রাহাত খানকে স্মরণ

‘হে অনন্তের পাখি’

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৯:১৮ | আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:১০

মনসুর হেলাল
রাহাত খান (১৯ ডিসেম্বর ১৯৪০, ২৮ আগস্ট ২০২০)

লেখকদের বিরুদ্ধে পাঠকদের প্রথম অভিযোগ লেখা দুর্বোধ্য। বুঝতে কষ্ট হয়। দেশে-বিদেশে বড় বড় লেখকের অনেকে এই অভিযোগে অভিযুক্ত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম একমাত্র রাহাত খান। তার যখন যে লেখাই পাঠকের হাতে পৌঁছেছে, সেটি গল্প কিংবা উপন্যাস; পাঠক তা সাদরে গ্রহণ করেছে। কারণ রাহাত খান ছিলেন সাহিত্যের এমন এক নির্মাণসৈনিক, যিনি সারা জীবন তার আয়ুর সঙ্গে, জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। বাংলা কথাসাহিত্যের নতুন ভাষাশৈলী নির্মাণ ও ভঙ্গি তৈরির অগ্রণী সৈনিক ছিলেন তিনি, ছিলেন অসাধারণ কথাশিল্পী। বাংলা সাহিত্যে প্রাঞ্জল ভাষা রীতির প্রচলন তার হাত দিয়েই। রাহাত খানের গদ্যের ভাষা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম, গতিময়তায় ভরপুর। নিজের লেখা নিয়ে রাহাত খান সব সময় এমন ধারণা পোষণ করতেন, ‘আমি আসলেই একজন লেখক। আর একজন লেখক সব সময় চান তার লেখাটি যেন ভালো হয়।’ পাঠকের প্রতি এমনই ছিল তার দায়বদ্ধতা। আর পাঠকেরও ছিল নানা কৌতূহল। তার গদ্যের রূপ-রস আস্বাদনে পাঠকরা হয়ে উঠত নতুন নতুন কল্পনাভিসারি।

একুশে পদকজয়ী এই অমর কথাসাহিত্যিকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ১৯৪০ সালের ১৯ ডিসেম্বর, কিশোরগঞ্জের একেবারেই প্রান্তিক গ্রাম জাওয়ারে। তখন জাওয়ার মাইনর স্কুলে পড়তেন তিনি। তারপর ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে সুযোগ পেলেও ভর্তি হলেন মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে। এই স্কুলে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, সাহিত্যিক, রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমদসহ অনেক খ্যাতিমানই পড়েছেন। তখন এটিই ছিল ওখানকার সবচেয়ে নামকরা স্কুল। পরবর্তীকালে স্কুলটির শতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে তাকে প্রধান অতিথি করায় বেশ অবাক হয়েছিলেন তিনি। রাহাত খান পড়াশোনার চেয়ে গল্পের বই পড়তেন বেশি। লেখক হিসেবে তার গুরু ছিলেন সুবোধ ঘোষ, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় আর প্রেমেন্দ্র মিত্র। সুবোধ ঘোষের ‘জতুগৃহ’, ‘অযান্ত্রিক’ গল্পগুলো তাকে খুব অনুপ্রেরণা দিয়েছে; আবার নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘রস’ গল্পটিও। এসব গল্প পড়ে তার মনে হতো, এ রকমই লিখতে হবে। তখন আনন্দমোহন কলেজ বার্ষিকীতে ‘নিভু নিভু’ শিরোনামে তার একটি গল্প প্রকাশিত হয়। এর আগেই অবশ্য পত্রিকায়, বিশেষ করে ‘আজাদ’-এ লেখা ছাপা হয়েছে তার। পঞ্চাশের দশকে অনেক গল্প লিখেছেন তিনি।

১৯৫৯ সালে ঢাকায় আসেন। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। থাকতেন ফজলুল হক হলে। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, জিয়া হায়দার, কাজী আনোয়ার হোসেন... এরা সবাই ছিল তার সহপাঠী এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বছরের পাঠ শেষ করে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন ময়মনসিংহের একটি কলেজে। এরপর জগন্নাথ কলেজে। ঢাকায় তখন তিনি প্রতিষ্ঠিত লেখক হিসেবে পরিচিত। কামাল বিন মাহতাব সম্পাদিত ‘ছোটগল্প’ পত্রিকার অফিসে এক দিন আহমদ ছফা তাকে দেখে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আপনার সব গল্প পড়েছি। ঠিকানা জোগাড় করতে পারিনি বলে চিঠি লিখতে পারিনি।’ জগন্নাথ কলেজে তার সহকর্মীদের মধ্যে ছিলেন শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আজহারুল ইসলাম, শামসুজ্জামান খান। ব্যাচেলরস কোয়ার্টারে রাহাত খান ও শামসুজ্জামান খান এক রুমে থাকতেন। পাশেই থাকতেন ইলিয়াস।

১৯৬৯ সালে দেশে তখন গণ-আন্দোলন চলছে। এই আন্দোলনের পক্ষে জোরালো ভূমিকা ছিল তার। সেই অপরাধে তাকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়। কিন্তু ঢাকা ছেড়ে যাবেন না বলে অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে দিন-রাত কাজী আনোয়ার হোসেনের অফিসে সময় কাটাতেন। ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের পর দৈনিক ইত্তেফাকে যখন নতুন করে বের হলো, তখন ইত্তেফাকের বার্তা ও নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন শহীদ সিরাজউদ্দীন হোসেন। বলতে গেলে তার হাত ধরেই রাহাত খানের সাংবাদিকতা জীবন শুরু। প্রথমে সহকারী সম্পাদক এরপর সম্পাদক হন ২০০৭ সালে। তার আগে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন প্রায় ১৫-১৬ বছর। সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে রাহাত খান বলেন, তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) তখন ‘ইত্তেফাক’-এর সম্পাদক। তার সাহসের কাছে কোনো কিছু দাঁড়াতে পারত না। তার রুমেই ছিল সম্পাদকীয় বিভাগ। ঠিক ১০টায় অফিসে এসে আমাকে ছাড়া আর কাউকে পেতেন না। দু-তিন মাস পর এক দিন সিরাজ ভাইকে বললেন, ‘এই ছেলেটির ওপর একটু চোখ রেখো। ওর ভবিষ্যৎ ভালো।’ ১৯৭৮ সালে ইত্তেফাক থেকে তখন বের হয় সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘রোববার’। এটির নেপথ্যে ছিলেন তিনি। কবি রফিক আজাদসহ অনেককেই সাপ্তাহিকটিতে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। ইত্তেফাকের পর দৈনিক বর্তমান ও শেষে প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮০ সালে তার সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাস ‘হে অনন্তের পাখি’ রোববারে ছাপতে শুরু করেছিলেন। রাহাত খানের প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে, কিশোর উপন্যাস ‘দিলুর গল্প’। প্রথম উপন্যাস ‘অমল ধবল চাকরি’ ১৯৮২-৮৩ সালে লেখা। ১৯৭৩ সালে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে অর্জন করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। তত দিনে একটা ছোটগল্পের বই বেরিয়েছে। নতুন ধারার গল্প ছিল। তার ‘ঈমান আলীর মৃত্যু’ গল্পটি তখন খুব বিখ্যাত হয়েছিল। তিনটি পত্রিকায় এটি নিয়ে নিউজ হয়েছিল। ইলিয়াসের কাছে কেউ গেলেই তিনি গল্পটি পড়তে বলতেন।

নিজের লেখা নিয়ে রাহাত খানের উপলব্ধি ছিল এমন ‘কিছু উপন্যাস চাপে পড়ে লিখেছি, সেগুলো ধর্তব্যের মধ্যে রাখি না। একসময় দেখলাম, খুব জনপ্রিয় হয়ে যাচ্ছি। কেউ কেউ আমাকে জনপ্রিয় লেখকদের তালিকায় তুলে দিচ্ছে। আমার খুব মন খারাপ হয়ে গেল। আমি তো সাহিত্য করতে চাই। ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য ধারার পথটি বেছে নিয়েছি। ‘হে অনন্তের পাখি’ বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর যে আবহ, কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষায় ‘জাতীয় পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন’দের কারো কারো আবার রাজনীতিতে আসতে শুরু করা, সেই বিশেষ সময়কালটিকে নিয়ে লেখা। ‘এক প্রিয়দর্শিনী’ আমার মেয়ের প্রিয় উপন্যাস। কোনো একটা সত্য ঘটনা নিয়ে লেখা। তবে লেখক তো সত্য ঘটনাকে অনেক কল্পনা, অনেক রং-রস মিশিয়ে লেখেন। নিজের সব লেখাই ছাপা হওয়ার পর আমি অপছন্দ করেছি। যা লিখতে চেয়েছিলাম, তা তো পারলাম না—এই উপলব্ধি থেকে পড়িইনি। এটা লেখক ছাড়া অন্য কেউ বুঝবে না। কিছু উপন্যাসের দিকে তাকিয়ে এখনো ভাবি, আরেকটু সময় নিয়ে, আরেকটু চিন্তা করে যদি লিখতাম, তাহলে আরো দাঁড়িয়ে যেত।’

দীর্ঘ আট দশকের এক বর্ণাঢ্য জীবন ছিল রাহাত খানের। এ সময় তিনি গল্প-উপন্যাস এবং মুক্তিযুদ্ধের ওপর লিখেছেন গান। তার প্রথম উপন্যাস ‘অমল ধবল চাকরি’। উল্লেখযোগ্য উপন্যাস‘এক প্রিয়দর্শিনী’, ‘ছায়াদম্পতি’, ‘হে সুনীতি’, ‘সংঘর্ষ’, ‘শহর’, ‘হে অনন্তের পাখি’, ‘মধ্যমাঠের ফুটবলার’, ‘আকাক্সক্ষা’ ‘কয়েকজন’ ও ‘অগ্নিদাহ’।

সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৬ সালে তিনি একুশে পদক পান। এ ছাড়া ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি পুুরস্কার, ১৯৭৯ সালে সুফি মোতাহার হোসেন অ্যাওয়ার্ড, মাহবুবুল্লাহ জেবুন্নেসা ট্রাস্ট অ্যাওয়ার্ড, আবুল মনসুর মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড, ১৯৮২ সালে হুমায়ুন কাদের মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড, সুহৃদ সাহিত্য অ্যাওয়ার্ড, ট্রাই সাহিত্য অ্যাওয়ার্ড, চেতনা সাহিত্য অ্যাওয়ার্ড উল্লেখযোগ্য।

তার পরও বলতে হচ্ছে, বাংলাদেশের সাহিত্যে রাহাত খানের সঠিক মূল্যায়ন এখনো হয়নি। তার সাহিত্যের মৌলিক জিজ্ঞাসা বাংলাদেশের নবগঠিত সমাজ জীবনের সংঘাতএসব প্রসঙ্গ এখনো অনালোচিত রয়ে গেছে। বাংলাদেশে তিনিই প্রথম কথাসাহিত্যিক, যিনি যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনীতির পাকচক্রে বদলে যাওয়া সমাজ জীবনের ক্রোধ-লোভ-হতাশা-যৌনতা-প্রত্যাশা এসব কিছুকেই গদ্যের ফ্রেমে

ধারণ করতে চেয়েছেন। তবে এই সবকিছু ছাপিয়ে গত ২৮ আগস্ট শুক্রবার ২০২০ তার পরলৌকিক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল। মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন রাহাত খান। তিনি নিজেই তার এক লেখায়

বলেছিলেন, ‘সাহিত্যিকদের কোনো মৃত্যু নেই।’ সে কথার রেশ ধরে আজ আমাদেরও বলতে হচ্ছে, কথাসাহিত্যিক রাহাত খানেরও মৃত্যু নেই। আমাদের মাঝে চিরদিন বেঁচে থাকবেন হে অনন্তের পাখি।

লেখক : ছড়াকার, কবি ও প্রাবন্ধিক
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল