ছাত্রদের হাতে গড়া বাড়িতেই কাটছে গোপাল স্যারের জীবন

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০১৮, ১৫:১৫ | আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০১৮, ১৫:৩৯

এস আর শানু খান, সংবাদকর্মী
ama ami
ছাত্রদের করে দেওয়া ঘরের সামনে গোপাল স্যার

বিকালের ঘটনা। প্রথমে ভেবেছিলাম রাস্তা থেকেই জুম করে একটা ছবি তুলে নিবো। গোপাল স্যারের বাড়ির ছবি। ইদানিং কোনও লেখায় শিক্ষক ও ছাত্রের কথা আসলেই মনে পড়ে যায় গোপাল স্যার ও তার ছাত্রদের কথা। নিজের অজান্তেই টেনে আনি এই উদাহরণটা। অনুস্বরণীয় এক উদাহরণের কথা। ৮২ বছর বয়সী একজন শিক্ষককে ছাত্ররা কতখানি ভালোবাসলে এবং সবচেয়ে বড় কথা হলো একজন শিক্ষক কতখানি যোগ্য ও উন্নতমননশীল হলে ছাত্ররা তাকে বাড়ি বানিয়ে দেন! 

 
ফুলের বাগানে গোপাল স্যার

 

একটা গল্প লিখেছি বেশ কয়েকদিন হয়ে গেছে। গল্পটাকে পত্রিকায় পাঠানোর জন্য গোপাল স্যারের বাড়ির ছবিটা খুবই জরুরি ছিল। কিন্তু হয়ে উঠছিল না সে ছবি তুলতে যাওয়া। কথায় আছে না সেজে গুজে কোনও কাজ করা সত্যিই কঠিন। বিকালে হুট করে কি মনে হলো গিয়ে হাজির হলাম। বাড়ির ভিতর ঢুকতেই কানে এলো স্যার কিছু একটা পড়ছেন। আমি কোনও কথা না বলে একটু উঁচু হয়ে দেখলাম স্যার পড়ছেন। আমি ভাবলাম এই সুযোগে ছবি তুলে বিদায় হই। স্যার টের পেলে অনেক সময় থাকতে হবে। তাছাড়া স্যার অনেক কষ্টের কথাও বলবেন। কেউ খোঁজ নেই না। একটু শোনেও না কেমন আছেন। রাস্তা ঘাটে দেখা হলেই চরম ভক্তি কিন্তু বাস্তবে যে কেমন আছি সেটা কেউ জানতে চাই না দেখতে চাই না। এমন সব কথা বলবেন। কথা গুলো শুনলে খুব খারাপ লাগে। কি করা ব্যস্ত ধরনীতে সবাই নিজের জীবিকার টানে ব্যস্ত। ইচ্ছা থাকলেও অনেক কিছু সময়ের অভাবে হয়ে উঠে না। 

স্যারের ছোট ভাই রান্না ঘরে কিছু একটা করছিলেন। আমার দিকে তাকাতেই আমি ইশারায় বোঝাতে চাইলাম কথা না বলতে কিন্তু উল্টে তিনি উচ্চ স্বরে বলে উঠলেন বোবা মানুষের মত ওসব করছো কেন। ভগবান জবান দেছে সব সময় জবান দিয়ে টনটনা কথা বলবা। ব্যাচ গোপাল স্যার বললেন কে? কে রে খোকন?
-আমি শানু স্যার। ভালো আছেন।
-এ তুই কথা বলবি না। দশ দিন তুই বলেছিলি যে কাল আসবানে। কাল আসবানে। তোর কথার কোনও দাম নাই। এক বছর পরে একদিন এসে স্যার কেমন আছেন জিজ্ঞেস করে কি লজ্জা দিস। 

 
স্যার হাসনাহেনা ফুল দেখাচ্ছেন

 

আমি কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। স্যার বললেন আয় উঠে আয়। কাছে আয়। বস কথা আছে। স্যার শুয়ে শুয়ে শ্রী শ্রী চন্ডী নামক একটা বই পড়ছিলেন। পাশে একটা বড় বাংলা অভিধানের বই। বইটার দিকে তাকাতেই স্যার বললেন ওটা বারোই পাড়ার রামা নন্দী উপহার দিয়েছেন। ভালো বই। মুখ ভেঙচিয়ে বললেন কি আর করবো তোরাতো সব ব্যস্ত মানুষ তোদের সময়ের বিরাট দাম। একটু যে এসে দেখে যাবি সে কপালও আমার না। 
-না স্যার আসলে..
কথা শেষ না করতেই স্যার বললেন - আসলে, আসল কথা হলো বুড়ো হলে মানুষ হয়ে পড়ে মূল্যহীন। বোঝা স্বরুপ। সবাই এড়িয়ে চলতে চাই। বাবা প্রায়ই এ কথা বলতেন। আমার বাবা ছিলো পন্ডিত মানুষ। আমার বাবাও ঠিক আমার গংগারামপুর প্রসন্ন কুমার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাষ্টার ছিলেন। তাইতো বই পড়াটাকেই বেছে নিয়েছি। যখনই আর ভালো লাগে না। বই নিয়ে বসি। বই পড়ি। স্যারের মাথার কাছে টিপ টিপ শব্দে চলছিলো একটা দেয়াল ঘড়ি। ঘড়িটার বয়স জানতে চাইলে স্যার বললেন বিশ বছর আগে কেনা। তখন চাকরি ছিলো। এখনও ভালো আছে। ঘড়ির কথা তুলতেই স্যার উঠে বসে দেয়ালে টানানো একটা হাত ঘড়ি নিয়ে এসে দেখালেন এটা শিক্ষক হিসাবে শেষ সময়ে দিয়েছেন আমার স্কুল। ঘড়ি দেখাতে গিয়ে দেখালেন স্কুল থেকে বিদায় শ্মরণে দিয়েছেন এক শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাতে স্বল্প বিস্তরে লিখা রয়েছে স্যারের শিক্ষকতা জীবনের নানা উপার্জন।

স্যার এবার বললেন চল নিচে চল। তোকে নতুন কিছু দেখায়। তুইতো অনেকদিন আসিস না। আমি ফুলের বাগান করেছি। যদিও ফুলের গাছ এ বাড়িতে নতুন কিছু নয়। আগা গোড়া থেকেই এ বাড়িতে বিভিন্ন ফুলের উপস্থিতি রয়েছে। তার পরেও সেগুলোর সাথে আরও নতুন কিছু যোগ করে এক জায়গায় করার চেষ্টা করেছি। ঘরের সামনেই ফুলের বাগান। বাগানে চন্দ্রমল্লিকা ফুলগুলো বাতাসে দুলছিলো। দেখে মনে হচ্ছিল স্যারের উপস্থিতিতে বোধ আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠছে। পুরো বাড়ি গন্ধরাজের মাতাল করা গন্ধে মাতোয়ারা। একটা নয় অনেকগুলো গন্ধরাজ ফুলের গাছের সমোরোহ স্যারের বাড়িতে। রয়েছে অতসী ফুল গাছও। অতসী ফুলকে আঞ্চলিক ভাষায় আমরা অবশ্য নোলা ফুলই বলে থাকি। নোলা ফুলগুলো বাতাসের সাথে সাথে ঝন ঝন করছিলো। হঠাৎ করে স্যার বলে উঠলেন নাইট কুইনও আছে। সঙ্গে সঙ্গে বললেন নাইট কুইন কোনও ফুলকে বলা হয় বলতো? আমি বললাম হাসনাহেনাকে। পাশেই ছিলো হাসনাহেনা ফুলের গাছ। গাছ ভর্তি ফুলের চিহ্ন থাকলেও ওগুলো মুলত ফুলের সংকুচিত রুপ। ওরা রাতে ফোটে। হাসনাহেনা ফুলের নেশা ধরানো সুঘ্রাণ।
 
বই পড়ছেন গোপাল স্যার

স্যার বললেন এই ফুলের ঘ্রাণে মাতাল হয়ে নাকি সাপ এসে থাকে এই গাছে। স্যার বললেন, বিজয় সরকারের গানেও অনেকবার হাসনাহেনা ফুলের কথা বলেছেন। বাড়ির চারপাশে রয়েছে অনেক পুরানো শিউলী ফুলের গাছ। স্যারের কথায় গাছগুলো পুরানো গাছেরও পুরানো। স্যারের পুরো বাড়ি বেষ্টন করে রেখেছে হরেক রকমের পাতা বাহারি গাছ। যেটাকে স্যার বললেন, ওরনামেন্টাল প্লান্ট। এগুলোর বয়স ২৫ বছর বললেন স্যার। এছাড়াও রয়েছে বকুল ফুলের গাছ। রয়েছে বেলি ফুলের গাছ। স্যারের ফুল বাগানে একটু অন্যরকম ফুলের দেখা পেলাম। যেটাকে আগে কখনও দেখি নাই। স্যারও ওটার নাম বলতে পারলেন না। উঠানের দক্ষিণ পাশেই রয়েছে বড়সড় একটা হরিতকি গাছ। রয়েছে স্যারের নিজের হাতে লাগানো আমগাছ। বেল গাছ। 

অবশেষে চলে আসার বেলায় স্যার বললেন কিছু চাপানো কষ্টের কথা। বয়সের সাথে সাথে কেন জানি নিজেকে নিসঙ্গও নিরীহ, নিরুপায় মনে হয়। সময় কাটে না। পুরানো দিনগুলোর স্মৃতি বড়ই কষ্ট বাড়ায়। স্কুলের স্যারদের সাথে কাটানো কতটা রঙিন সব দিনগুলি ক্রমেই ধোঁয়াশায় রুপ নিলো। স্যার বললেন এখন পৃথিবী, পৃথিবীর ইতিহাস আমাকে ধরে রাখতে নারাজ। এখন আমাকে আমার স্মৃতিকে উগড়ে দিতে ব্যস্ত। আর এটাই বাস্তবতা। এটাই নিয়তি। বিধির লীলাখেলা। 

আমি সাইকেলে উঠে বললাম, স্যার আপনার বিকালের সময়টাই নষ্ট করে দিলাম। খুব জ্বালাতন করলাম। স্যার হাসি দিয়ে বললেন জ্বালাতন আর তুই করলি কই। জ্বালাই তো তোকে। রাস্তা-ঘাটে যেখানে দেখা হয় তোকে জ্বালাই, জ্বালাতন দি। তারজন্যই তো আমাকে দেখলে দূর থেকেই নিজেকে লুকাতে ব্যস্ত থাকিস। মনে করিস যে বড় হয়েছে বুড়ো হয়েছি বলে কিচ্ছু টের পায় না। বলে হাসতে লাগলেন স্যার। স্যারের সবকিছু পরিবর্তন হলেও হাসিটা একদম অপরিবর্তীতই রয়ে গেছে আজও। নিষ্পাপ শিশুর মত স্যারের শিশুসুলভ হাসিটা হৃদয় নাড়িয়ে যায়।

পিডিএসও/রিহাব