ড. মো. আহাদ হোসেন

  ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

হাতের তালু জ্বালাপোড়ায় করণীয়

হাতের তালু জ্বালাপোড়া ও ব্যথা আমাদের মধ্যে খুব সাধারণ একটি বিষয়। অনেকেই এ সমস্যায় ভুগে থাকেন। মেডিকেল পরিভাষায় এ বিষয়টিকে বলা হয় কারপাল টানেল সিনড্রোম। আজকের লেখায় এ বিষয়ে বিস্তারিত বলার চেষ্টা করব।

কারপাল টানেল সিনড্রোম কী?

আমাদের হাতের কবজিতে একটি টানেলের মতো একটি গঠন আছে, যেটার ভেতর দিয়ে বেশ কিছু টেনডন, নার্ভ ও রক্তনালি চলাচল করে। যদি কোনো কারণে এই ব্যান্ডটি ছোট হয়ে যায় বা ব্যান্ডের নিচে যে জায়গা থাকে সেই জায়গাটায় চাপে পড়ে। তাহলে এর ভেতরে থাকা স্নায়ু বিশেষ করে মিডিয়ান নার্ভ চাপে পড়ে এবং জ্বালাপোড়া টাইপের ব্যথা হয়। এটিই হচ্ছে কারপাল টানেল সিনড্রোম।

কারপাল টানেল সিনড্রোম সমস্যাটির লণগুলো কী কী?

কারপাল টানেল সিনড্রোমের প্রথমদিকের লণ হচ্ছে হাতের তালু জ্বালাপোড়া করা এবং হাতে অবশ অনুভূত হওয়া। এই অবশ অনুভূতি আমাদের হাতের মধ্যমা, তর্জনী, বৃদ্ধাঙ্গুলি এবং যে আঙুলে আমরা আংটি পরি, সেই আঙুলগুলোয় অনুভূত হয়। সমস্যাটি দীর্ঘমেয়াদি হলে আমাদের হাতের মাংসপেশি দুর্বল হয়ে যায়। আমাদের হাতের বোধশক্তি কমে আসে। আমরা কোনো জিনিস ধরলে শক্তি না পাওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হয়।

কারা হাতের তালু জ্বালাপোড়া সমস্যার ঝুঁকিতে থাকেন?

১. গঠনগতভাবে মহিলাদের হাতের কবজির ব্যান্ডটি ছোট থাকে। যে কারণে মহিলারা এই জাতীয় সমস্যায় বেশি ভুগে থাকেন।

২. দীর্ঘমেয়াদি অস্টিওআর্থারাইটিস।

৩. ডায়াবেটিস।

৪. শরীরের ওজন অত্যাধিক বেড়ে গেলে।

৫. যারা থাইরয়েডের সমস্যায় ভুগে থাকেন।

৬. কর্মেক্ষেত্রে যারা হাতের কাজ বেশি করেন।

যারা কম্পিউটার কাজ বেশি করেন এবং মাউসের ব্যবহার বেশি করেন, তাদের েেত্র সমস্যা হতে পারে।

কীভাবে হাতের তালু জ্বালাপোড়া জাতীয় সমস্যা থেকে রা পাওয়া যায়?

১. হাতের তালু জ্বালাপোড়া জাতীয় সমস্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রথমেই সতর্ক থাকতে হবে, যেন আঘাতজনিত কোনো কারণে হাতের কবজিতে কোনো ভেঙে যাওয়া বা অন্যান্য কোনো সমস্যায় না পড়তে হয়।

২. হাতের কবজিতে চাপ কমাতে হবে এবং রিল্যাক্স রাখার চেষ্টা করতে হবে।

৩. যারা দীর্ঘ সময় লেখার কাজ করেন, তাদের েেত্র সফট এবং আরামদায়ক কলম ব্যবহার করতে হবে, যাতে হাতের কবজিতে চাপ না পড়ে।

৪. যারা ফ্যাক্টরিতে হাতের কবজি নড়াচাড়া জাতীয় কাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত তারা কাজের ফাঁকে ফাঁকে বিশ্রাম নিয়ে কাজ করতে হবে।

৫. যারা দীর্ঘ সময় টাইপিং এবং নেটওয়ার্কিং কাজে কম্পিউটার নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তাদের মাউসটি আরামদায়কভাবে ব্যবহার করার অভ্যাস করতে হবে।

৬. শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

৭. ডায়াবেটিস, থাইরয়েডজনিত সমস্যা ও রিউমাটয়েড আথরাইটিস সমস্যায় যারা ভুগে থাকেন, তারা নিয়মিত এসব রোগের সঠিক চিকিৎসা নিতে হবে ও রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

৮. যারা অধিক বয়স্ক তারা তাদের হাতকে সব সময় গরম রাখার চেষ্টা করতে পারেন, যা এ সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে।

হাতের তালু জ্বালাপোড়া বা কারপাল টানেল সিনড্রোমের চিকিৎসাপদ্ধতি :

১. প্রাথমিকভাবে প্যারাসিটামল (ঞধন.ঢঢ়ধ ঢজ) বা প্যারাসিটামল ও ট্রামাডলের সম্মিলিত ওষুধ (ঞধন. টঃৎধপবঃ) নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর (৮ ঘণ্টা বা ৬ ঘণ্টা পরপর) কিছুদিনের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। স্নায়ুুর গঠনে উন্নতি করে এ জাতীয় ভিটামিন (ঞধন.ঠরঃধনরড়হ) প্রতিদিন একটি বা দুটি করে চিকিৎসকের পরামর্শে দীর্ঘমেয়াদি সেবনে কিছুটা উন্নতি এনে দিতে পারে।

২. ফিজিওথেরাপি জাতীয় চিকিৎসা প্রাথমিকভাবে ভালো কাজ করে। সে েেত্র বাসায় গরম সেঁক ও ফিজিওথেরাপি সেন্টারে আল্ট্রাসাউন্ড ফিজিওথেরাপি এ েেত্র ভালো কার্যকর।

৩. প্রাথমিক চিকিৎসা ও ফিজিওথেরাপিতে ব্যথার উন্নতি না হলে ইন্টারভেনশন জাতীয় চিকিৎসা গ্রহণ করা যায়। বেশ কিছু ইন্টারভেনশন চিকিৎসা রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম আল্ট্রাসনোর সাহায্যে সুনির্দিষ্ট স্নায়ুতে স্টেরয়েড জাতীয় ইনজেকশন দেওয়া এবং আল্ট্রাসনোর সাহায্যে সুনির্দিষ্ট স্নায়ুতে হাইড্রো ডিসেকশন করা।

৪. খুবই খারাপ অবস্থা হলে অনেক েেত্র অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে। আবার অনেকের ক্ষেত্রেত্র সমস্যাটি হওয়ার কারণ দূর না করলে অপারেশনের পরও এই সমস্যাটি হতে পারে। সে ক্ষেত্রেও ইন্টারভেনশন জাতীয় চিকিৎসার মাধ্যমে এ অবস্থার উন্নতি করা সম্ভব।

সর্বোপরি সচেতনতাই আমাদের অধিকাংশ শারীরিক সমস্যা থেকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করতে পারে। তাই সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার আগেই সচেতন হোন। সমস্যায় আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সবাই সুস্থ থাকুন ভালো থাকুন।

লেখক : কনসালট্যান্ট ওপেন ফিজিশিয়ান কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, চেম্বার বাংলাদেশ সেন্টার ফর রিহ্যাবিলিটেশন, কাঁটাবন, ঢাকা

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়