ব্রেকিং নিউজ

সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়াই পরিচ্ছন্নতার কাজ

প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২০, ০৮:২৬

হাসান ইমন

কোনো সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়াই কাজ করছেন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। অথচ বাসাবাড়ি ও হাসপাতাল থেকে সরাসরি আবর্জনা সংগ্রহের কাজ করছেন তারা। এমনকি নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর ব্যবহার করা সামগ্রীও সংগ্রহ করছেন ওই কর্মীরা। কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের প্রথম দিকে দুই সিটি করপোরেশন পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সুরক্ষাসামগ্রী দিলেও এখন খোঁজ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের। অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ভাতা দেওয়া হলেও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দেওয়া হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, তিন দফায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের হ্যান্ডস্যানিটাইজার, মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভস, বুটসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। কর্মীদের এসব সামগ্রী ব্যবহারে অনীহা আছে।

জানা গেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত আছেন প্রায় ১১ হাজার কর্মী। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় নিয়মিত বেতনভুক্ত ১ হাজার ৭০০ এবং দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে ৫ হাজার ৩০০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছেন। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) কাজ করছেন নিয়মিত স্কেলভুক্ত ২ হাজার ৭০০ এবং প্রাইভেট কোম্পানির ১ হাজার ৩০০ কর্মী। এছাড়া বাসা-বাড়ি, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ময়লা সংগ্রহ করছেন ওয়ার্ডভিত্তিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার কর্মী। মধ্যরাত থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত নগরীর প্রধান সড়কসহ অলিগলির সড়কগুলো পরিষ্কার করছেন তারা। এছাড়া ওয়ার্ডভিত্তিক ঠিকাদারের কর্র্মীরা অবর্জনা বা বর্জ্য সংগ্রহ করছেন বাসা-বাড়ি, হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকে আক্রান্ত রোগীদের বেশিরভাগই চিকিৎসা নিয়েছেন রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে। ফলে হাসপাতালের বর্জ্যসহ বাসাবাড়ির সুস্থ মানুষের ব্যবহৃত সুরক্ষাসামগ্রী সরাসরি সংগ্রহ করছেন সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। মধ্যরাত থেকে দুপুর পর্যন্ত আবর্জনা সংগ্রহ করে সেকেন্ডারি স্টেশনে নিয়ে যান তারা। এরপর সিটি করপোরেশনের ট্রাকে তোলেন সেসব আবর্জনা। সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কার্যালয়ে এসব পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য নেই হাত ধোয়ার কোনো সুবিধা।

গত কয়েক দিন ঘুরে কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মুখে মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভস, পায়ে জুতাসহ সুরক্ষাসামগ্রী দেখা যায়নি। কোথাও সড়কের ওপরে সংগৃহীত ময়লা রেখে সেখান থেকে খালি হাত দিয়ে কয়েক ভাগে ভাগ করছেন কেউ কেউ। সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার না করে বর্জ্য অপসারণ করায় অনেকেই চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, ক্যানসারসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে জানান কয়েকজন। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হলেও সিটি করপোরেশন থেকে চিকিৎসা সহায়তা মিলছে না।

ডিএসসিসির আওতাধীন খিলগাঁও এলাকায় কোনো রকম সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়াই কাজ করছিলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী আবুল বাসার। তিনি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে কিছু মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভস দিয়েছিল। এগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। আর যে বেতন পাই তা দিয়ে এসব সামগ্রী কেনার ক্ষমতা নাই।’ কাজ করতে গিয়ে অসুবিধা হয় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাজ করতে গেলে অনেক সময় ব্লেড দিয়া হাত-পা কেটে যায়, আবার মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়ি। কিন্তু কী করব, এইটা তো আমার কাজ। সব ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলা কাজ করতে হবে।’

ডিএনসিসির রামপুরা এলাকার পরিচ্ছন্নতাকর্মী শফিক প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের প্রথম দিকে সিটি করপোরেশন থেকে মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভসসহ কিছু সুরক্ষাসামগ্রী দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে আর খোঁজ নেয়নি। কয়েকবার গ্লাভস ও বুট চেয়েছি। দেবে বললেও এখনো পাইনি। এ ছাড়া এ কাজ করতে গিয়ে আমাদের অনেকে বিভিন্ন রোগে ভুগছেন।’

এদিকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সংগঠন স্ক্যাভেঞ্জার্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন বলছে, রাজধানীর বর্জ্য অপসারণ করতে গিয়ে ৪০ শতাংশ পরিচ্ছন্নকর্মী নানা জটিল রোগে আক্রান্ত। তারা কোনো সুচিকিৎসা পান না। রাস্তা পরিষ্কার করতে গিয়ে বহু কর্মী মারা গেছেন। তবুও সিটি করপোরেশনের বর্জ্য বিভাগ আধুনিকতার ছোঁয়া পায়নি।

এ বিষয়ে ডিএসসিসির স্ক্যাভেঞ্জার্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুল লতিফ প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সিটি করপোরেশন এপ্রিলের দিকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কিছু হ্যান্ডগ্লাভস ও মাস্ক দিয়েছিল। কর্মীরা সেগুলো ব্যবহার করে কিছুদিন কাজ করেছিল। এখন আর দেয় না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলতে পারেন কিন্তু আমরা একবারই সুরক্ষাসামগ্রী পেয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত আর পাইনি।’ তিনি আরো বলেন, ‘করোনা মহামারির সময় সিটি করপোরেশনের অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঝুঁকি ভাতা দিয়েছিল। আমরা ঝুঁকি ভাতার জন্য আবেদনও করেছিলাম। কিš ‘সেই ভাতা পাইনি।’

এ বিষয়ে ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ছিদ্দিকী প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সব সময়ই সুরক্ষাসামগ্রী দিয়ে আসছি। করোনার মধ্যেও ৩-৪ বার করে সুরক্ষাসামগ্রী দেওয়া হয়েছে। তাদরে আমরা বেশ কয়েকবার স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়ে ট্রেনিং দিয়েছি। তাদের কাছে পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী রয়েছে। তারা ব্যবহার করছে না। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বেশকিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর এম সাইদুর রহমান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, কয়েক দফায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সুরক্ষাসামগ্রী দেওয়া হয়েছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা এসব ব্যবহারে অনীহা প্রকাশ করছেন। তারা বেশি সময় মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভস, জুতা ব্যবহার করতে চান না। বিষয়টি নিয়ে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, সুরক্ষাসামগ্রী সিটি করপোরেশনে এখনো পর্যাপ্ত আছে। করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা এলে সঙ্গে সঙ্গে এগুলো বিতরণ করা হবে। এছাড়াও প্রয়োজনে এসব সুরক্ষাসামগ্রী পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।

পিডিএসও/হেলাল