শরীফুল রুকন, চট্টগ্রাম
৪৩ বছর পর মিলল ন্যায়বিচার!
দেওয়ানি মামলায় বিচার বিলম্বের কারণ কী?

‘স্বামী ফজলুর রহমান ছিলেন রেলওয়ের কর্মকর্তা। ১৯৭৪ সালে তিনি চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বটতলী এলাকা থেকে ১৯২ গ- জায়গা কেনেন হেমন্ত নারায়ণ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে। কয়েক বছর পর ওই জায়গার মালিকানা দাবি করে চট্টগ্রাম আদালতে একটি মামলা করেন এজাহার মিয়া নামের অপর এক ব্যক্তি। তিনি তখন গৃহবধূ। স্বামীই মামলা চালাতেন।’ ৪৩ বছর পর শেষ হওয়া এই মামলার উত্তরাধিকার সূত্রে ভারবহনকারী ভদ্রমহিলার নাম শহর বানু। কণ্ঠজড়ানো স্বরে এসব কথা এই প্রতিবেদককে বলেছেন এই মামলায় ন্যায়বিচার পাওয়া এই শহর বানু।
‘ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের ১ম অতিরিক্ত সহকারী জজ আদালতের বিচারক ১৯৯১ সালের ২৮ আগস্ট এ মামলার রায় ঘোষণা করেন; রায় আমার স্বামী ফজলুর রহমানের পক্ষে যায়। এ রায়ের বিরুদ্ধে জেলা জজ আদালতে আপিল আবেদন করেন এজাহার মিয়া। মামলা চালানোর একপর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন স্বামী। ১৯৯৩ সালে তিনি মারা যান। এ অবস্থায় ৬ মেয়ে ও দুই ছেলেকে মানুষ করার পাশাপাশি মামলা চালানোর ভার পড়ে আমার কাঁধে। সেই থেকে মামলার বোঝা বইতে শুরু করি। গত ২ মে এ মামলায় আমাদের পক্ষে রায় দিয়েছেন চট্টগ্রামের ৩য় সাব-জজ আদালতের বিচারক মো. আবদুল কাদের।’
সত্তরোর্ধ্ব এই নারী চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার মধ্যম মাদার্শার বটতলী এলাকার বাসিন্দা। কথা বলতে কন্ঠ জড়িয়ে আসছিল তার। মামলার ভোগান্তি কাকে বলে তারই বর্ণনা দিচ্ছিলেন তিনি।
শহর বানু বলেন, ‘মামলা চালাতে গিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের আইনজীবীর ফি, বিভিন্ন নথির সইমুহুরি নকল সংগ্রহ, যাতায়াত, খাবার ও আনুষঙ্গিক খাতে ইতোমধ্যে ৭০ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে। সময় তো গেছেই। আল্লাহ চেয়েছেন বলেই জীবদ্দশায় এ মামলার রায় পেয়েছি।’
‘সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, আমার স্বামী মারা যাওয়ার আগে অসিয়ত করলেন, ‘এ দেশে এখনো ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব। আমি মারা গেলে, আমি চাই যে তোমরা সমস্ত শক্তি নিয়ে এ মামলাটি লড়াই করবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে।’ এখন আমরা ওনার অসিয়ত রক্ষা করতে পেরেছি- বলতেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শহর বানু।
চট্টগ্রাম আদালতের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর পর মামলাটি সর্বশেষ পরিচালনা করেন তরুণ আইনজীবী আসাদুজ্জামান খান; এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে মামলায় যুক্তিতর্ক শুরু হয়। ২৫৭টি দিন ধার্যের পর অবশেষে গত ২ মে শহর বানু ন্যায়বিচার পেয়েছেন। প্রতিপক্ষের ছলচাতুরীর মাধ্যমে কালক্ষেপণ ও আদালতে দীর্ঘসূত্রতাসহ নানা কারণে এ বিষয়ে সমাধানে আসতে ৪৩ বছর লেগেছে।’
দেওয়ানি মামলার বিচার বিলম্বের পেছনে কারণ কি? চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আবু হানিফ বলেন, ‘নানা কারণে বিচার বিলম্বিত হয়। দেওয়ানি মামলা শুনানির জন্য প্রস্তুত করাই কঠিন হয়ে পড়ে। সমন জারি ও নোটিস জারি শেষ করতে করতেই দেখা যায়, এরই মধ্যে নতুন অনেক বিষয় ঢুকে পড়েছে মামলায়।’
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি রতন কুমার রায় বলেন, ‘মামলা চলাকালে কেউ মারা যান, বিভিন্ন জবাবের সংশোধন লাগে, কাউকে মামলা থেকে বাদ দিতে হয়, কাউকে যোগ করতে হয়। দেখা যায়, এসব করতে করতে মাঝখানে একটি নিষেধাজ্ঞার আদেশ চলে এসেছে। এরপর মামলা শুনানির জন্য প্রস্তুত হলে দেখা যায়, মামলার দু’পক্ষই রাজি, কিন্তু আদালত কোনো কারণে শুনানি শুরু করতে রাজি হন না। আবার আদালত রাজি হলেও কোনো এক পক্ষ রাজি থাকে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘আবার অনেক সময় দেখা যায় সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারকই বদলি হয়ে যান। এর বাইরে যে আদালতে দেওয়ানি মামলার বিচার হয়, সে আদালতে অনেক সময় ফৌজদারি মামলাও থাকে। তাই ফৌজদারি মামলায় কোনো সাক্ষী চলে আসলে সেই সাক্ষীর সাক্ষ্য আগে নেওয়া হয়। যার কারণে দেওয়ানী মামলার বিচার পেতে দেরী হয়।’
বিচারাধীন মামলা নিষ্পত্তিতে উদ্যোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি রতন কুমার রায় বলেন, ‘চট্টগ্রামের আদালতগুলোতে ৮২ হাজারের মতো দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এরমধ্যে তিনটি যুগ্ম জেলা জজ আদালতে দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন রয়েছে প্রায় ২৫ হাজার। বর্তমানে মামলা ব্যবস্থাপনা কমিটি নামের একটি কমিটি আছে। সে কমিটির আমিও একজন সদস্য। প্রতি মাসে কমিটির বৈঠক করে আমরা পুরনো মামলার একটি তালিকা করছি। সে মোতাবেক কমিটি ব্যবস্থা নিচ্ছে। যার কারণে পুরনো মামলার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘মামলার সংখ্যা কমানো ও দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে আদালতের সংখ্যা বাড়াতে হবে। চট্টগ্রামে যে হারে মামলা দায়ের হয়, সে তুলনায় বিচারক নেই। ছয়জন যুগ্ম জেলা জজ থাকার দরকার ছিল, কিন্তু আছেন মাত্র তিনজন।’
"







































