অপকর্মে পূর্বসূরিদেরও ছাড়িয়ে

প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক ও সিলেট প্রতিনিধি

দেশজুড়ে আলোচিত সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক আকবর হোসেন ভূইয়া অপকর্মে তার পূর্বসূরিদেরও ছাড়িয়ে গেছেন। গত বছরের ৬ নভেম্বর থেকে বন্দরবাজার ফাঁড়ির দায়িত্ব নিয়ে যোগ দেওয়ার পর থেকে আকবর অপকর্মের পথেই হেঁটেছেন। ওই পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনের শিকার হয়ে রায়হান আহমদ নামে এক যুবকের মৃত্যুতে আকবরের কৃতকর্ম এখন মানুষের মুখে মুখে।

রায়হান হত্যার পরে আকবর পালিয়ে যাওয়ায় ভুক্তভোগীরা জানাচ্ছেন তার অপকর্মের কথা।

বন্দরবাজার ও জিন্দাবাজারের রাস্তার হকার এবং ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কাছেও এক মূর্তিমান আতঙ্ক এই আকবর। তারা বলছেন, মিথ্যা মামলার হয়রানি থেকে বাঁচতে বাধ্য হয়েই চাঁদা দিতে হতো তাদের।

নগরীর বারুতখানা এলাকার আবদুুল আলিম মুক্তা জানান, গত ১৫ এপ্রিল রাতে তার বাড়িতে ঢুকে ৪০ হাজার টাকা না দিলে মাদক মামলা দেবেন বলে হুমকি দেন আকবর। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় তার বাসা থেকে ২১টি ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে উল্লেখ করে মাদক মামলা করেন।

আরেকজন খাদিমপাড়া এলাকার জিনাস লিসা জানান, গত ১৭ এপ্রিল মিরবক্সটুলা এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে তার স্বামীর কথা কাটাকাটি হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা তার স্বামীর ওপর হামলা চালালে তিনি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন। এরপর ঘটনাস্থলে আসেন আকবর। এসেই তিনি হামলাকারীদের পক্ষ নেন। পাঁচ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা ওই নারীর পেটে লাথি মারেন স্থানীয় আরেক নারী। কিন্তু আকবর লিসার স্বামীকে আটক করে নিয়ে যান। দাবি করা ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে না পারায় সেদিনই ওই নারী ও তার স্বামীকে আসামি করে মামলা করেন আকবর।

ভুক্তভোগী ওই নারী জানান, পরদিন আদালত থেকে জামিন পান। এক সপ্তাহ পরে তার গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। আরো বেশি হেনস্থার ভয়ে তারা কোনো আইনি ব্যবস্থা নেননি।

ফাঁড়ি ইনচার্জ হিসেবে যোগ দেওয়ার আগে কোতোয়ালি থানায় আকবরের বিরুদ্ধে সুরতহাল রিপোর্ট পরিবর্তন ও অসত্য তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের অভিযোগ রয়েছে।

গত বছরের ১৫ জানুয়ারি নগরীর কাজলশাহ এলাকায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর বর্ষের শিক্ষার্থী তাইফুর রহমান প্রতীকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর থেকে তাইফুরের পরিবারের অভিযোগ, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আকবর হোসেন ভূইয়া ঘটনাটিকে আত্মহত্যা প্রমাণের জন্য সুরতহাল প্রতিবেদনে মিথ্যা তথ্য প্রদান করেন এবং তদন্ত প্রতিবেদনে অনেক তথ্য গোপন করেন।

রায়হান হত্যাকা-ের পর গত ১৬ অক্টোবর এসব বিষয় উল্লেখ করে ফেসবুকে পোস্ট দেন তাইফুরের বোন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শান্তা তাওহিদা। তিনি উল্লেখ করেন, আকবর প্রথম থেকেই রহস্যজনক কারণে এটি আত্মহত্যা হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করেন, সুরতহালে ভুল তথ্য প্রদান করেন। তাইফুরের মৃত্যু ও তার আগের দিন ওই বাসার সিসিটিভি ফুটেজ রহস্যজনকভাবে গায়েব হওয়ার বিষয়ও তিনি তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেননি। মানসিক চাপে আত্মহত্যা উল্লেখ করলেও প্রতিবেদনে তিনি তা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন।

তাইফুরের বোনের দাবি, তাইফুরের হত্যা বাইরে কোথাও হয়েছে এবং তার হত্যাকে আত্মহত্যা হিসেবে প্রমাণ করে ধামাচাপা দিতে সহযোগিতা করেছেন এসআই আকবর।

রায়হান হত্যায় জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পেয়ে আকবরকে বরখাস্ত করার পর ১৪ অক্টোবর শাহীন মিয়া নামে এক উপপরিদর্শককে বন্দরবাজার ফাঁড়ির দায়িত্ব দেওয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠে। গত বছর জুয়ার আসরে বসে তার জুয়া খেলার ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল সে বিষয়টিও সামনে চলে আসে। পরদিনই তাকে প্রত্যাহার করে দায়িত্ব দেওয়া হয় বন্দরবাজার ফাঁড়িতে দায়িত্বরত আরেক উপপরিদর্শক হাসান উদ্দিনকে। গত বুধবার আকবর পালিয়ে যাওয়ায় ঘটনা খতিয়ে দেখতে পুলিশ সদর দপ্তর তদন্ত দল সিলেটে আসে। তদন্তে উঠে আসে, হাসান উদ্দিন আকবরকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন। এই অভিযোগে হাসানকে বরখাস্ত করার পরে ফাঁড়িতে নতুন করে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলন সিলেটের সমন্বয়ক আবদুল করিম কিম বলেন, সিলেটের কোনো পুলিশ ফাঁড়িই জনসেবার উদ্দেশে নয় বরং পুলিশ বাহিনীর অবৈধ অর্থ উপার্জনের উদ্দেশে কাজ করছে। তিনি বলেন, যখন একজন পুলিশ সদস্য অনেক টাকা খরচ করেন ফাঁড়িতে যোগ দিতে, তখন সে টাকা আদায়ে তিনি সর্বোচ্চ অবৈধ কর্মকা-ে জড়াবেন। যে চক্র এই ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছে, তাদের থামাতে হবে এবং এসব অবৈধ কর্মকা- বন্ধ করতেই হবে।

প্রসঙ্গত, গত ১১ অক্টোবর ভোরে সিলেট নগরীর আখালিয়ার এলাকার বাসিন্দা রায়হান আহমদকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। পরে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। রায়হান হত্যাকা-ের ঘটনায় বন্দর বাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর, হাসান উদ্দিনসহ পাঁচজনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। এ ঘটনায় নিহত রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নী বাদী হয়ে ১২ অক্টোবর কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, বন্দরবাজার ফাঁড়িতে হত্যার শিকার হয়ে রায়হানের মৃত্যু হয়েছে। এর দুই দিন পর মামলার তদন্ত ভার দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে। আকবর যেন দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন সে কারণে পিবিআই গত ১৫ অক্টোবর দেশের সব ইমিগ্রেশন চেকপোস্টকে সতর্ক করে। এরই মধ্যে সাময়িক বরখাস্ত দুজন কনস্টেবলকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নিয়েছে পিবিআই।

পিবিআইয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার মুহাম্মদ খালেদ-উজ-জামান সংবাদমাধ্যমকে জানান, মামলায় এখন পর্যন্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ওই ফাঁড়িতে কর্মরত আরো তিন কনস্টেবলের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া আকবরকে পালিয়ে যেতে সহায়তাকারীসহ ওই ফাঁড়ির পাঁচজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বাকিদের পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়।

 

"