’ মায়ের কাছ থেকে শিখেছেন অনেক কিছু। স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু মনে করতেন বাংলাদেশ হবে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড এবং সাউথ এশিয়ার শক্তিশালী দেশ। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবে এ দেশ। বঙ্গবন্ধুর এই ভাবনাই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু দুহিতা দেশরত্ন শেখ হাসিনারও ভাবনা। বাংলাদেশের মানুষের কথা চিন্তা করে শেখ হাসিনা যেমন কষ্ট পান, তেমনি কষ্ট পান শেখ রেহানাও। যে বাঙালির জন্য বঙ্গবন্ধু সারাটা জীবন কষ্ট করেছেন, সেই জনগণের জন্যই বঙ্গবন্ধু নিজের জীবনটাও দিয়ে গেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বর্তমানে বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা চেষ্টা করছেন মানুষের অবস্থার উন্নয়ন ঘটানোর জন্য এবং সফলও হয়েছেন। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে হবে, মানুষের জন্য কিছু করতে হবে- এ ভাবনা যেমনই দেশরত্ন শেখ হাসিনার, তেমনই শেখ রেহানার এবং সব আওয়ামী লীগ সমর্থকের। ১৯৮১ সাল থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের জন্য নিরলসভাবে কাজ করেছেন; নেতৃত্ব দিয়েছেন; সততার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। আর প্রেরণা জুগিয়েছেন ছোট বোন শেখ রেহানা। জাতির পিতার কন্যা হয়েও চাকরি করে সহজ সরল সাবলীল জীবনযাপন করেছেন সবার ছোট আপা শেখ রেহানা। কিন্তু তার বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করে জোট সরকার এবং পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুর্নীতি দমন কমিশন। অথচ তারা কোনো দুর্নীতি খুঁজে পায়নি। যাদের গায়ে কালি নেই তাদের কালি দিয়ে ষড়যন্ত্র করেছে বিএনপি জামায়াতসহ মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা। সৎ ও যোগ্য হয়েও শেখ রেহানা হয়রানির শিকার হয়েছেন বহুবার।

ব্যক্তিগতভাবে মমতাময়ী নেত্রী শেখ হাসিনার মতো আমাদের ছোট আপা শেখ রেহানারও টুঙ্গিপাড়ার প্রতি রয়েছে গভীর টান। হিজলের স্মৃতি তাকে ডাক দিয়ে যায়; পানিতে ঢাকা সবুজ খেত তাকে আহ্বান জানায়। মহান পিতার কবর স্নিগ্ধ সান্নিধ্য প্রদান করে। ১৯৭৫ সালের ৩০ জুলাই শেখ হাসিনার সঙ্গে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন বলেই প্রাণে রক্ষা পান ছোট আপা শেখ রেহানা। তিনি আজ বেঁচে রয়েছেন বলেই আওয়ামী লীগ যতবারই ষড়যন্ত্রের শেকলে নিক্ষিপ্ত হয়েছে ততবারই ত্রাতা হয়ে এসেছেন আমাদের ছোট আপা। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন দুঃসময়ে, বিভিন্ন ক্রান্তিকালে তিনি যেন আশা, ভরসার স্থান। বিশেষ করে ছোট আপার কথা উচ্চারণ হলে ২০০৭-এর ওয়ান-ইলেভেনের কথা দৃশ্যপটে সামনে চলে আসে। সে সময় আওয়ামী লীগকে বিভক্তির হাত থেকে বাঁচাতে, জননেত্রী শেখ হাসিনার মুক্তির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে এবং আন্তর্জাতিক মহলে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে শেখ রেহানাই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।

গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিসের আন্তিগোনে ট্র্যাজেডিতে প্রতিবাদী নারী চরিত্র ও নৈতিকতার বিমূর্ত প্রতীক হলেন আন্তিগোনে। আর আমাদের ছোট আপা শেখ রেহানা হলেন সেই আন্তিগোনেরই বাস্তবিক অবয়ব। যিনি তার যাপিত জীবনে নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নে আপোষহীনভাবে নিজের লড়াই সংগ্রাম জারি রেখেছেন। এভাবেই যেন তিনি সুদীর্ঘকাল ধরে বাংলার মানুষের ছায়া হয়ে নিজের সংগ্রাম জারি রাখতে পারেন- আজ আওয়ামী লীগ পরিবার ও দেশের আপামর জনতার এটুকুই প্রত্যাশা।

লেখক : শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close