রায়হান আহমেদ তপাদার

  ২৫ নভেম্বর, ২০২০

নাগরিক স্বপ্ন এবং বিশ্ব রাজনীতি

সারা বিশই একরকম স্থবির হয়ে পড়েছে করোনাভাইরাসের কারণে। এ মুহূর্তে সত্যিকার অর্থেই একটি বৈশিক ঘটনা বলা যায় এই ভাইরাসকে। এটি যেন সেই কথিত ইথার, যাকে দেখা না গেলেও থাকে সবখানেই। আর তাই অঞ্চল নির্বিশেষে ঘরে-বাইরে সব একাকার। জাতি-ধর্ম-বর্ণ কোনো পরিচয়ই একে প্রতিহত করতে পারছে না। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রায় সব দেশ এই ভাইরাসে আক্রান্ত। তবে নতুন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও এর বিশায়নের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে সম্ভবত সবচেয়ে বড় সংকটে পড়তে যাচ্ছে এককেন্দ্রিক বিশ্বকাঠামোর বর্তমান হর্তাকর্তা যুক্তরাষ্ট্র।

সম্প্রতি বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর এখন সারা বিশ্বে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। কেমন হবে আগামীর বিশ্বরাজনীতি। কারণ সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের নির্বাচনের ওপর বিশ্বরাজনীতির অনেক হিসাব-নিকাশ নির্ভর করে। নির্ভর করে ভবিষ্যৎ। ইতোমধ্যে অনেক দেশ হিসাব কষতে শুরু করেছে কে কতটা লাভবান হবে। আবার কারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।

বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ। তাদের সুদৃষ্টির ওপর অনেক দেশের ভালো থাকা নির্ভর করে। স্বাভাবিকভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক দেশের অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব পড়ে। পরিবর্তন আসে অনেকের ভাগ্যে। তাই এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু নতুন একজন প্রেসিডেন্ট পেল তা কিন্তু নয়। ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে এই নির্বাচনের ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হবে।

তবে সবকিছু নির্ভর করছে জো বাইডেন বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো হবেন নাকি নতুন কিছু করবেন। নতুন কিছু করলে তা কেমন হবে। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে জো বাইডেন নির্বাচিত হলেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট। ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি শপথ নেওয়ার পর আগামী ৪ বছর হোয়াইট হাউসের বাসিন্দা হয়ে যাবেন ৭৭ বছর বয়সি বাইডেন। মার্কিন ইতিহাসে রেকর্ডসংখ্যক ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন তিনি। এর আগে এত বিপুলসংখ্যক ভোট কেউ পাননি। সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে বাইডেন এখন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বয়সি প্রেসিডেন্টও। বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসন। যিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়ে চার বছর কাটিয়েছেন হোয়াইট হাউসে। বাইডেনের হাতে আগামীর বিশ্ব রাজনীতির অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রিত হবে। সমকালীন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট বলে কথা! যদিও বিশ্ব মোড়লের সেই দাপট অনেকটাই স্তিমিত। সে ক্ষেত্রে আরো বড় প্রশ্ন—বাইডেন কি পারবেন দেশের সেই সম্মান ফিরিয়ে আনতে? পারবেন বিশ্ব রাজনীতিকে মুঠোয় নিয়ে দেশ শাসন করতে?

জো বাইডেন ক্ষমতায় আসায় ভারতীয়রা আশা করছেন এইচওয়ান-বি ভিসা আবার চালু হবে। আর অনুমোদনহীন ভারতীয়রা হয়তো স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ পাবেন। ট্রাম্প জামানায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশটির নাম ইরান। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে দেশটির অর্থনৈতিক ভীত দুর্বল করে দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে জো বাইডেন যেহেতু পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী সে ক্ষেত্রে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যেতে পারে। বাইডেনের জয়ে তাই আশার আলো দেখছে ইরান। যদিও হুয়াওয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংঘাত হয়তো একটি রাষ্ট্রনায়কের জন্য বেমানান, তবে চীনের ক্ষেত্রে আমেরিকার নীতির বড় কোনো পরিবর্তন হয়তো দেখা যাবে না। সৌদি আরবের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা ছিল চোখে পড়ার মতো। ট্রাম্পের জন্য বহুমূল্য উপহারের স্তূপ বানিয়ে ফেলতো সৌদি আরব। কিন্তু বাইডেনের সঙ্গে এই প্রেম কেমন জমবে তা সময়ই বলে দেবে। ওদিকে আশায় বুক বাঁধতে পারে ফিলিস্তিনের জনগণ। কেননা ট্রাম্প তাদের সঙ্গে প্রশাসনিক সম্পর্ক বন্ধ করে দিলেও বাইডেন সরকার তা পুনঃস্থাপনে আগ্রহী। বিশেষ করে পশ্চিম তীরে ট্রাম্পের নীতির যে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে এটা নিশ্চিত। ফলে ট্রাম্পের পরাজয়ে ফিলিস্তিনি জনগণ বিজয় উৎসব করতেই পারে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে ওই একটি কথাই সত্য যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ! অর্থাৎ আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট হয়তো পরিবর্তন হয়, তবে পররাষ্ট্রনীতির খুব একটা পরিবর্তন হয় না। যদিও তৃতীয় বিশ্বের জনগণ হয়তো আগের চেয়ে কিছুটা সহজে আমেরিকার ভিসা পাবে এটুকু ধারণা করা যায়। বর্ণবাদের উগ্রচর্চাও হয়তো কমবে, আগের মতো জাতীয়তাবাদের চর্চাও হয়তো আর দেখা যাবে না দেশটিতে কিন্তু আমেরিকা তার হারিয়ে ফেলা সম্মান বা ক্ষমতা উদ্ধারে যে মরিয়া হয়ে উঠবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। সে ক্ষেত্রে চীন বরাবরের মতোই দেশটির চক্ষুশূল হয়েই থাকবে।

এমনকি পশ্চিমবঙ্গের গত লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে এসে বিজেপি নেতা অমিত শাহ বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারীদের উইপোকার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। সেই তুলনা দুই দেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। আবার সেই উইপোকার তুলনা এসেছে! তবে এবার ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক সমন্তক ঘোষ নিজেদেরই উইপোকার সঙ্গে তুলনা করেছেন। বিজ্ঞজনরা জানেন আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে সাধারণত খুব একটা পরিবর্তন হয় না। যদিও ট্রাম্পের রাষ্ট্রনীতি ছিল একগুঁয়ে। করোনাভাইরাসের ব্যাপকতা ছড়িয়ে দেওয়ার দায় চীনের ওপরে না দেওয়ায় ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন থেকে বের হয়ে যাওয়া, চীনা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এমন অনেক পদক্ষেপ তিনি নিয়েছেন যা আমেরিকার রাষ্ট্রনীতির সঙ্গে যায় না। আমেরিকান জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে চলার নীতিতে ট্রাম্প ছিলেন অনেকটাই একরোখা। ফলে বর্ণবাদও তার আমলে ভিন্নমাত্রা পায়। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদের ঘুঁটিতে পারদর্শী আরেক নেতা নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ট্রাম্পের ‘ব্যক্তিগত’ সম্পর্ক ভালো ছিল। ফলে একে অপরের দেশ সফরের সময় সংবর্ধনা হিসেবে পেয়েছেন ‘হাউডি মোদি’ এবং ‘নমস্তে ট্রাম্প’ নামে ভিন্ন আয়োজনের অনুষ্ঠান। যদিও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, মোদি-ট্রাম্প উষ্ণ সম্পর্কে ‘হাউডি মোদি’ ছাড়া আর তেমন কোনো অর্জন নেই। বরং ট্রাম্প ভারতীয়দের সবচেয়ে লোভনীয় ভিসা এইচওয়ান-বি বন্ধ ঘোষণা করেছিলেন। রপ্তানির ওপর আরোপ করেছিলেন বিভিন্ন শুল্ক। ফলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে এই উষ্ণ সম্পর্ককে কটাক্ষ করে বলা হতো-ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে মোদির সঙ্গে ট্রাম্পের বন্ধুত্ব ছাড়া কোনো অর্জন নেই।

ডোনাল্ড ট্রাম্প গত চার বছর ইমিগ্রান্ট ভিসা প্রায় বন্ধ করে রেখেছিলেন। যে কারণে অনেকের আইনগতভাবে বৈধতা পাওয়া সম্ভব হয়নি। জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ায় অভিবাসীপ্রত্যাশীরা নতুন করে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছেন। স্বপ্ন বোনার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। কেননা, নির্বাচনের আগে জো বাইডেন অঙ্গীকার করেছেন, তিনি নির্বাচিত হলে ইমিগ্রান্ট ভিসা আবার চালু করবেন। এখন হাজার হাজার বাংলাদেশিসহ অসংখ্য অভিবাসী প্রত্যাশীর স্বপ্ন পূরণ হওয়ার দরজা খুলে যাওয়ার অপেক্ষা। শুধু অভিবাসীপ্রত্যাশীদের জন্য নয়। বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ক্ষেত্র আরো প্রশস্ত হলো; যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় ছিল কড়াকড়ি। বারাক ওবামার সময়ের শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার সুযোগ যেমন প্রসারিত ছিল, এবার তেমন কিছুর প্রত্যাশা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের। এ ছাড়া ব্যবসা ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন অনেকে। অতীত ইতিহাসে দেখা যায়, রিপাবলিকানদের চেয়ে ডেমোক্র্যাটরা উপমহাদেশে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বেশি হস্তক্ষেপ করে। এ ক্ষেত্রে জো বাইডেন অতিতে ফিরে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। যা ট্রাম্পের সময়ে অনেক কম ছিল।

তবে ট্রাম্পের সরকার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বেশি হস্তক্ষেপ করেনি। কিন্তু জো বাইডেনের বেলায় তা বৃদ্ধি পেতে পারে এমন আশঙ্কা অনেকের। তবে এসব কিছুকে ছাপিয়ে নতুন কিছুর প্রত্যাশা বাইডেনের কাছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে সব আমেরিকানের প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠার অঙ্গীকার করেছেন তিনি। নির্বাচিত হওয়ার পর তাৎক্ষণিক এক টুইট বার্তায় এমন মন্তব্য করে বাইডেন লিখেন, হে আমেরিকা, মহান এই দেশকে নেতৃত্ব দিতে আমাকে নির্বাচিত করায় আমি সম্মানিত। কেউ ভোট দিক আর নাই দিক, তার প্রতি যে বিশ্বাস রাখা হয়েছে ভবিষ্যতে সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করবেন বলেও জানান বাইডেন। পাশাপাশি জো বাইডেন ক্ষোভ আর তিক্ত তাকে পেছনে ফেলে ঐক্যবদ্ধ জাতি গড়ার ডাক দিয়েছেন। বাইডেনের এমন আহ্বানে বিশাসী যুক্তরাষ্ট্রবাসী। বিশ্ববাসীও স্বপ্ন দেখছে যুদ্ধ নয়, শান্তিময় একটি বিশের। তবে যাই হোক, এ মুহূর্তে কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি এবং করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে আগামী দিনগুলোয় এ লড়াইয়ে যে নেতৃত্ব ধরে রাখতে পারবে, বৈশ্বিক নেতৃত্বও তার দিকেই ঝুঁকবে নিঃসন্দেহে। তবে ছূড়ান্ত সমীকরণ যা-ই হোক বা লড়াইয়ে বিজয়ীর নাম যা-ই হোক না কেন, তার পক্ষে চীনকে অস্বীকার করাটা আর বোধ হয় সম্ভব হবে না। বরং তার সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমেই পরবর্তী বিশ্বকাঠামোটি নির্মিত হবে বলা যায়। এ এক নীরব যুদ্ধ, বিশের কোটি মানুষকে বাঁচানোর ছলনায় যা বিশ্ব শাসনের এক লড়াই বললে ভুল বলা হবে না।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল

বিশ্ব রাজনীতি,নাগরিক,যুক্তরাষ্ট্র
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়