বদরুল আলম মজুমদার

  ৬ ঘণ্টা আগে

গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন

* দেশজুড়ে বইছে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ * এল নিনোর প্রভাবে অস্বাভাবিক গরম অনুভূত * জ্যৈষ্ঠের খরতাপ আরো বাড়তে পারে

স্বাভাবিক নিয়মে জ্যৈষ্ঠ মাসে ঝড়-বৃষ্টির দাপট থাকার কথা। কিন্তু পরিবেশে যেন বিপর্যয় নেমে এসেছে। যে সময়ে ভরপুর বৃষ্টি হওয়ার কথা, সে সময়ে তাপপ্রবাহে জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে। সারা দেশের প্রায় ৪৫ জেলার উপর দিয়ে বইছে তাপ প্রবাহ। গতকাল সারা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল সৈয়দপুরে ৩৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাজধানী ঢাকায় ছিল ৩৭ সেলসিয়াস। একইসঙ্গে চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান ও কুমিল্লা জেলা ছাড়া দেশের প্রায় সব অঞ্চল ছিল প্রায় বৃষ্টিহীন।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলাসহ রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের উপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। পূর্বাভাসে আরো বলা হয়, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেইসঙ্গে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণ হতে পারে। এছাড়া দেশের অন্যান্য অঞ্চলে অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। তবে আজ বেলা ১টার মধ্যে সিলেট অঞ্চলের ওপর দিয়ে বৃষ্টি অথবা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। এ সময় বাতাসের গতিবেগ হতে পারে ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার। এসব অঞ্চলের নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্কসংকেত দেখাতে হবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম বলেন, দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলে বৃষ্টি না হাওয়ায় গরম বেড়েছে। আপাতত ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। তাই আরো দুই থেকে তিন দিন তাপপ্রবাহ থাকতে পারে।

এল নিনোর প্রভাবে অস্বাভাবিক গরম : কয়েক দিন ধরে সূর্য যেন দাবানল মুখে নিয়ে গরমের তীব্রতা ছড়াচ্ছে। রোদের তীব্র তাপ যেন সব কিছু পুড়িয়ে দিচ্ছে। দেশের শহর, বন্দর, গ্রাম সব জায়গাতেই একই অবস্থা। তীব্র তাপদাহে হাঁসফাঁস করছে সব বয়সি মানুষ। এমনকি প্রাণীকুলও। তীব্র গরমের কারণে সারা দিন অস্বস্তি আর সারা রাত কাটে ঘুমহীন। স্বস্তি নেই একেবারেই।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এল নিনোর এমন তীব্র অবস্থার কারণে এই অস্বাভাবিক গরমের অনুভূতি। তার সঙ্গে আছে অধিক আর্দ্রতা। দুইয়ে মিলিয়ে তাপমাত্রার তুলনায় অধিক গরম অনুভূত হচ্ছে। তারা বলছেন, এ মাসে এমন তাপপ্রবাহে ভুগতে হবে আরো কয়েকবার। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ বছর বর্ষাকালে বৃষ্টি অন্য বছরের তুলনায় কম হতে পারে। এল নিনো হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট একটি অস্বাভাবিক জলবায়ু অবস্থা। প্রতি ২ থেকে ৭ বছর অন্তর মধ্য ও পূর্ব ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায়। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে বায়ু প্রবাহিত হয় এবং উষ্ণ পানিকে এশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। এল নিনোর প্রভাবে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় (বাংলাদেশও অন্তর্ভুক্ত) বৃষ্টিপাত কমে যায় এবং তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দেয়।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক ও আবহাওয়াবিদ মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, প্রথমত এল নিনো বর্তমানে খুব তীব্র অবস্থানে আছে। এটি যখন খুব তীব্র অবস্থায় থাকে তখন জলবায়ু এবং আবহাওয়ায় অনেক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির তৈরি হয়। অনেক সময় দেখা যায়, কম সময়ে অধিক বৃষ্টিপাত হয়। বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা নয় এমন সময়েও বৃষ্টিপাত হয়। তিনি বলেন, তাপমাত্রা খুব বেশি নয়। কিন্তু তীব্র গরম অনুভূত হচ্ছে। বর্তমান তাপপ্রবাহের অন্যতম কারণ এই এল নিনো। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাতাসে অধিক আর্দ্রতা। এল নিনোর তীব্র সক্রিয়তা এবং আর্দ্রতা দুটো মিলিয়ে তাপমাত্রা যা তার থেকে গরম অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে। তিনি বলেন, জুন মাসে তাপমাত্রা আরেকটু বাড়তে পারে। এতে গরমের অনুভূতি আরো বেড়ে যেতে পারে। গ্রামেও বর্তমানে এই তীব্র গরম অনুভূত হচ্ছে। তবে সেটা শহরের চেয়ে কম। কারণ গ্রামে গাছপালা আছে। যেখানে কংক্রিট বেশি সেখানে তীব্র গরমের অনুভূতিও বেশি হয়।

এদিকে গত কয়েক দিনে দেশের অনেক জায়গায় তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে। এর তুলনায় গরমের অনুভূতি আরো বেশি। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সারা দেশেই জনজীবনে চরম ভোগান্তি বিরাজ করছে। বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর, শ্রমিক, কৃষকরা। আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক বলেন, যখন দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশে প্রবেশ করে তখন বাতাসে জলীয়বাষ্পের জোগান বেড়ে যায়। এ কারণে মানুষের অস্বস্তি বেড়ে যায়। এই অস্বস্তিকর অবস্থা আজ পর্যন্ত থাকবে। ৪ জুন থেকে বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ৫ থেকে ৬ জুন সারা দেশে বৃষ্টিপাত ছড়িয়ে যেতে পারে। তখন সারা দেশেই তাপমাত্রা কমে যাবে।

রাজশাহীতে বিপর্যস্ত জনজীবন : চলমান তীব্র তাপদাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উত্তরের জনপদ রাজশাহীর স্বাভাবিক জনজীবন। বিশেষ করে তীব্র রোদ আর ভ্যাপসা গরমে সব থেকে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন শিশু ও বয়স্করা। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রাজশাহীতে মৌসুমের অন্যতম উষ্ণতম দিন পার হয়েছে। গতকাল এই জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ দিন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল ৬৫ শতাংশ, যা ভ্যাপসা গরমের অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। এর আগের দিন আবহাওয়া পরিস্থিতি প্রায় একই রকম ছিল। এ দিন রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। টানা দুই-তিন দিন একই ধরনের উচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করায় তাপপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। প্রতিনিয়ত বাড়ছে অসুস্থ মানুষের সংখ্যা।

কাজে বা বিভিন্ন প্রয়োজনে দীর্ঘক্ষণ রোদে থাকার ফলে হিটস্ট্রোক ও পানিবাহিত রোগী বাড়ছে। জ্বর, সর্দি-কাশিসহ গরমে অসুস্থ হয়ে পড়া রোগীদের সংখ্যাও বাড়ছে বলে বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। মহানগর ও জেলার উপজেলাগুলোতে অব্যাহত এই তাপপ্রবাহে নাভিশ্বাস উঠেছে খেটে খাওয়া মানুষসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষেরও। গত কয়েক দিন ধরেই সকাল থেকে বিকেল প্রায় সাড়ে ৬টা পর্যন্ত সূর্যের প্রখর রোদ থাকায় খেটে খাওয়া দিনমজুররা বেশি সময় ধরে মাঠে থাকতে পারছেন না। তীব্র দাবদাহের কারণে দিনের বেলা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘরের বাইরে বের হচ্ছে না। এতে সব থেকে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর, রিকশাচালক ও খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ। কাঠফাটা রোদে তাদের আয়-রোজগারে ভাটা পড়েছে।

শহরের মোড়ে মোড়ে তৃষ্ণা মেটানোর জন্য ডাব, তালের শাঁস ও শরবতের দোকানে ভিড় করছেন পেটের দায়ে গরম উপেক্ষা করে রাস্তায় নামা মানুষ। চিকিৎসকরা বলছেন, প্রচণ্ড গরমে অতিরিক্ত ঘাম নিঃসরণ হয় বলে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি, তরল খাবার ও প্রয়োজনে স্যালাইন পান করা জরুরি। সুস্থ থাকতে শিশু ও বয়স্কদের প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে না বের হতে, আরামদায়ক সুতি কাপড় পরিধান করতে এবং সহজপাচ্য ও তরল খাদ্য খাওয়াতে পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। রোদে বের হওয়ার ক্ষেত্রে ছাতা, টুপি ও রোদচশমা ব্যবহারের পাশাপাশি হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচতে সরাসরি কড়া রোদে বেশিক্ষণ অবস্থান না করার জন্যও বলা হয়েছে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়