অনলাইন ডেস্ক
  ২০ নভেম্বর, ২০২০

এইবার দিগন্তের গল্প কিছু বলি

চন্দ্রাবলী বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রত্যেকেই ভুলে যেতে চায়,/আমিও চেয়েছি?/এন টানে/পেছনে তাকাই;/চোখের চুম্বন পেয়ে বিক্ষত অতীত/জেগে ওঠে। অসাধারণ কবিতা। প্রতিটি শব্দ বলে যায় না-বলা অনেক কথা।

২০১৯ সালের ২৭ ডিসেম্বরে ভার্চুয়ালভাবে পরিচিত কবিকে খুব সামনে থেকে দেখেছিলাম। এত দিন তাকে ফেসবুকেই দেখেছি কিন্তু পরিচয় করার সৌভাগ্য হয়নি। সেই সৌভাগ্য হাতে ধরে এনেছিল বাংলাদেশের একটা পরিচিত সাহিত্য গ্রুপ, যার নাম পার্বত্য কাব্য। ২৭ ডিসেম্বর আমাদের প্রোগ্রাম ছিল রাঙামাটিতে।

------
সেখানে সান্ধ্য অনুষ্ঠানে শুনলাম কবির গুরুগম্ভীর কণ্ঠে নিজের কবিতা পাঠ। সমস্ত হল ছিল পিন অব সাইলেন্টস। মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছিল পুরো হল। আমিও দেখলাম কবিতার প্রাণপুরুষ কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনকে।

কবিতার প্রাণপুরুষ তাকে বললাম এই কারণে, তার কবিতায় প্রতি ছত্রে ছত্রে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। কবির কবিতার শব্দ ঝংকৃত হয়ে যায় পাঠক হৃদয়ে। তার কবিতায় যেমন আছে বসন্তের আহ্বান, তেমন আছে চৈত্রের সর্বনাশী হাতছানি। সেদিন প্রোগ্রাম শেষে কবি যখন হল ছেড়ে বেরিয়ে এলেন, মনে হলো সবার হৃদয়টুকু সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন সবাইকে নিঃস্ব করে।

আমি হল থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম তার সঙ্গে সঙ্গেই এবং একটু হেসে বলেছিলাম, সেলফি তুলতে পারি আপনার সঙ্গে, খুব মিষ্টি হেসে তিনি সম্মতি জানিয়েছিলেন।

কবির রচিত প্রতিটা কাব্যগ্রন্থ সমানভাবে পাঠক হৃদয়ে সমাদৃত। স্টালিন রচিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফিরিনি অবাধ্য আমি’। সাহিত্য চেতনা তাকে বেঁধে রেখেছে পাঠককুল তথা কবি হৃদয়ে। পরে তিনি আরো ৪৫টি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। তার রচিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হলো‘আশীর্বাদ করি আমার দুঃসময়কে’, ‘আঙ্গুলের জন্য দ্বৈরথ’, ‘হিংস্র নৈশভোজ’, ‘সব জন্মে শত্রু ছিল যে’। তার সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘তদন্ত রিপোর্ট’।

তিনি ‘রবীন্দ্রনাথ আরোগ্য’ নামে একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার রচিত ছড়াগ্রন্থ ‘হাঁটতে থাকো’। স্টালিন রচিত একমাত্র উপন্যাস ‘সম্পর্কেরা ভাঙ্গে’। তার কবিতার একটি একক সিডি ‘আবার একদিন বৃষ্টি হবে’, এটি আবৃত্তি করেন প্রদীপ ঘোষ।

রেজাউদ্দিন স্টালিনের কবিতা ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, উড়িয়া, রুশ, জার্মান, চীনা, জাপানি ও ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। কবিতায় অবদানের জন্য‘বাংলা একাডেমি’ সাহিত্য পুরস্কার পান ২০০৬ সালে।

প্রকৃত কবির মতোই কবি স্টালিন তার লেখার ভাবধারার বিভিন্ন পরিবর্তন আনেন। নিজের সৃষ্টিশীল রচনার জন্য প্রেমপ্রকৃতি, ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি, সবকিছুকে হৃদয় দিয়ে স্পর্শ করতে চান শব্দ গেঁথে। তার বিশেষ পক্ষপাতিত্ব পৌরাণিক গ্রিক রোমান পুরোনো অন্ত্যমিল ও মাত্রাযুক্ত ছন্দ প্রয়োগ এবং আর রামায়ণ-মহাভারতের বিভিন্ন আখ্যান দিয়ে পরীক্ষণ-নিরীক্ষার মাধ্যমে নতুনত্বকে আবিষ্কার করার সাবলীল প্রয়াস, যা তাকে পৃথক পরিচয়ে পরিচিতি দিয়েছে।

কবি বিজ্ঞান মনস্কভাবে তার কাব্যাদর্শের পথে যাত্রা করলেন চলমান সময়ের সোসিও-ইকোনমিক কনটেক্সটে। তিনি কবিতা লিখতে গিয়ে নিজেকে আবিষ্কার করলেন এমন এক ত্রিমাত্রিক বাস্তবতায় যার একদিকে অসহায় মানুষ, অন্যদিকে করপোরেট পুঁজিবাদী বৈশ্বিক শিল্পায়ন। তাই তো কবি নিজের সত্তা ও সময়কে আবিষ্কার করেন এবং তার কলমে বেরিয়ে আসে, ‘আমার সময়গো ক্ষুরের মতো বিভাজিত’। আর সময়ের এ সঠিক শঙ্খধ্বনি শ্রবণ করার পারঙ্গমতা অর্জন করার মধ্য দিয়েই রেজাউদ্দিন স্টালিন হয়ে ওঠেন বিজ্ঞান মনস্ক কবি তালিকায় পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

রেজাউদ্দিন স্টালিন কাব্যকলার সব শৃঙ্খল মেনেই নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন তার স্বতন্ত্রস্বর। দেয়াল দিয়ে ঘেরা আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক যখন এক বিচ্ছিন্নদ্বীপের মতো হয়ে উঠছে, তখন কবি তার রচনার মাধ্যমে আমাদের দেয়াল ভাঙার গল্প শোনাতে চান, তৈরি করেন সেই আপ্তবাক্য, যাকে বলা যেতে পারে ‘সহেনা জনতার জঘন্য বৈরী’। তাই তো কবি এই বৈনাশিক বাস্তবতা থেকে মীমাংসিত হতে চান এভাবে ‘দেয়ালের গল্প আমি অনেক শুনেছি,/এইবার দিগন্তের গল্প কিছু বলি।’

একজন কবি তখনই বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে ওঠেন, যখন তিনি কাব্যকলার সঠিক শৃঙ্খলগুলোকে মান্য করেন এবং সেই সঙ্গে আগের শৃঙ্খলকে ভাঙতে ভাঙতে আবিষ্কার করেন নতুন কোনো ফর্মের। এই দ্বিবিধ শর্তে রেজাউদ্দিন স্টালিন উতরে যান সঠিক শ্রমের পথ ধরে। সে কারণে স্টালিনের কবিতার বিজ্ঞানাগারে প্রতিটি শব্দই এক একটি কবিতার চরিত্র হয়ে দাঁড়ায়। তারা অপসারিত হয় কিংবা আওয়াজ তোলে। তারা আওয়াজ তোলে কখনো মৃদু, উচ্চ কিংবা মধ্যম সুরতন্ত্রীতে। এভাবেই স্টালিনের কবিতার বিজ্ঞানাগারে তৈরি হয় এক একটি নতুন কবিতা।

সমকালীন তথাকথিত রাজনৈতিক সচেতন কবিরা যখন স্লোগানসর্বস্ব কবিতা লিখে এক ধরনের পাঠকদের মন কেড়ে নেওয়ায় ব্যস্ত, তখন রেজাউদ্দিন স্টালিন আমাদের নতুনদের জেগে ওঠাকে চিহ্নিত করেন একজন দার্শনিকের প্রজ্ঞায় ‘একটি দীর্ঘ রাত্রির উপত্যকায় শাহবাগকে উঠে আসতে দেখলাম। যেন বহু পথ পার হয়ে একটি মরু ক্যারাভান আশ্রয় নিয়েছে তাঁবুতে। শহরের সমস্ত ফ্ল্যাট, সড়ক, বিপণি, প্রেস ক্লাবে বৈদ্যুতিক আলোর ফিস্ফাস্ সিন্ধু সারসের মতো সতর্ক সজাগ।’

সময় ও সমকালের প্রতি কবির এই সচেতনতার কারণেই পুরোবিশ্ব তাকে একদিন বরণ করে নেবে। আমরাও অপেক্ষা করব সেই শুভদিনের।

 

 

"

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়