টাঙ্গাইল প্রতিনিধি

  ১২ অক্টোবর, ২০২১

দেলদুয়ারে জনপ্রিয় হচ্ছে আলোক ফাঁদ

ঘুটঘুটে অন্ধকার চারিদিকে, দূর থেকে দেখা যাচ্ছে একটি ধান ক্ষেতের পাশে আলো জ্বলছে। কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে আছে আলোকে ঘিরে। কৌতুহলের কারণে আলোর কাছে এসে দেখা গেল কৃষি কর্মকর্তা ১৫ জন কৃষকদের সাথে কথা বলছেন। কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে আলোক ফাঁদ করা হচ্ছে।

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলায় আলোক ফাঁদ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধানের ক্ষতিকর পোকামাকড়ের উপস্থিতি ও দমন করার খবরটি আশান্বিত হওয়ার মতোই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় দেলদুয়ার উপজেলার কৃষকেরা আমন ধান লাগানোর কিছুদিন পর থেকেই আলোক ফাঁদ প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছেন।

আলোক ফাঁদ প্রযুক্তিটি হচ্ছে রাতের বেলায় ক্ষেতের পাশে বৈদ্যুতিক বাল্ব বা চার্জার বাল্ব টাঙ্গানো হয়। বাল্বের নিচে পানি ভর্তিপাত্র রাখা হয়। ওই পাত্রের মধ্যে পানির সাথে ডিটারজেন্ট বা কেরোসিন মিশ্রিত করা হয়। আলোতে আকৃষ্ট হয়ে পোকামাকড় বাল্বের কাছে আসে এবং পাত্রের পানির মধ্যে পড়ে মারা যায়। ওই পোকামাকড় দেখে ক্ষতিকর ও উপকারী পোকামাকড়ের উপস্থিতি নির্ণয় করা হয়। দেলদুয়ার উপজেলার কৃষকেরা এরই মধ্যে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুফল পেতে শুরু করেছেন।

ধানের ক্ষেতে পোকামাকড়ের আক্রমণ স্বাভাবিক হলেও ফলনের জন্য তা খুবই ক্ষতিকর। ধানগাছে সবুজ ঘাসফড়িং, মাজরা পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, বাদামি ঘাসফড়িং, গান্ধী পোকাসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকা আক্রমণ করে। এর মধ্যে বাদামি ঘাসফড়িং বা কারেন্ট পোকা সবচেয়ে ক্ষতিকর। এ পোকা যে গাছে আক্রমণ করে সেই গাছের শীষ সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে ফলন কমে যায়। অনেক সময় ফলন নেমে আসতে পারে শূন্যের কোঠায়।

সাধারণত ধানে কাইচ থোড় আসার আগে এসব পোকামাকড়ের আক্রমণ দেখা দেয়। আমাদের দেশে এসব পোকামাকড় মারার জন্য কৃষকেরা সাধারণত বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার করেন। অথচ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিআরআরআই) এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ধান চাষে কীটনাশক ব্যবহার করে কৃষকেরা কোনো সুবিধা পান না। উৎপাদন তো বাড়েই না, বরং উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। আর এর পাশাপাশি পরিবেশও দূষিত হয়। এ ক্ষেত্রে আলোক ফাঁদ প্রযুক্তি ভালো বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কেননা, এতে খরচ কম হয় এবং পরিবেশবান্ধবও বটে।

দেলদুয়ার উপজেলার কৃষকদের অনুসরণে দেশের অন্যান্য স্থানের ধানচাষিরা ধানগাছের পোকামাকড় দমনে ও পোকার উপস্থিতি জানতে আলোক ফাঁদ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন। এ জন্য এই প্রযুক্তির ব্যবহার ও উপকারিতা সম্পর্কে কৃষকদের মাঝে প্রচারণা চালাতে হবে।

দেলদুয়ার উপজেলার দেউলি ইউনিয়নের আগদেউলী গ্রামের কৃষক তৈবুর রহমান বলেন, আমাদের এখানকার কৃষি অফিসার আলোক ফাঁদ করে আমাদের ধানের ক্ষতিকর ও উপকারী পোকা চিনিয়ে দিচ্ছেন। সাথে কি ব্যবস্থা নিতে হবে তা বলে দিচ্ছেন। 

উপজেলার পাথরাইল ইউনিয়নের চন্ডী গ্রামের কৃষক বাবলু মিয়া বলেন, আলোক ফাঁদের মাধ্যমে আমরা জানতে পারছি আমার জমিতে কি ধরণের পোকা আছে। এছাড়া পানিতে পড়ে পোকাগুলোও মারা যাচ্ছে। আমি এখন থেকে সব সময় এই ফাঁদ ব্যবহার করব।

একই গ্রামের ফজল মোল্লা বলেন, বিষ না দিয়ে এই ফাঁদের মাধ্যমে আমরা পোকা মারতে পারছি। পোকা চিনতে পারছি। কোনটা উপকারি কোনটা অপকারী জানতে পারছি। সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারছি।

পাথরাইল ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি অফিসার কামরুল ইসলাম বলেন, পোকামাকড়ের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও দমন করার পরিবেশবান্ধব কার্যকরী একটি প্রযুক্তি হলো আলোক ফাঁদ। আমি প্রতি সপ্তাহে ইউনিয়নের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে কৃষকদের নিয়ে আলোক ফাঁদ করেছি। এতে কৃষকদের পোকা দমনের জন্য কার্যকরী ব্যবস্থাপত্র দেয়া সহজ হয়।

দেলদুয়ার উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মনজুরুল ইসলাম ও সুফিয়া আক্তার বলেন, আমাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে উপজেলার সকল কৃষকদের মধ্যে এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করছি আমরা। প্রতি রবিবার আমরা নিজেরা মাঠে গিয়ে কৃষকের সাথে আলোক ফাঁদ করছি এবং কৃষকরা যেন নিজেরাই এই আলোক ফাঁদ ব্যবহার করে সে জন্য তাদের উদ্ভদ্ধ করছি।

এ বিষয়ে দেলদুয়ার উপজেলা কৃষি অফিসার শোয়েব মাহমুদ বলেন, আলোক ফাঁদ পোকার উপস্থিতি ও দমনের একটি কার্যকরী পদ্ধতি। দেলদুয়ার উপজেলার ২৪টি ব্লকে প্রতি রবিবার একযোগে সন্ধ্যার পর আলোক ফাঁদ করা হয়। এতে করে উপজেলায় ধানে কি কি পোকা রয়েছে, তা আমরা আগাম জানতে পারি। ফলে পোকা ক্ষতি করার আগেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়। এছাড়া আমরা কৃষকদের নিজ উদ্যোগে আলোক ফাঁদ করার জন্য পরামর্শ প্রদান করে যাচ্ছি।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
দেলদুয়ার,আলোক ফাঁদ
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close