প্রযুক্তিপণ্যের সংকট বেড়েছে, চাহিদা-দাম

প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২০, ০৮:৫০ | আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২০, ০৮:৫৯

মিজান রহমান

ডিলারের চাহিদা অনুযায়ী আমদানিকারক ও পরিবেশকরা সরবরাহ করতে না পারায় দেশের প্রযুক্তিবাজারে চলছে পণ্যের সংকট। এমনকি আগেভাগে বিক্রেতাদের বলে রেখেও মিলছে না ল্যাপটপ। ফলে নেই কোনো বাছবিচার, নেই ব্র্যান্ডের চাহিদা। এখন পণ্য হলেই চলে এমন অবস্থা। এই সংকটে খুচরা বাজারে বেড়েছে প্রযুক্তি পণ্যের দাম। তবে প্রযুক্তিপণ্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিগগিরই এই সংকট কেটে যাবে ও বাজার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।

মার্কেটে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পণ্য সংকটের শীর্ষে রয়েছে ল্যাপটপ, মনিটর, মাদারবোর্ড, গ্রাফিক্স কার্ড, রাউটার, মডেম, ওয়েবক্যাম, হেডফোনসহ বিভিন্ন পণ্য। ক্রেতারা তাদের পছন্দের পণ্য না পেয়ে সংকটের কারণে হাতের কাছে যা পাচ্ছেন তাই কিনছেন। তবে বাজারে পণ্যের সংকট থাকলেও ব্যবসায়ীরা খুশি বিক্রি বেড়ে যাওয়ায়। বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সভাপতি শাহিদ উল মুনীর। বাজারে প্রযুক্তিপণ্যের সংকট স্বীকার করে প্রতিদিনের সংবাদকে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পণ্য আমদানি বন্ধ ছিল। এ কারণে প্রযুক্তি পণ্যের সংকট কিছুটা আছে। তবে তিনি মনে করেন, অন্য ব্যবসায়ের তুলনায় দেশের প্রযুক্তিপণ্যের বাজার ভালো। এই মার্কেট একদম অচল হয়ে যায়নি। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে।

দেশের প্রযুক্তিপণ্যেও অন্যতম আমদানিকারক ও পরিবেশক প্রতিষ্ঠান স্মার্ট টেকনোলজিস। এর পরিচালক (চ্যানেল সেলস) মুজাহিদ আল বেরুনি সুজন বলেন, বাজারে প্রযুক্তি পণ্যের সংকট রয়েছে। বিশেষ করে ল্যাপটপ, মনিটর ও পেরিফেরিয়ালস পণ্যের সংকট বেশি। আমরা উৎপাদকদের কাছে চাহিদা পাঠাচ্ছি, তারা চাহিদা অনুযায়ী পণ্য দিতে পারছে না। দেখা গেল আমরা চাহিদা দিলাম ২০ হাজার ইউনিট ল্যাপটপের, তারা পাঠাল ১০ হাজার ইউনিট। অবস্থা ব্যাখ্যায় এই ব্যবসায়ী বলেন, প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদকরা যন্ত্রাংশের ঘাটতির কারণে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। লকডাউনের কারণে যন্ত্রাংশ নির্মাতারা উৎপাদন বন্ধ রাখায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।

প্রযুক্তিপণ্য বাজার ঘুরে জানা গেল, গত আগস্টে সর্বাধিক ২৬ হাজারের বেশি ইউনিট ল্যাপটপ বিক্রি হয়েছে, জুলাই মাসে যা ছিল ২২ হাজার ইউনিটের বেশি। মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ২০ হাজার ইউনিটের নিচে। জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারিতে যা ছিল ১২ থেকে ১৫ হাজারের মধ্যে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১২-১৩ সালে দেশে ডেস্কটপ কম্পিউটার (পিসি) ও ল্যাপটপ বিক্রির অনুপাত ছিল ৬০:৪০। ২০১৭ সালের পর থেকে এই অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৫০:৫০। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ইউসিসির প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সারোয়ার মাহমুদ খান বলেন, বাজারে পণ্যর সংকট রয়েছে। ডেস্কটপ, ল্যাপটপ কম্পিউটার, রাউটারের বিক্রি ভালো হলেও মাদারবোর্ড, প্রসেসর, হার্ডড্রাইভের ঘাটতি আছে বাজারে।

মার্কেটে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, প্রযুক্তিপণ্যেও সংকটের ফলে বাজারে অনেক পণ্যের দামও বেড়েছে। প্রযুক্তিপণ্যর দাম ৫ থেকে ৭ শতাংশ বেড়েছে। তবে প্রযুক্তিপণ্যের আমদানিকারক ও পরিবেশকরা দাম বাড়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, এটা খুচরা বাজারে বেড়েছে। পরিবেশক বা ডিলাররা বাড়ায়নি। কারণ হিসেবে তারা পণ্যের ঘাটতির কথা উল্লেখ করেন। পুরোদমে আমদানি শুরু হলে মার্কেট আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে বলে জানান তারা।

ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান কম্পিউটার মার্কেটের (ইসিএস কম্পিউটার সিটি) সাধারণ সম্পাদক সুব্রত সরকার। বাজার সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রতিদিনের সংবাদকে তিনি বলেন, প্রযুক্তি সংকট শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বেই পণ্যের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তবে মার্কেটে বেচাবিক্রি ভালো। আমার ব্যবসায়ীরা খুশি। মার্কেটে ল্যাপটপের ঘাটতি আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বড় বড় ব্র্যান্ডের সব মডেল মার্কেটে পাওয়া যাচ্ছে না। যা আছে সব বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ল্যাপটপের পাশাপাশি বেশি বিক্রি হচ্ছে গ্রাফিক্স কার্ড, ওয়েবক্যাম, রাউটার, হেডফোন ইত্যাদি।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছর দুই থেকে তিন আগে প্রতি মাসে এই সংখ্যায় (২০ থেকে ২৫ হাজার ইউনিট) ল্যাপটপ বিক্রি হতো। বর্তমানে আবার সেই ধারা ফিরে এসেছে। প্রচুর পরিমাণে ল্যাপটপ বিক্রি হচ্ছে। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে তারা বলছেন করোনা পরিস্থিতির কথা। তবে প্রযুক্তিপণ্যের সংকটের কারণে যেসব ব্যবসায়ী আগে মাসে ২০ থেকে ২৫টি ল্যাপটপ বিক্রি করতেন তারা এখন বরাদ্দই পাচ্ছেন দুই থেকে তিনটি।

প্রযুক্তিপণ্যের এই ঘাটতিকে দেশীয় বলতে নারাজ সুব্রত সরকার। তিনি বলেন, ‘বিশ্বেই এই পণ্যের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে।’ কবে নাগাদ এ সংকট কাটতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বছর নয়, আগামী জানুয়ারী দিকে সংকট আস্তে আস্তে কমে যাবে আশা করি। খুচরা বিক্রিতে দাম বেড়েছে ক্রেতাদের এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সুব্রত সরকার বলেন, বাজারে পণ্যের সংকট হলে দাম কিছুটা বাড়ে। তবে বেশি বাড়েনি। পাঁচ থেকে সাত শতাংশ দাম বাড়তে পারে। দাম বাড়লেও কিন্তু ক্রেতা কমেনি উল্লেখ করেন তিনি।

বিসিএস কম্পিউটার সিটির খুচরা বিক্রেতা শামিম সেনিয়াবাত বলেন, আসলে বাজারে প্রযুক্তিপণ্যের অনেক সংকট। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী আমরা পণ্য দিতে পারি না। ল্যাপটপ তো একেবারে নেই বললেই চলে। যা আছে খুচরা বাজারে, দাম বেশি। আবার ভালো ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ পাওয়া যাচ্ছে না। চাহিদা এখন এমন যে, কেউ আর কোনো ব্র্যান্ডের নাম ধরে বা মডেল হিসেবে ল্যাপটপ আছে কিনা জানতে চায় না। শুধু জানতে চায় ল্যাপটপ পাওয়া যাবে কিনা। তবে অনেকেই একটা পেয়ে গেলে জানতে চান, তার পছন্দের ব্র্যান্ড বা মডেলটা পাওয়া যাবে কিনা। যিনি কোর আই ফাইভ কিনতে এসেছিলেন তিনি সেটা না পেয়ে কোর আই-থ্রি খুঁজছেন। না হলে দেখছেন কম জেনারেশনের প্রসেসরের কোনো ল্যাপটপ পাওয়া যায় কিনা। এলিফেন্ট রোডের ল্যাপটপ বিক্রেতা মুরাদ এ বিষয়ে বলেন, ল্যাপটপ মার্কেটে কম। তাই মূল্য অনেক বেশি। আবার বেশ মূল্য দিয়েও ল্যাপটপ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে মার্কেটের এমন অবস্থা বেশিদিন থাকবে না।

পিডিএসও/হেলাল