কাজী আবুল মনসুর চট্টগ্রাম ব্যুরো
রেকর্ড ছুঁয়েছে লবণের দাম

ঈদুল আজহা সামনে রেখে অস্থির হয়ে উঠছে লবণের বাজার। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে মাঠ পর্যায়ে লবণের দাম প্রতি মণ ৬০০ টাকা ছাড়িয়েছে। মাসখানেক আগেও মাঠ পর্যায়ে যে লবণ ৬ টাকায় বিক্রি হতো তা এখন ১৬ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। খুচরা বাজারে প্যাকেটজাত লবণের দাম ৩৮ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম আরো বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। দেশে লবণের ঘাটতি রয়েছে- এ অজুহাতে সিন্ডিকেট দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়াতে তৎপরতা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এরই মধ্যে লবণের দাম বাড়াতে কতিপয় ব্র্যান্ডেড কোম্পানি বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের দ্রব্যমূল্য মনিটরিং সেলকে চিঠি দিয়েছে বলে জানা গেছে। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে খুচরা পর্যায়ে লবণের দাম কেজিতে বেড়েছে ১০ টাকা। দাম কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, এ নিয়ে ভোক্তাদের মাঝে সংশয় বাড়ছে। একইসঙ্গে চামড়া ব্যবসায়ীরাও দাম নিয়ে শঙ্কিত।
দেশে কয়েক বছর ধরে লবণের বাজার স্থিতিশিল রয়েছে। সম্প্রতি কোরবানি ঈদ সামনে রেখে লবণের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধিও তৎপরতা শুরু হয়েছে। এক মাস আগেও খুচরা বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির লবণের দাম ছিল ২৫-২৮ টাকা পর্যন্ত। সেখানে কয়েক দিনের ব্যবধানে দাম গিয়ে ঠেকেছে ৩৮-৪০ টাকায়। বাজার সূত্রে জানা গেছে, লবণের দাম আরো বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ব্র্যান্ড কোম্পানি লবণ বাজারজাত করছে না। মূল্য বাড়িয়ে বাজারজাত করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে কোম্পানিগুলো। নতুন করে দাম বাড়ানো হলে প্রতি কেজি লবণের খুচরা মূল্য এক ধাপে ১২ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাবে। ফলে ঈদের বাজারে ভোক্তা ও চামড়া ব্যবসায়ীদের ওপর বড় ধরনের চাপ পড়বে।
দেশের লবণ চাষিরা সাধারণত ১৫ থেকে ১৮ লাখ টন লবণ উৎপাদন করতে পারেন। লবণ চাষের ক্ষেত্রে আশানুরূপ দাম না পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কয়েক বছর ধরে অনেক চাষি লবণ আহরণ থেকে বিরত থাকেন। বিগত লবণ মওসুমে সরকারিভাবে ১৮ লাখ টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মওসুমে লবণ উৎপাদন হয়েছে সাড়ে ১৫ লাখ টন। উৎপাদনের চেয়ে আড়াই লাখ টন ঘাটতি থাকায় সরকার মিল মালিকদের দেড় লাখ টন লবণ আমদানির অনুমতি দেয়।
এ বিষয়ে কথা বললে বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সহসভাপতি অধ্যাপক হারুনুর রশিদ বলেন, ‘বিগত লবণ মওসুমে উৎপাদন কিছুটা কম হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে লবণের ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে লবণের দাম কিছুটা বেড়েছে। ইতিমধ্যে সরকার লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়ার পর দাম আর বাড়বে না। সঠিক সময়ে দেশে ঘাটতি লবণ এসে পৌঁছলে লবণের দামে তেমন তারতম্য হবে না।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশে সিংহভাগ লবণ উৎপাদিত হয় কক্সবাজারে। এ জেলার সাত উপজেলার ৬০ হাজার একর এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালি উপজেলার প্রায় ৮ হাজার একর জমিতে প্রাকৃতিকভাবে লবণ উৎপাদন করেন চাষিরা। সমুদ্রেও পানি প্রাকৃতিকভাবে ব্যবহার করে অপরিশোধিত লবণ আহরণ করা হয়। প্রায় দেড় লাখ মানুষ এ লবণ চাষের সঙ্গে জড়িত। লবণ উৎপাদনের পর পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে মাটিতে পুঁতে রাখা হয় লবণগুলো। ধীরে ধীরে বাজার দামের ওপর ভিত্তি করে লবণ বিক্রি করেন চাষিরা। মওসুম শেষ হওয়ার পর মাঠ পর্যায়ে এ লবণের দাম ছিল ৫ টাকা। বেশির ভাগ সময় চাষিরা লবণের আশানুরূপ দাম পান না। এতে তাদের ভেতর ক্ষোভ আছে। কারণ তাদের কাছ থেকে অল্প দামেই মিল মালিকরা লবণ নিয়ে যান। প্যাকেটজাত করে মিল মালিকরা লবণ বেশি দামে বিক্রি করে লাভ করলেও বঞ্চিত থাকতেন চাষিরা। তবে গত কয়েক দিনে লবণ চাষিদের মুখে হাসি ফুটেছে বেশি দামে পণ্যটি বিক্রি করতে পেরে। মাঠ পর্যায়ে এখন পলিথিন মোড়ানো লবণ বিক্রি হচ্ছে ১৫-১৮ টাকা কেজি। লবণ চাষিরা সমুদ্র থেকে যে লবণ উৎপাদন করেন তা কালো লবণ বলে পরিচিত। সাধারণত তিন ক্যাটাগরি হিসেবে তারা মিল মালিকদের কাছে লবণ বিক্রি করেন। মাসখানেক আগেও প্রথম পর্যায়ে কালো লবণ প্রতি মণ ৮৫-৮৬ টাকা, এ লবণ পরিষ্কার করে ৯৫-৯৬ টাকা এবং পরবর্তীতে পলিথিন মুড়িয়ে ১২৫-১৩০ টাকায় চাষিরা বিক্রি করেন। বর্তমানে চাষিরা প্রতি মণ লবণ ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করছেন। উৎপাদনের পর কয়েক মাস পর্যন্ত মাঠে লবণ সংরক্ষণ করতে পারেন। বর্তমানে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপজেলাগুলোতে লবণ বিক্রির ধুম পড়েছে। তবে দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে শঙ্কিত চামড়া ব্যবসায়ীরা। কারণ কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণের জন্য ব্যবসায়ীদের প্রচুর লবণ লাগে। চামড়ার দাম আর লবণের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকলে ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়ার আশঙ্কা করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত জানুয়ারি হতে এপ্রিল পর্যন্ত লবণ চাষ মওসুমে এবার বৈরী আবহাওয়ার কারণে উৎপাদনে ঘাটতি পড়ে। সরকার ১৮ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিলেও চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের ৭৪ হাজার একর জায়গায় লবণ উৎপাদিত হয়েছে ১৫ লাখ ৫৫ হাজার টন। এছাড়া বিগত মওসুমে আশানুরূপ দাম না পাওয়াতে অনেক লবণ চাষি তাদের লবণ প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে রেখে দেন। অনেকে এবার দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগের লবণ বিক্রি করে মুনাফা তুলে নেন। এবারের চাষিরা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ায় আগামী মওসুমে উৎপাদনের মাত্রা আরো বেড়ে যাবে বলে চাষিদের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে লবণের অতিরিক্ত মূল্য বাড়ানো হচ্ছে। তবে লবণ উৎপাদনকারীদের দাবি, দেশে ক্রুড লবণের সংকটের পাশাপাশি দামও বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় লবণের খুচরা মূল্য বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন তারা। এ অস্থিরতা দূর করতে গত ১৪ আগস্ট দেড় লাখ টন লবণ আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর মধ্যে ৭৫ হাজার টন শিল্প লবণ ও ৭৫ হাজার টন ভোজ্য লবণ। তবে কোন মালিককে কত টন আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে, নাকি উন্মুক্তভাবে যে যার ইচ্ছেমতো আমদানি করবে, তা এখনো নির্ধারণ করেনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
জানা গেছে, গত ২১ জুন মোল্লা সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (হিসাব ও অর্থ) মো. আব্দুল মান্নান ট্যারিফ কমিশনকে চিঠি লিখে জানিয়েছেন, বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োজনের তুলনায় অপরিশোধিত লবণ কম উৎপাদন হওয়ায় কাঁচামালের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এবং এর মূল্য মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে আমাদের উৎপাদন খরচ পূর্বের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে প্রতি বস্তা ৭৫ কেজি হিসেবে মাঠ পর্যায়ে প্রতি বস্তা অপরিশোধিত লবণের দাম ১ হাজার ২৫০ টাকা এবং কারখানা পর্যন্ত পরিবহন ব্যয় ও শ্রমিক খরচ আরো ১৫০ টাকা। এমতাবস্থায় আমাদের উৎপাদিত ভোজ্য লবণের দাম কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
হাজী লালমিয়া সল্টের মালিক মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, দেশে এবার পর্যাপ্ত লবণ উৎপাদন হয়নি। ১৮ লাখ টন চাহিদার স্থলে ১৫ টনের মতো উৎপাদন হয়েছে। এর ফলে লবণের দাম বেড়ে গেছে। এছাড়া লবণ আমদানি নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। লবণ আমদানি উন্মুক্ত করে দেওয়া ও না দেওয়া নিয়ে এখনো সিদ্ধান্তে যেতে পারেনি সরকার। তাই লবণের ঘাটতি এখনো পূরণ হচ্ছে না।
জানা গেছে, বিগত সময়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে মিলগুলোকে সমহারে লবণ আনার অনুমতি দেওয়া হতো। শিল্প ও ভোজ্য লবণ সব সময় একই এইচকোডে আমদানি হতো। আমদানিকৃত ক্রুড লবণ পরিশোধিত করার পর আয়রন মিশিয়ে তা ভোজ্য লবণে পরিণত করা হয়। কিন্তু এবার শিল্প লবণ নাম দিয়ে আমদানিতে আরেকটি কোটা সৃষ্টি করা হয়েছে। নতুন কোটায় শিল্প লবণের নামে একটি সিন্ডিকেট লবণের বিশেষ বরাদ্দ নিতে তৎপর রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্প লবণ নাম দিয়ে একটি সিন্ডিকেটকে লবণ আমদানির অনুমতি দিলে এ শিল্পের ছোট আমদানিকারকরা ক্ষতির মুখে পড়বেন।
চট্টগ্রাম লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল কবির বলেন, আমি বৃহস্পতিবার জেনেছি, আমদানিকারকদের সমান হারে লবণ আমদানির সুযোগ দিচ্ছে সরকার। দুয়েক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে অফিশিয়ালি নিশ্চিত হতে পারব। সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে সামনের দিনগুলোতে লবণের দাম কমে যাবে।









































