এম এ মাসুদ

  ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২১

একটি অন্যরকম রাত, অন্যরকম দিন!

উত্তেজনায় ঘুম যেন আসছিল না সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া নিরবের। আসবেই বা কিভাবে! রাত পোহালেই অনেক দিন পর যে স্কুল খুলছে তার। সেই ছোটবেলা থেকে এমনিতেই কোনো দিন স্কুল মিস করতো না সে। পড়তো স্থানীয় আ. মজিদ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে। অনেক পুরোনো স্কুল। পড়াশোনায়ও প্রতিযোগিতা বেশ। মা-বাবা কোথাও যেতে চাইলে যেতেও চাইতো না, করতো কান্না। কারণ কোথাও বেড়াতে গেলে যে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়বে সে। আর কান্না করতো বলে মা-বাবার বেড়ানোও হতো না কোথাও।

শনিবার বিকেল বেলা। নিরবের মনে পড়ে যায় তার স্কুল ড্রেসের কথা। প্রায় দেড় বছর হলো ড্রেস পরা হয়নি তার। নষ্ট হয়নি তো ! কারণ সকাল হলেই যে তার স্বপ্নের স্কুল খুলছে। যেতে হবে ড্রেস পরে। মাকে বের করে দিতে বলে সেই ড্রেস যা সে ১৮ মাস আগে পড়েছিল। বলা মাত্রই বের করে দেন মমতাময়ী মা। পরিধান করে ড্রেসিংটেবিলে নিজেকে দেখে নেয় সে একি! শার্ট প্যান্ট দু'টোই যে একেবারে ছোট হয়ে গেছে তার। কিভাবে বুঝবে ছোট নিরব! আঠার মাস তো কম সময নয়! এই সময়ের মধ্যেই সে যে বেড়ে উঠেছে বেশ।

শার্ট, প্যান্ট ছোট হয়ে যাওয়ায় বাবার নিকট বায়না ধরে সে নতুন ড্রেসের জন্য। কিন্তু ওতো জানেনা তার বাবা স্বল্প মাইনে পাওয়া একজন লেকচারার মাত্র। মেডিকেল কলেজ পড়ুয়া ছেলের পড়াশোনার ব্যয়, নিরবের টিউটরের মাসিক বেতন পারিবারিক ব্যয় মেটাতে হিমসিম খেতে হয় লেকচারার বাবাকে। অভাব যেন পিছু ছাড়ে না তার। একটার পর একটা লেগেই আছে। ছোট্ট নিরবকে বুঝিয়ে বলে চাহিদা পুরণে অক্ষম বাবা। বলে আব্বু, এইতো আর মাত্র তিনটে মাস। ভালো করে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করো, ভালো রেজাল্ট করো। জানুয়ারিতে নতুন ক্লাসে উত্তীর্ণ হলেই নতুন ড্রেস নিও।  বাবার অসহায়ত্বের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে মাথা দুলিয়ে বাবার কথায় সায় দেয় সে।

কখন সকাল হবে, ঘুম যে আসছে না তার। এমন নানা ভাবনায় এক সময় পরশ বুলিয়ে দেয় নিদ্রা দেবী। ঘুমিয়ে পড়ে সে। ফজরের আজান হয়েছে। মা ডেকে দেয় নামাজ পড়তে। ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে নেয় সে। নাস্তা শেষে পড়তে যায় গৃহ শিক্ষকের কাছে। ৯টা নাগাদ বাসায় ফিরে সেকি তাগাদা তার। বাথরুমে ঢুকে পাঁচ মিনিটে স্নান সেরে নেয় সে। তারপর দ্রুত খেয়ে নিয়ে সেই ছোট হয়ে যাওয়া ড্রেস পরিধান করে স্কুলের পথে বেড়িয়ে পড়ে নিরব। আজ চোখে পড়ছে শিক্ষার্থীদের দলবেধে যাওয়ার সেই চিরচেনা রূপ। শিক্ষকদেরও দেখা যায় সকাল সকাল স্কুল, কলেজ মাদ্রসায় যেতে। সব মিলে সকল শিক্ষার্থী শিক্ষকদের নিকট খোলার আগের রাত এবং আজকের দিনটি একটি অন্যরকম রাত অন্যরকম দিন যা পরবর্তী প্রজন্মের নিকট হবে গল্পের খোরাক।

শুধু নিরবই নয়, তার মতো লাখ লাখ নিবর যে দীর্ঘ বন্ধের পর তাদের প্রিয় স্কুলে যেতে উৎসাহিত ছিল বলার অপেক্ষা রাখেনা তা।

তারাও হয়তো নিরবের মতো ঘুমোতে পারেনি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় যাওয়ার উত্তেজনা নিয়ে। হয়তোবা স্কুল ড্রেসও ছোট হয়েছে কারো কারো। বিশেষ করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে অধ্যয়ন করছে এমন শিক্ষার্থীদের পরিবর্তন হয়েছে শারীরিক গঠন, ছোট হয়েছে তাদের ড্রেস। অনেকের বাবা হয়তো তার প্রিয় সন্তানটির জন্য কিনে দিয়েছেন নতুন পোশাক, অনেক বাবাই হয়তোবা পারেননি।

সে যাই হোক, কমতে শুরু করেছে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ। খুলেছে প্রাথমিক, মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আবার ফিরেছে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। প্রাণ ফিরেছে শ্রেণি কক্ষ ক্যাম্পাসে। দয়াময় আল্লাহ দূর করে দিবেন করোনাভাইরাস। বন্ধ হবে না আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সেই প্রত্যাশা সবার।

লেখক : সুন্দরগঞ্জ প্রতিনিধি, দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ

পিডিএসও/ জিজাক

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
করোনাভাইরাস,মহামারি,স্কুল,ড্রেস,স্কুল ড্রেস
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close