বিশেষ প্রতিনিধি

  ০৯ জানুয়ারি, ২০১৭

জেলা পরিষদে নির্বাচিতরা দায়িত্ব কী জানেন না!

দেশে সদ্য নির্বাচিত জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলরদের কাজ নিয়ে অস্পষ্টতা দেখা দিয়েছে। জেলা পরিষদের সংশোধিত আইনে কেবল নির্বাচনকেই গুরুত্ব দেওয়ায় ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে এই প্রথমবারের মতো নির্বাচিত এসব জনপ্রতিনিধিদের কর্মপরিধি ও দায়িত্ব নিয়ে। এ-সংক্রান্ত আইনে যদিও ১২ ধরনের কাজের কথা বলা হয়েছে; কিন্তু সেসব কাজও সাংঘর্ষিক রূপ নিয়েছে ইতোমধ্যেই নির্বাচিত সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের কাজের সঙ্গে। এমনকি দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) কাজের সঙ্গেও।

অন্যদিকে, নির্বাচিত হলেও নিজেদের কাজ ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানেন না এসব বিজয়ী জনপ্রতিনিধিরা। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য কী এবং মর্যাদাই বা কী হতে পারে—সে বিষয়ে তারা এখনো ওয়াকিবহাল নন। স্থানীয় সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতোই কাজকর্ম হতে পারে- এমন ধারণা নিয়েই শপথ নিতে যাচ্ছেন তারা। ফলে এসব চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলররা কী কাজ করবেন বা আইনে উল্লেখিত কাজগুলো কতটা নির্ঝঞ্ঝাটভাবে করতে পারবেন- প্রশ্ন উঠেছে তা নিয়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলা পরিষদের সংশোধিত আইনে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলরদের কাজের সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। আর যেসব কাজের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোও অন্য জনপ্রতিনিধিদের কাজের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নির্বাচিতরা কি বিদ্যমান স্থানীয় সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমান্তরালভাবে এলাকার উন্নয়নকাজ করবেন; নাকি সেসব সংস্থার কাজগুলো দেখভাল করবেন? সে ক্ষেত্রে জনগণ দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই বা কেন মেনে নেবেন জেলা পরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের খবরদারি?

বিশেষজ্ঞরা জেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের পদমর্যাদা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। এসব প্রতিনিধি কার ওপরে, কার নিচে? জেলার ডিসিরা কি এদের কথা অনুযায়ী কাজ করবেন; নাকি এরাই ডিসি অফিসে বসে থাকবেন কোনো কাজের ধরনা দিতে? বিশেষ করে সরকারের ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’-এ (সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের তুলনামূলক অবস্থানের বর্ণনা) জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের নাম না থাকায় মর্যাদা ও কাজের ধারা নিয়ে জটিলতা আরো বেড়েছে।

এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলররা এখনো জানেন না তাদের কাজটা কী। দায়িত্বের পরিধি নিয়েও আছেন নানা দ্বিধায়। অথচ এদের কাজ সুস্পষ্ট করা না হলে উন্নয়ন কর্মকা- বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তিনি এমনও মত দেন, বিদ্যমান সংশোধিত আইন অনুযায়ী জেলা পরিষদ চালাতে গেলে অবশ্যই জটিলতা সৃষ্টি হবে। সরকারের উচিত হবে নতুন করে বিধি তৈরি করে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলরদের কাজ ভাগ করে দেওয়া।

অবশ্য বিশেষজ্ঞদের এসব প্রশ্নের সঙ্গে একমত নন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, স্থানীয় অবকাঠামো তৈরি, সমন্বয় করা, বিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কবরস্থান নির্মাণ, কৃষিকাজ সহায়তার জন্য জেলা পরিষদ ছোট ছোট খাল তৈরি করবে। জেলা পরিষদের এ রকম অনেক কাজ করার আছে। বিদ্যমান অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কোনো সম্ভাবনা নেই। জেলা প্রশাসক জেলা পরিষদের কাজে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

গত ২৮ ডিসেম্বর দেশে প্রথমবারের মতো জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জেলা পরিষদ আইন সংশোধন করে ভোটার করা হয় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের। ফলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ছাড়া এ নির্বাচনে কেউ অংশ নেয়নি। নির্বাচিতদের সবাই ক্ষমতাসীন দলের। নির্বাচিতদের গেজেট প্রকাশের কাজ চলছে।

জানেন না কাজ কী : পটুয়াখালী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক খান মোশাররফ হোসেন বলেন, যেহেতু এবারই প্রথম নির্বাচন হলো, তাই কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। কাজের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনার জন্য সরকারকে কিছু বিধি তৈরি করতে হবে। যেমন আমাদের মর্যাদা কী হবে সেটি ঠিক করে দিতে হবে। যেহেতু জেলার ভোটে নির্বাচিত হয়েছি, সে ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান স্থানীয় এমপির ওপরে না নিচে হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। তবে সবার কাজ ভিন্ন। এমপিদের কাজ আইন প্রণয়ন করা। উপজেলা চেয়ারম্যানরা জেলা পরিষদের মেম্বার হবে। আর জেলা পরিষদ প্রতিনিধিরা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে। ডিসির কাজ হবে প্রশাসন চালানো। তবে এসব সুষ্পষ্ট করতে না পারলে দ্বন্দ্ব দেখা দেবে।

নোয়াখালী জেলার ২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে নির্বাচিত সদস্য ফারুজ্জামান ফারুক বলেন, আমাদের পদের কর্মক্ষেত্র কতুটুকু, মর্যাদা বা ক্ষমতা কী, সেটা এখনো জানি না। নিশ্চয়ই কোনো না কোনো কাজ আমাদের থাকবে। বরগুনা জেলা পরিষদের সংরক্ষিত নারী (৫ নম্বর ওয়ার্ডের) সদস্য ফৌজিয়া খানম বলেন, আমাদের কাজ কী, সেটা জানি না। জেলা পরিষদ যেহেতু বড় একটি পরিসর, নিশ্চয়ই কাজ তেমনটি হবে। আর নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে কিছু না কিছু সম্মান তো নিশ্চয়ই পাব। অনুরূপভাবে শেরপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির বলেন, আমাদের কর্তব্য কী হবে, সেটা সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ধারণা আমার নেই। তবে নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণলয়ে এ বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছি। জেনেছি, আমাদের কাজের পরিধি ঠিক করে দেওয়া হবে। যতদূর বুঝতে পেরেছি, তাতে বলতে পারি, আগে যে জেলা বোর্ড ছিল, তার আদলে একটি পরিপূর্ণ পরিষদ হবে। আর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা যে মর্যাদা পাচ্ছেন, আমাদেরও সেই মর্যাদা দেওয়া হতে পারে।

আইনে পরিষ্কার কিছু নেই : জেলা পরিষদ আইনে জেলা পরিষদের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে কিছু ব্যাখ্যা দেওয়া থাকলেও পরিষদ সদস্যদের দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ধারণা দেওয়া নেই। আইনে এ বিষয়ে বিধিমালা প্রণয়নের কথা থাকলেও আইন প্রণয়নের পর গত ১৬ বছরে সরকার কোনো বিধিমালা তৈরি করতে পারেনি। জেলা পরিষদ আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০১৬) পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এতে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে তদারকিসহ ১২টি বাধ্যতামূলক এবং আরো অনেকগুলো ঐচ্ছিক কাজের কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলরদের কাজের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা নেই। এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব-কর্তব্য নির্ধারণের জন্য আইনে বিধি প্রণয়নের বিধান রাখা হয়েছে। তবে ২০০০ সালে আইন প্রণয়ন করা হলেও এখন পর্যন্ত বিধি তৈরি করা হয়নি।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালে জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলেও গত ৫ বছরে তাদের মর্যাদা বা কার্যাবলি স্পষ্ট করেনি সরকার। গত বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ পর্যালোচনা সভায় এলজিআরডিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, জেলা পরিষদের প্রশাসকরা যেসব অভিযোগ ও দাবি উত্থাপন করেছেন, তার সবই ঠিক। আমার ক্ষমতা থাকলে সবকিছু এখনই বাস্তবায়ন করতাম। আমার পক্ষে যেটুকু মানা সম্ভব, সেটুকু দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। এর আগে ২০১৩ সালের ২৬ আগস্ট জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বলেছিলেন, আবার সরকার গঠনের সুযোগ পেলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে। জেলা পরিষদ প্রশাসকদের ক্ষমতার পরিধিও বাড়ানো হবে। তিনি আরো বলেছিলেন, জেলাভিত্তিক চাহিদা অনুযায়ী উন্নয়ন করা হবে। কেন্দ্রের কাছে শুধু বাজেট এলোকেশন, পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে। জেলা পরিষদ প্রশাসকরা সব উন্নয়নকাজ তদারকি করবেন। ভবিষ্যতে জেলা পরিষদের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন দায়িত্বও দেওয়া হবে। তবে গত তিন বছরে এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

বিশেষজ্ঞদের চোখে অসংগতি : সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জেলা পরিষদের সংশোধিত আইনে বেশ কিছু ত্রুটি রয়েছে। আইনে প্রত্যেক জেলায় যে ১৫ ওয়ার্ড রাখার কথা বলা হয়েছে, তা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের আওতায় সংসদ যা খুশি তাই করতে পারে, সংবিধানের বাইরে নয়। কিন্তু এ আইনে জেলা পরিষদ কী কী কাজ করবে তা সুস্পষ্ট করা হয়নি। কেননা ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে সরকারের ১৩টি হস্তান্তরিত বিভাগ রয়েছে, উপজেলাতেই ১৭টি বিভাগ রয়েছে; কিন্তু জেলা পরিষদে তা করা হয়নি। এ ছাড়াও আমাদের সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে ‘প্রশাসন ও সরকারি কর্মচারীদের কার্য’-সম্পর্কিত দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের ওপর ন্যস্ত থাকা সত্ত্বেও, জেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও অন্যদের সাথে ডিসি-এসপিসহ জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কী ধরনের সম্পর্ক হবে তা এ আইনে কিছুই বলা নেই। এলাকা ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে জেলা পরিষদকে ওয়ার্ডে বিভক্ত করতে হবে। জনগণের সরাসরি নির্বাচনের অধিকার দিতে হবে। সংবিধানের ৫২ (২) এবং ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জেলা পরিষদকে কাজ দিতে হবে এবং সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা করার বিধান বাতিল করতে হবে।

অপর বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, যে আইনে নির্বাচন হয়েছে সে আইন অনুযায়ী জেলা পরিষদ চালাতে গেলে জেলা প্রশাসক ও জেলা পর্যায়ের অন্যান্য দফতরের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা তৈরি হবে। যেমন জেলা প্রশাসকের ৫০২টি কাজের একটি সুদীর্ঘ তালিকা রয়েছে। চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ডেপুটি কমিশনারের ওপর ন্যস্ত। এ ক্ষেত্রে জেলা পরিষদের সঙ্গে ডেপুটি কমিশনারের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কার্যক্রমে সমন্বয়ের প্রশ্ন দেখা দেবে। বর্তমান আইনি ব্যবস্থায় জেলা পরিষদের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় বা অন্য ৪৩টা দফতরÑ কারো সঙ্গে সম্পর্ক স্বচ্ছ নয়। এখানে সরকারকে আনুভূমিক কর্মসম্পর্ক বিবেচনায় নিয়ে বিধিমালা বা নির্দেশনা দিতে হবে। নতুবা শুরুতেই কর্মের আওতা ও অধিক্ষেত্র নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে। এ ছাড়া জেলা পরিষদে কমবেশি ৪০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও একটি জেলায় অরাষ্ট্রীয় বহু সংস্থা এবং ব্যক্তিখাতে বহু উন্নয়ন ও সেবাকর্ম রয়েছে। সেগুলোর সঙ্গেও জেলা পরিষদের আনুষ্ঠানিক আইনি সম্পর্ক স্থাপন করা হয়নি। জেলা পরিষদকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে জেলার সব মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে জেলা পরিষদের সম্পর্ককে সম্পূরক পরিপূরকভাবে গড়ে তোলার বিষয়টি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা যেতে পারে। একই সঙ্গে অনেক নির্বাচনী এলাকা এক হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের সঙ্গে ওই এলাকার চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলরদের নিজস্ব কর্ম-এলাকা এবং উন্নয়ন ইস্যু বা নিজস্ব কাজের বিষয় ও আওতা নির্ধারণে সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। এসব সংকট নিরসনে সরকারকে অবশ্যই বিধি তৈরি করে দিতে হবে।

পিডিএসও/মুস্তাফিজ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জেলা পরিষদ
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist