প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

  ০৫ ডিসেম্বর, ২০২১

ইউক্রেনে বহুমুখী হামলার পরিকল্পনা রাশিয়ার!

মুখোমুখি মস্কো ওয়াশিংটন

ইউক্রেন সীমান্তে দিনকে দিন সেনা সমাবেশের বিস্তার ঘটাচ্ছে রাশিয়া। প্রতিবেশী ইউক্রেনে ১ লাখ ৭৫ হাজার সেনা নিয়ে বহুমুখী আক্রমণের পরিকল্পনা সাজিয়েছে মস্কো। গত শুক্রবার এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। এদিকে বিষয়টি নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা সামরিক মিত্রদের বাদানুবাদ দিনকে দিন বিপজ্জনক মোড় নিচ্ছে। এই বাদানুবাদের বিস্ফোরণ দেখা গেছে সুইডেনে ইউরোপীয় নিরাপত্তাবিষয়ক এক বৈঠকেও। খবর বিবিসি ও আলজাজিরার।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী বছরের শুরুর দিকেই আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা পুতিন সরকারের। এখন পর্যন্ত ইউক্রেন সীমান্তে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান করছে ৯৪ হাজারের বেশি রুশ সেনা। মার্কিন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি গোয়েন্দা নথির বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিকল্পিত অভিযানটি একটি বহুমুখী আক্রমণ হতে পারে। নথিতে দেখা গেছে, রাশিয়া সীমান্ত এলাকার চারটি স্থানে বাহিনী মোতায়েন করছে। যদিও মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়ে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এই প্রতিবেদনের আগে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী দাবি করেন, ইউক্রেন সীমান্তে এরই মধ্যে ৯৪ হাজারের কাছাকাছি সেনা মোতায়েন করেছে মস্কো।

এদিকে ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার রেড লাইন মানবেন না বলে সাফ জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। মস্কো তার প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনে যে আক্রমণের পরিকল্পনা সাজাচ্ছে তা ‘অত্যন্ত দুরূহ’ করে তুলবেন বলেও সতর্ক করেছেন তিনি। গতকাল শনিবার মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যে ক্যাম্প ডেভিড সামরিক ঘাঁটিতে সাংবাদিকদের বাইডেন আরো বলেন, ‘পুতিনকে ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানো থেকে বিরত রাখতে আমরা বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়েছি। তা বাস্তবায়ন সম্ভব হলে ব্যাপক ও অর্থপূর্ণভাবে রাশিয়-ইউক্রেন সংকট মেটানো সম্ভব।’

উল্লেখ্য রুশপন্থি গেরিলাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা নিয়ে ডনবাস এলাকা নিয়ে সম্প্রতি রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে উত্তেজনা প্রকট আকার ধারণ করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইউক্রেন সীমান্তে সেনা সমাবেশ করে মস্কো। রাশিয়ার পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধেরও হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। রুশ কর্মকর্তা দিমিত্রি কোজাকের ভাষায়, ‘একটা গুলিও পায়ে নয়, মুখে চালানো হবে।’ এমন পরিস্থিতিতে মিত্র দেশ ইউক্রেনের পাশে দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো। ইউক্রেন সীমান্তে রুশ সেনা সমাবেশ নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত বৃহস্পতিবার সুইডেনে বৈঠক হয়েছে। জানা গেছে, বৈঠকটি বহু-দেশীয় হলেও আলাদাভাবে মুখোমুখি কথা বলেছেন লেভরভ এবং ব্লিংকেন।

মার্কিন কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দুপক্ষই ইউক্রেন নিয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে একমত হয়েছে। এমনকি অদূর ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট পুতিন এবং প্রেসিডেন্ট বাইডেনের মধ্যে একটি শীর্ষ বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়েও কথা হয়েছে। তবে কবে তা হতে পারে তা নিয়ে কোনো ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি। গত জুনে জেনেভাতে পুতিন এবং বাইডেনের মধ্যে মুখোমুখি যে বৈঠক হয়েছিল সেখানেও ইউক্রেন এবং ন্যাটোর সম্প্রসারণ নিয়ে কথা হয়। কিন্তু তাতে যেকোনো ফল হয়নি তা রাশিয়ার নতুন এই সেনা সমাবেশের ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাশিয়া কয়েক বছর ধরে বিভিন্নভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে ইউক্রেনে আমেরিকা বা ন্যাটো জোটের কোনো সামরিক উপস্থিতি তারা মানবে না। সপ্তাহখানেক আগে প্রেসিডেন্ট পুতিন আবারও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে এ ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে হবে।

স্টকহোমে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লেভরভ খোলাখুলি বলেন, ইউক্রেন দিয়ে বিপজ্জনক কোনো পরিস্থিতি এড়ানোর কোনো সদিচ্ছা ন্যাটো দেখাচ্ছে না। তিনি বলেন, ন্যাটো জোটের সামরিক অবকাঠামো রাশিয়ার সীমান্তে নিয়ে আসা হচ্ছে। রোমানিয়া এবং পোল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী ব্যবস্থা মোতায়েন করা হচ্ছে। আমেরিকার তৈরি মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ইউরোপে নিয়ে আসা হচ্ছে। যার অর্থ ইউরোপে সামরিক সংঘাতের দুঃস্বপ্ন পুনরায় ফিরে আসছে। লেভরভ হুশিয়ার করেন, আমেরিকা এবং পশ্চিমা মিত্ররা যেন ইউক্রেনসহ রাশিয়ার প্রতিবেশীদের সামরিক সংঘাতের চারণভূমি বানিয়ে না ফেলে।

যদিও ইউক্রেন এবং এর পশ্চিমা মিত্ররা ক্রমাগত বলছে, রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযানের পাঁয়তারা করছে। তবে সিংহভাগ বিশ্লেষক এখনো মনে করছেন না যে, রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক কোনো অভিযান চালাবে। ক্রেমলিন স্পষ্ট একটি বার্তা দিতে চাইছে যে, ইউক্রেনকে যেন কখনোই ন্যাটো জোটের সদস্য না করা হয় এবং তাদের এই রেড লাইন ভাঙলে রাশিয়া তা প্রতিহত করতে প্রস্তুত। পুতিনের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করছেন ন্যাটোতে ঢোকার ব্যাপারে পশ্চিমারা ইউক্রেনের বর্তমান ক্ষমতাসীনদের আশা জোগাচ্ছে। মস্কোতে রুশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক তাতিয়ানা স্তানোভায়া এমন মন্তব্য করেছেন।

ন্যাটোর পক্ষ থেকে যেভাবে ইউক্রেনকে অস্ত্র এবং সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে তাতে পুতিন প্রচ- ক্ষিপ্ত। তাতিয়ানা স্তানোভায়া বলেন, লাল কাপড় দেখলে ষাঁড় যেমন ক্ষেপে যায় পুতিনের অবস্থা অনেকটাই তেমন। পুতিন ভাবছেন এখনই যদি তিনি কিছু না করেন তাহলে ইউক্রেনে ন্যাটো ঘাঁটি হবে। সুতরাং এখনই তাকে এটা আটকাতে হবে। ইউক্রেন যে ন্যাটোতে যোগ দিতে উদগ্রীব তা অজানা কিছু নয়। আর তার দোরগোড়ায় আরেকটি ন্যাটো দেশের উপস্থিতি যে রাশিয়া মানবে না, তাও নতুন কিছু নয়। কিন্তু রাশিয়া দেখছে যে, তাদের আপত্তির তোয়াক্কা না করে নেটো দেশগুলো থেকে ইউক্রেনে অস্ত্র যাচ্ছে।

পূর্ব ইউক্রেনে রুশ সমর্থিত বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে প্রয়োগের জন্য তুরস্কে তৈরি ড্রোন কিনেছে ইউক্রেন। ক্রাইমিয়ার কাছে আকাশে সম্প্রতি পারমাণবিক বোমা ফেলতে সক্ষম দুটো আমেরিকান যুদ্ধ বিমান উড়তে দেখার ঘটনায় মস্কো প্রচ- ক্ষিপ্ত। সেই সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কির সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্যে রাশিয়া ক্ষিপ্ত। তিনি বলেছেন, রাশিয়ার কাছ থেকে ক্রাইমিয়াকে মুক্ত করা তার সরকারের লক্ষ্য। ডনবাস অঞ্চলে রুশ সমর্থিত বিদ্রোহীদের দমনে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর ইঙ্গিতও ইউক্রেন দিচ্ছে।

এসব কথাকে রাশিয়া উসকানি হিসাবে দেখছে। মস্কো মনে করছে, পশ্চিমাদের ভরসায় ইউক্রেন এসব কথা বলার সাহস পাচ্ছে। ইউক্রেন সরকার এবং তাদের পশ্চিমা মিত্রদের সতর্ক করতেই যে, সীমান্তে এই সেনা সমাবেশ তা নিয়ে রাশিয়া রাখঢাক করছে না। মস্কোর গবেষণা সংস্থা আইআইএসির গবেষক অন্দ্রেই কর্তুনভ বলেন, ইউক্রেনের সীমান্তে সেনা সমাবেশের অর্থ এই নয় যে, রাশিয়া সেনা ঢুকিয়ে দেবে। পুতিন আসলে একটি বার্তা দিতে চাইছেন, আর বার্তাটি হচ্ছে ইউক্রেনকে সতর্ক করা যে পশ্চিমাদের ভরসায় ডনবাস অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পথে তারা যেন পা না বাড়ায়। নানাভাবে ইউক্রেনের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করছে রাশিয়া। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, ইউক্রেন সীমান্তে ট্যাংক আর সেনা পাঠিয়ে মস্কো যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকবার আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে চাইছে। পুতিন ও বাইডেনের সঙ্গে আরেকটি শীর্ষ বৈঠক চাইছে তারা।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close