বৈরুতে নেতাদের ওপর ক্ষোভ উদ্ধার কাজে এসেছে গতি

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর বৈরুত বন্দরে এখনো থেকে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ সরাতে কাজ করে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। উদ্ধার ও তল্লাশি টিমের পাশাপাশি কাজ করছেন দমকল ও চিকিৎসাকর্মীরাও। তবে শুক্রবারও সেখানে ইউনিফর্ম ছাড়া কিংবা কোনো সরকারি মর্যাদা না থাকা লোকদেরও উদ্ধারে কাজে অংশ নিতে দেখা যায়। বেশ কয়েকজন পর্যবেক্ষক বলেছেন, এসব মানুষই পরিষ্কার কাজ তদারকি করছিলেন। এদিকে বিস্ফোরণের পর দেশটির রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য সম্প্রচার থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছে দেশটির একটি শীর্ষ সম্প্রচারমাধ্যম। রাজনৈতিক নেতাদের ওপরও ক্ষোভ বাড়ছে ক্রমাগত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। গত মঙ্গলবার বিকালে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের বন্দর এলাকায় জোড়া বিস্ফোরণ ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, বিস্ফোরণে পুরো বৈরুত শহর ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠেছিল। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, বৈরুতের বন্দর এলাকা থেকে বড় গম্বুজ আকারে ধোঁয়া উড়ছে, এর কিছুক্ষণের মধ্যে বিকট বিস্ফোরণে গাড়ি ও স্থাপনা উড়ে যেতে দেখা যায়। লেবাননের সরকারি হিসাবে, বিস্ফোরণে এখন পর্যন্ত ১৫৭ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৫ হাজার মানুষ। নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল লেবাননের রাজধানীতে সংস্কার কাজে সহায়তার জন্য পৌঁছালেও শুক্রবারও ঘটনাস্থলে বার বার প্রবেশ করতে থাকে অ্যাম্বুলেন্স ও চিহ্নহীন যানবাহন। নেদারল্যান্ডসের একটি উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছালেও লেবাননের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে দেয়নি। তারা ওই দলের সঙ্গে থাকা কুকুর প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ‘পরে তাদের এমন একটি অংশে পাঠানো হয় যেটি আসলে কোনো কাজের না। এটা নিয়ে এখানকার অনেকেই সন্দেহ পোষণ করেন। হিজবুল্লাহ তাদের লোক পাঠিয়েছে, আর সবাই ধারণা করছে কেন?’ ব্যাপক উদ্ধার কাজ ধীরে ধীরে গতি পেলেও বৈরুত বন্দরে ওই ধ্বংসযজ্ঞ তৈরিকারী বিস্ফোরক কীভাবে বহুদিন ধরে মজুদ থেকেছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ক্ষোভ বাড়তে থাকায় দেশটির অন্যতম সম্প্রচারমাধ্যম এলবিসি এক ঘোষণায় জানিয়েছে, এই ঘটনা তদন্ত নিয়ে কোনো নেতার কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য বা বিবৃতি তারা সম্প্রচার করবে না। এর ফলে এলবিসিতে গত শুক্রবার প্রেসিডেন্ট মাইকেল আউন কিংবা হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহর কোনো বক্তব্য প্রচারিত হয়নি। এলবিসি চেয়ারম্যান পিয়েরে দাহের বলেন, ‘রাজধানী বৈরুত ধ্বংস হয়ে গেছে আর আপনারা এখনো সেই একই ধরনের কৌশল প্রয়োগের চেষ্টা করছেন। আপনারা এই পথে চলতে পারবেন না। এটা আপনাদের জন্য একটা বার্তা।’ বৈরুত বন্দরের কাজ ছয় মাস আগে ছেড়ে দিয়েছেন ইউসুফ সেহাদি নামের এক কর্মী। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানকে তিনি জানিয়েছেন, সাবেক সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপের ভিত্তিতে তিনি জানতে পেরেছেন, বিস্ফোরণের আগে ১২ নম্বর গুদামের গেটে মেরামতের কাজ চলছিল। তিনি বলেন, ৫টার দিকে ঘটনা, তার আধা ঘণ্টা পরেই ধোঁয়া দেখতে পাই। দমকল ও নিরাপত্তাকর্মীরাও আসে। সবাই মারা পড়ে। আমার বিশ্বাস ওই মেরামতের কাজ থেকেই এই বিপর্যয় ঘটেছে। তিনি বলেন, ১২ নম্বর গুদামে ৩০ থেকে ৪০ ব্যাগ আতশবাজি রাখা ছিল। ২০০৯-১০ সালে এসব আতশবাজি জব্দ করে কাস্টমস। সে সময় আমি মাল তোলার কাজের একজন তদারককারী ছিলাম। আমরাই ওই আতশবাজিগুলো ১২ নম্বর গুদামে রাখি আর ২০১৩ সালে কাস্টমস বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক (অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট) জব্দ করে ওই গুদামেই রাখে। আর এগুলো যা ঘটেছে তা ঘটানোর অপেক্ষাতেই ছিল। ইউসুফ সেহাদি জানান তিনি গত মঙ্গলবার বন্দরের রক্ষী ইমাদ আল জাহরাদিনের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ইউনিয়ন ও স্বাভাবিক কাজকর্ম নিয়ে কথা বলেছিলাম। আর সে আমাকে বলেছিল তারা নম্বর গেট মেরামতের কাজ করছিল।’ বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহতদের একজন ছিলেন আল জাহরাদিন।

 

নিহতদের অনেকেই সেহাদির পুরনো সহকর্মী ছিলেন। বিস্ফোরণের সময় ধারণ করা ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, বিশাল বিস্ফোরণের আগে ছোট বিস্ফোরণ হতে দেখা গেছে। সেহাদি বলেন, ‘তারা সেখানেই ছিল যেখানে আমি তাদের ছেড়ে এসেছিলাম। আর যখন আগুন ধরে যায় তখন সব শেষ হয়ে যায়।’ এক টেলিভিশন ভাষণে নাসরাল্লাহ বলেছেন, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের সঙ্গে হিজবুল্লাহর কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই। বন্দরে প্রভাব বিস্তারের কথাও অস্বীকার করেন তিনি। আন্তর্জাতিক সব দাতব্য তৎপরতাকে স্বাগত জানানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পাশাপাশি তিনি সংহতির আহ্বান জানান। বিপর্যয়ের ঘটনায় আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে ফ্রান্স। স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফিয়া বলেন, ‘ফরাসিরা ঠিকই বলছে।’ বিস্ফোরণের ঘটনায় নষ্ট হওয়া হাজার হাজার বাড়ির মধ্যে আশরাফিয়ার বাড়িও রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই বিপর্যয়ের পরতে পরতে রয়েছে মাফিয়ারা দেশ চালালে যা ঘটে তার গল্প।’

 

"