সোহেল মাজহার

  ২৬ নভেম্বর, ২০২১

ধারাবাহিক রচনা । ১১

উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু

তিন বন্ধু এবং একটি দেশ : হাসনাত আবদুল হাই তার কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করেছেন। একই ঘরানার উপন্যাস তিন বন্ধু এবং একটি দেশ। লেখক তিনটি কেন্দ্রীয় চরিত্র নির্মাণ করে ষাটের দশকের বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ মুহূর্ত, গণ-অভ্যুত্থান, অসহযোগ আন্দোলন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে মূর্ত করেছেন। অবশ্য তাদের জীবন একাত্তর ছাড়িয়ে বর্তমান সময়কেও স্পর্শ করে।

মূল গল্পে তিনটি কেন্দ্রীয় চরিত্র থাকলেও তাদের মধ্যে মূলত একটি চরিত্র কত্থকের ভূমিকা পালন করে। কত্থকের উত্তম বয়ানে পাঠক কয়েকটি পরিবার ও সমাজ সংস্কৃতির মধ্যে প্রবেশ করে। কত্থকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহপাঠী সমরেশ। তারা দুজনেই কলেজের ক্রীড়া ও সংস্কৃতির উজ্জ্বল মুখ। এই কারণে একসময় একই কলেজের জুনিয়র বিমলার সঙ্গে তাদের গভীর বন্ধুত্ব হয়। সংস্কৃতিমনস্ক সুন্দরী বিমলা তাদের দুজনের মনোযোগ আকর্ষণ করে। দুজন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। অবশ্য এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাদের মধ্যে কোনো ধরনের প্রতিহিংসা কিংবা জিঘাংসা সৃষ্টি করেনি। কেবল বিমলার মন পেতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের অদম্য আকাক্সক্ষা সৃষ্টি হয়।

৫৪-এর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচিত হয়। মুসলিম লীগ এই পরাজয়কে হজম করতে পারেনি। তাদের ষড়যন্ত্রে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি হয়। একইভাবে জেলা শহরেও কত্থকের চাচা মুসলিম লীগ নেতা মনিবুর রহমান উকিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করতে উদ্যত হয়। কত্থক সেই সংবাদ জানতে পেরে বিমলার ও সমরেশ পরিবারের নিরাপত্তার জন্য উদ্বিগ্ন হয়। অবশ্য শেষ পর্যন্ত দাঙ্গাকারীদের হাতে সমরেশের বাবা শহরের প্রথিতযশা ডাক্তার প্রাণ নেয়। এরমধ্য দিয়ে পাঠকের কাছে কত্থকের অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রেমিকার জন্য আকুতি, বন্ধুর জন্য দায়িত্ববোধ এবং মধ্যবিত্ত মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়।

এ ঘটনাই কত্থক, সমরেশ ও বিমলার জীবনকে একটি বাঁকে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। বিমলা তাদের দুজনের মনই পড়তে পেরেছিল। স্বভাবত সে ছিল দ্বিধাগ্রস্ত। দাঙ্গায় সমরেশের পিতৃবিয়োগের কারণে সুপ্ত ভালোবাসা ও সহমর্মিতার বোধ থেকে বিমলা সমরেশকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। ততদিনে সমগ্র জাতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হয়ে ওঠে। কত্থক, সমরেশ ও বিমলাও নিজেদের অজান্তে বাঙালির সম্মিলিত আকাক্সক্ষার অংশ হয়ে ওঠে। লেখক কত্থকের বয়ানে বিষয়গুলো তুলে ধরেন এভাবে-

(ক) ‘তাদের কথা শেষ হতে না হতে একটা টিয়ার গ্যাস শেল এসে পড়ে আমার সামনে। আমি উত্তেজিত হয়ে ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে সেটা তুলে নিয়ে সামনে ছুড়ে দিই।... কিছু পর আশপাশের বাড়ি, দোকান-পাটের পেছন থেকে তরুণ আর যুবকদের দল মিছিল করে আসতে থাকে। দেখেই বুঝতে পারি তাদের বেশির ভাগ ছাত্র। সবার হাতে প্ল্যাকার্ড, তারা সেøাগান দিচ্ছে জোরে। আইয়ুব শাহির পতন চাই। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বন্দিদের মুক্তি চাই। আমাদের দাবি মানতে হবে। জনতার সংগ্রাম চলবেই। তাদের সঙ্গে যোগ দিতে এগিয়ে আসে; হকার শ্রমিক নানা পেশার মানুষ। এমনকি মেয়েরাও এসে যোগ দেয়। স্রোতের মতো আসতে থাকা উত্তেজিত মানুষরা এক বিরাট জনতার রূপ নেয়। তারা রাস্তার পুরোটা দখলে নিয়ে সামনে এগোতে থাকে বলদৃপ্ত ভঙ্গিতে। সবাই মাথার ওপরে উঁচিয়ে ধরেছে প্ল্যাকার্ড। সবার গলায় সেøাগান আগুনের ফুলকির মতো ওপরে উড়ছে। বোমার মতো ফেটে পড়ছে সমবেত কণ্ঠস্বর। আমি উত্তেজিত হয়ে তাদের দিকে প্রায় দৌড়ে যেতে থাকি। হাতে তুলে নিই মাটিতে পড়ে থাকা একটা প্ল্যাকার্ড : পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন চাই।’ (পৃষ্ঠা : ৯৩, তিন বন্ধু এবং একটি দেশ : হাসনাত আবদুল হাই, ফেব্রুয়ারি, ২০১২, আগামী, ঢাকা)

(খ) সমরেশ বলল, শেখ মুজিব বেশ বুদ্ধিমান। জনতার স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের নেতৃত্ব নিজের হাতে নিজের দলের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফেলেছেন। বত্রিশ নম্বর ধানমন্ডি থেকে তিনিই প্রতিদিন নির্দেশ দিচ্ছেন জনতাকে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের। সবাই তার কথামতো কাজ করছে। (পৃষ্ঠা : ১০৬, ১০৭ পূর্বোক্ত)

(গ) সাতই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসমুদ্রের সামনে শেখ মুজিবুর রহমান সাবধান করে দিলেন পাকিস্তানি মিলিটারি কর্তৃপক্ষকে, আর যেন তার লোকের ওপর একটাও গুলি না চলে। বক্তৃতায় তার যে কথা সবাইকে শিহরিত, উদ্বুদ্ধ করে দিল তা হলো, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’ তিনি বাঙালিদের আহ্বান জানালেন যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে। এরপরই তিনি বজ্রনির্ঘোষে বললেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি আরো দেব, দেশকে স্বাধীন করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। তার ভাষণ শুনতে গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল আমার। সব বাঙালির। (পৃষ্ঠা : ১১০, পূর্বোক্ত)

(ঘ) ‘কিন্তু আজকে ভেতরে এসে দেখি, শুধু ছাত্র না সব বয়সের মানুষ বসে আছে, চা-শিঙাড়া খাচ্ছে আর উত্তেজিত হয়ে কথা বলছে। রেডিওতে গান হচ্ছে ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্ত লাল রক্ত লাল।’ আবার রক্তের কথা শুনে আমি চমকে উঠি সামনে দুই পাশে রক্তের লাল রং দেখতে পাই। যারা চা খাচ্ছে, অপেক্ষা করছে, তাদের সবারই আলোচনার বিষয় সাতই মার্চে রেসকোর্সে শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা। কিছু লোকের মুখ দেখে মনে হলো, তারা অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে। এখনি কিছু দেখতে চায়।’ (পৃষ্ঠা : ১১১, পূর্বোক্ত)

লেখক উপন্যাসের ধারা বর্ণনার ক্ষেত্রে ঘটনাক্রমের ধারাবাহিকতা অনুসরণ করেননি। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ কেন্দ্রে রেখে সমান্তরালে বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ এবং আত্মকথন বর্ণনা করেন। লেখক আখ্যানের গঠনশৈলীতে অভিনবত্ব সংযোজন করেন। তার ভাষা সহজ কিন্তু পাঠকতাড়িত হয়, মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে ভাষার দংশন।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close