বসুন্ধরায় আবাসন ব্যবসায়ীর ‘খুনি’ স্ত্রীর ভাই

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে আবুল খায়ের ও তার সম্বন্ধী (স্ত্রীর বড় ভাই) মো. মিলন ঠিকাদারি করে আসছিলেন। পড়ালেখা জানা থাকায় আবুল খায়েরের ভাগ্য দ্রুত বদল হলেও মিলন তার আগের অবস্থানেই রয়ে যান। এ দীর্ঘ পথ চলায় দেনা-পাওনা নিয়ে বিরোধ থেকে জন্ম নেওয়া ক্ষোভের জেরে খায়েরকে খুন করেন মিলন। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নিহত আবুল খায়েরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সজিব বিল্ডার্সে মিলন রড বাইন্ডার’ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। মূলত তাদের দু’জনের মধ্যে দেনা-পাওনা নিয়ে দেন দরবারের একপর্যায়ে রাগান্বিত হয়ে মিলন প্রথমে রড এবং পড়ে কাঠ দিয়ে মাথায় একের পর এক আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করেন ভগ্নিপতি আবুল খায়েরকে। গতকাল রোববার দুপুরে নিজ কর্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করে ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সুদীপ কুমর চক্রবর্তী এসব তথ্য জানান। এর আগে শুক্রবার সকালে রাজধানীর ভাটারা থানাধীন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এম ব্লকে একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে সজীব বিল্ডার্সের মালিক আবুল খায়েরের (৫২) রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় আবুল খায়েরের মেয়ে খাদিজা আক্তার স্বর্ণা বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ঘটনার ১৫ ঘণ্টার মধ্যে গত শনিবার তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় একই এলাকা থেকে মূল অভিযুক্ত মো. মিলনকে (৪৪) গ্রেফতার করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে আসামি মিলন হত্যার দায় স্বীকার করেন এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সংবাদ সম্মেলনে গুলশানের উপকমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, গত ৬ আগস্ট বিকেল ৩টায় একটি ফোন পেয়ে বসুন্ধরা এলাকার বাসা থেকে বের হন আবুল খায়ের। অন্যান্য দিন সন্ধ্যার মধ্যে বাসায় ফিরলেও সেদিন ফেরেননি। তার ফোনও বন্ধ ছিল। পড়ে তার স্ত্রী রূপালী বেগম কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে এলাকায় স্বামীকে খুঁজতে শুরু করেন। একপর্যায়ে বাসা থেকে বেশ কিছুটা দূরে এম ব্লকে সজীব বিল্ডার্সের তত্ত্বাবধানে নির্মাণাধীন একটি ভবনের সামনের রাস্তায় তার স্বামীর মোটরসাইকেল দেখতে পান। ওই ভবনের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে স্বামীর রক্তাক্ত লাশ দেখতে পান তিনি। পরে পুলিশকে খবর দিলে, পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। হত্যার মোটিভ সম্পর্কে সুদীপ কুমার চক্রবর্তী আরো জানান, মিলন একাই হত্যাকা-টি ঘটিয়েছেন। তবে তিনি পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকা-টি ঘটাননি। হিট অব দ্যা মোমেন্টে তিনি প্রথমে লোহার রড দিয়ে ও পরে নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত কাঠ দিয়ে খায়েরের মাথায় আঘাত করলে তার মৃত্যু হয়। অভিযুক্ত মো. মিলন ও আবুল খায়ের দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে একসঙ্গে কাজ করতেন। প্রথমে দু’জনই ছিলেন নির্মাণ শ্রমিক। পরে তারা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তিল তিল করে গড়ে ওঠা এ প্রতিষ্ঠানের এমডি হন আবুল খায়ের। তার ভাগ্য ফিরলেও ফেরেনি মিলনের। তিনি এখনো নির্মাণ শ্রমিকই রয়েছে গেছেন। মিলন মূলত দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরিতে সজীব বিল্ডার্সেই রড বাইন্ডার হিসেবে কাজ করতেন। তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল। নির্মাণ ব্যবসা করেই তারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করতেন। সম্প্রতি যে প্রজেক্টে কাজ চলছিল, সেখানে ভিকটিম আবুল খায়ের ছিলেন মূল ঠিকাদার এবং সেখানে অভিযুক্ত মিলন ছিলেন প্রধান শ্রমিক, যোগ করেন উপ-কমিশনার। তিনি বলেন, মিলন দাবি করেছেন, তিনি তার প্রাপ্য মজুরি হিসেবে প্রায় আট লাখ টাকা আবুল খায়েরের কাছে পেতেন। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে যে মুনাফা আসতো, তার কোনো ভাগই মিলনকে দিতেন না ভগ্নিপতি আবুল খায়ের। একই প্রজেক্টে দু’জন কাজ করলেও ভগ্নিপতি মুনাফা পাচ্ছেন, কিন্তু তিনি পাচ্ছেন না। তাছাড়া শ্রমিক হিসেবেই মিলনকে ট্রিট করতেন আবুল খায়ের। ডাকতে হতো বস বলে। এসব মানতে পারেননি মিলন। মিলন আদালতে ১৬৪ ধারায় হত্যার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেন, মিলন প্রায়ই বোনের বাসায় যেতেন। বোন এবং বোন জামাই আবুল খায়েরের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। সেটি ভেবেই তিনি ঘটনার দিন আবুল খায়েরকে ওই নির্মাণাধীন ভবনে কথা বলতে ডেকেছিলেন। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তাদের মধ্যে তুমুল বাকবিত-া হলে ক্ষেপে গিয়ে ওই ভবনে থাকা লোহার রড ও কাঠ দিয়ে আবুল খায়েরের মাথায় আঘাত করেন তিনি। এতেই তার মৃত্যু হয়, যোগ করেন উপ-কমিশনার। তিনি বলেন, আমরা পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও বিভিন্ন তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হয়েছি যে আবুল খায়েরের স্ত্রীর বড় ভাই মো. মিলন একাই হত্যাকা-ে জড়িত। হত্যাকা-ের পর তার চাঁদপুর চলে যাওয়া এবং চাঁদপুর থেকে ঢাকা আসা নিয়ে পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরিতে সন্দেহ হয়। এরপর গ্রেফতারের পর সব দায় স্বীকার করেন তিনি। এরইমধ্যে তিনি আদালতে ১৪৪ ধারায় হত্যায় জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আমরা খুব দ্রুতই এ মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করব।

 

"