বর্জ্য থেকে বিলিয়ন ডলার
বাংলাদেশে প্লাস্টিক ঘিরে 'সবুজ বিপ্লব'

ঢাকাসহ সারা দেশের ডাস্টবিন বা রাস্তায় ফেলে দেওয়া যে প্লাস্টিক বোতল কিংবা ছেঁড়া পলিথিনকে আমরা 'আবর্জনা' ভাবি, তা আসলে স্রেফ আবর্জনা নয়; বরং দেশের অর্থনীতির নতুন এক গুপ্তধন। বাংলাদেশে ধীরে ধীরে ডানা মেলছে প্লাস্টিকের চক্রাকার অর্থনীতি (Circular Economy)। যেখানে বর্জ্যই হয়ে উঠছে মূল্যবান কাঁচামাল। আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে, কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচিয়ে এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এই খাতটি এখন দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় 'সবুজ শিল্প' (Green Industry) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে প্রস্তুত।
এক নজরে প্লাস্টিক খাতের বিশালত্ব : দেশে প্লাস্টিক পণ্যের অভ্যন্তরীণ বাজার প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার, যার মধ্যে শুধু গৃহস্থালি পণ্যের বাজারই সাড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা।
বিপুল রপ্তানি ও কর্মসংস্থান: বছরে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। সাড়ে ৫ হাজারের বেশি কারখানায় সরাসরি কাজ করছেন ২০ লাখের বেশি মানুষ।
আমদানির চাপ: দেশে নিজস্ব পলিমার উৎপাদন প্ল্যান্ট না থাকায় বছরে প্রায় ২০ লাখ টন নতুন প্লাস্টিক কাঁচামাল আমদানি করতে হয়।
বর্জ্য যখন সম্পদ, রিসাইক্লিংয়ের রূপান্তর: ব্যবহৃত প্লাস্টিককে ১০ থেকে ৫০ বার পর্যন্ত রিসাইকেল বা পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব। বর্তমানে দেশজুড়ে প্রায় ১ হাজারটি প্রতিষ্ঠান প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের সাথে যুক্ত। তারা বছরে প্রায় ৪ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ করছে।
উদ্বৃত্ত কাঁচামাল পুনরুদ্ধার: আমাদের দেশের প্রযুক্তিতে ১ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে প্রায় ০.৭ থেকে ০.৯ কেজি পুনর্ব্যবহারযোগ্য খাঁটি উপাদান পাওয়া সম্ভব।
প্রাণ-আরএফএল ও টিইএল প্লাস্টিকসের ‘রোল মডেল’: দেশের শীর্ষ এই গ্রুপটি একাই বছরে ৬৯,০০০ টন প্লাস্টিক রিসাইকেল করছে। তাদের মোট পণ্যের ১৫% কাঁচামাল আসে এই বর্জ্য থেকে, যা বছরে ৪০০ কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে তারা সারা দেশে ১০০টি বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র করার লক্ষ্য নিয়েছে।
ঢাকার মাথাপিছু বর্জ্য: বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ঢাকায় দৈনিক প্লাস্টিক বর্জ্য ২০০৫ সালের ১৭৮ টন থেকে বেড়ে ২০২০ সালে ৬৪৬ টনে ঠেকেছে (সাড়ে ৩ গুণ বৃদ্ধি)। ঢাকার একজন বাসিন্দা বছরে গড়ে ২২.৫ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি করছেন।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ঝুঁকি: রিসাইক্লিংয়ের বড় অংশই এখনো টোকাই, ভাঙারি ও ছোট আড়তদারদের হাত ধরে অনানুষ্ঠানিকভাবে চলে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ছাড়া প্লাস্টিক ক্রাশ করলে মাইক্রোপ্লাস্টিক, ন্যানো ফাইবার ও বিষাক্ত রাসায়নিক বাতাস ও পানিতে মিশে জীববৈচিত্র্য এবং মানবস্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। এই খাতকে পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে শতভাগ সফল করতে উদ্যোক্তা ও খাতসংশ্লিষ্টরা ৩টি মূল দাবি তুলছেন।
ভ্যাট ও ট্যাক্স মওকুফ: উন্নত দেশে রিসাইক্লিংয়ে গ্রিন ফাইন্যান্স ও ভর্তুকি দেওয়া হলেও বাংলাদেশে উল্টো ১৫% ভ্যাট দিতে হয়, যা নতুন বড় বিনিয়োগের বড় বাধা। এটি প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।
দেশীয় শিল্পে প্রণোদনা: বর্জ্য থেকে তৈরি কাঁচামাল সরাসরি রপ্তানি করলে সরকারি প্রণোদনা মেলে, কিন্তু সেই কাঁচামাল দেশের ভেতরে ব্যবহার করে চূড়ান্ত পণ্য বানালে কোনো প্রণোদনা নেই। এই বৈষম্য দূর করা দরকার।
আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: জাতীয় পর্যায়ে একটি স্বচ্ছ ও আধুনিক সাপ্লাই চেইন এবং 'সার্কুলার ইকোনমি ফ্রেমওয়ার্ক' বাস্তবায়ন করা।
পরিবেশের জন্য যে প্লাস্টিক অভিশাপ, সঠিক নীতি সহায়তা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ পেলে সেই প্লাস্টিকই বাংলাদেশের অর্থনীতি ও শিল্পায়নের নতুন আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। 'বর্জ্যমুক্ত বাংলাদেশ' গড়ার এই যাত্রায় এখন প্রয়োজন শুধু সরকারের একটি সুদূরপ্রসারী ও ইতিবাচক সিদ্ধান্তের।









































