মিজান রহমান

  ২৭ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০

হাজার কোটি টাকার বাজার দেশি অ্যাপের

* দেশের ডেভেলপাররা বানাচ্ছে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ* গেম ডেভেলপমেন্টের ওপর ১৬ হাজার শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে সরকার * প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে আরো ১০ হাজার জনকে

স্মার্টফোনের পাশাপাশি বেড়েছে অ্যাপের চাহিদা। তৈরি হচ্ছে নানা রকম অ্যাপ। রপ্তানির কথা বাদ দিলেও দেশে অ্যাপের বাজারের আকার এখন অন্তত হাজার কোটি টাকার। এ ছাড়া সরকারি অ্যাপের চাহিদা তো আছেই। এ খাতের সফলতা দেখে সুদূরপ্রসারী চিন্তাও করেছে সরকার। মোবাইল অ্যাপ ও গেমসের ওপর রীতিমতো প্রশিক্ষণ দিয়ে ডেভেলপার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী দিনে নতুন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রযুক্তি বাজারের বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে যেসব অ্যাপ ব্যবহার হচ্ছে তার বেশির ভাগই স্থানীয়ভাবে তৈরি। বাংলাদেশের ডেভেলপাররা আন্তর্জাতিক মানের অ্যাপ তৈরির সক্ষমতা রাখেন। দেশের পাশাপাশি বিদেশের জন্যও তারা অ্যাপ বানাচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বর্তমানে স্মার্টফোনে বিদেশি অ্যাপের পাশাপাশি দেশি অ্যাপও আছে অনেক। এরমধ্যে মোবাইলে আর্থিক সেবার অ্যাপ দিয়ে লেনদেন করছেন গ্রাহকরা। ব্যাংকের একটা অ্যাপও থাকতে পারে এ তালিকায়। এ ছাড়া যে মোবাইল অপারেটরের সিম ব্যবহার করছে, সেই কোম্পানির অ্যাপও আছে। তা দিয়ে ব্যালান্স রিচার্জ, ইন্টারনেট প্যাকেট ক্রয়, প্রিয়জনকে বান্ডল উপহার পাঠানো যাচ্ছে। সম্প্রতি জনপ্রিয় হয়েছে রাইড সেবা নেওয়ার অ্যাপ। প্রতিটি মোবাইলে রয়েছে এর কোনো না কোনো অ্যাপ। এসবই দেশি তৈরি। বলা যায়, গ্রাহের অগোচরেই যথেষ্ট বড় হয়েছে দেশি অ্যাপ বাজার।

------
অ্যাপের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, অনলাইন ডেলিভারি সিস্টেম, গণমাধ্যম, বিনোদন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অনলাইন টিকিটিং, ট্রাভেল, রাইড শেয়ারিং, ওষুধ সরবরাহ ইত্যাদি দেশে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এখন যেকোনো প্রতিষ্ঠানের বিশেষ করে সেবাভিত্তিক হলে, একটি ওয়েবসাইট যেমন থাকে; তেমনি অ্যাপ থাকাও অনেকটা নিয়মের মতো হয়ে গেছে। ব্যাংক, টেলিকম অপারেটররা অ্যাপের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছেন। অ্যাপ থেকে মোবাইল রিচার্জ করা যাচ্ছে, অন্যকে রিচার্জ দেওয়া যাচ্ছে বা উপহারও দেওয়া যাচ্ছে। হিসাবও রাখা যাচ্ছে খরচের। কয়েকটি ব্যাংক বাসায় বসে অ্যাপ ডাউনলোড করে হিসাব খোলার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।

প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, ২০০৭-০৮ সাল থেকে দেশে অ্যাপ তৈরি শুরু হয়েছে, যা আলোয় আসতে শুরু করে ২০০৯ সাল থেকে। ২০১০ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী অ্যাপ জনপ্রিয় হতে শুরু করে, যা এখনো অব্যাহত আছে। আইসিটি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এ বিষয়ে প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘দেশি অ্যাপের বাজার এখন অনেক বিস্তৃত। এ সময়ের টেকনোলজি ভোক্তারা যেকোনো সার্ভিসের প্রায় শতভাগই তাদের স্মার্টফোনের মাধ্যমে পেতে আগ্রহী। আমরা দেখেছি যে, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, বিনোদন, অনলাইন টিকিটিং প্রভৃতিতে অ্যাপের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। আমরা সরকারি সেবাগুলোকেও মোবাইল অ্যাপে নিয়ে এসেছি। আমাদের দেশের ডেভেলপাররাই কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করছেন। এর বাজার এত বড় হয়েছে যে, মোবাইল অ্যাপের ধারণা এখন আর শুধু ইনফরমেটিভ বা ট্রানজেকশন লেভেলের অ্যাপ তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর সঙ্গে মোবাইল গেম ও টেলিকম প্রতিষ্ঠানগুলোর ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস (ভ্যাস) যুক্ত হয়ে দেশীয় বাজারেই হাজার কোটি টাকার মার্কেটে পরিণত হয়েছে।’

প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আন্তর্জাতিকভাবে গেমের মার্কেট ১৫২ বিলিয়ন ডলারের। সেই মার্কেটে প্রবেশ করার জন্য আমরা গেম ডেভেলপমেন্টের ওপর ১৬ হাজার শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আরো ১০ হাজার জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। অ্যাপভিত্তিক এন্টারপ্রেনারশিপগুলোও দেশে জনপ্রিয় হচ্ছে।’

সরকারি উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী পলক বলেন, ‘আমরা ইনোভেশন ফান্ড, স্টার্টআপ ফান্ড, আইডিয়া প্রজেক্টের আওতায় এসব ইনোভেটিভ বিজনেস আইডিয়ায় ফান্ডিং করছি। একই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেবা ও অটোমেশনের সুবিধার্থে অ্যাপভিত্তিক সলিউশন তৈরির ক্ষেত্রে আমরা ওই প্রতিষ্ঠানের হয়ে কনসালটেশন ও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ফান্ড সরবরাহ করছি।’ সফটওয়্যার ও সেবাপণ্যের নির্মাতাদের সংগঠন বেসিস সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর এ বিষয়ে বলেন, দেশি অ্যাপের বাজার বড় হচ্ছে। অনেকেই এখন আগ্রহী হচ্ছেন অ্যাপ তৈরি করতে। যারা শুধু ওয়েবসাইট বানাতেন, তারা এখন অ্যাপও তৈরি করছেন। এটা ভালো অগ্রগতি।

দেশি অ্যাপ ডেভেলপাররা কেমন করছেন জানতে চাইলে বেসিস সভাপতি বলেন, ‘দেশে যেসব অ্যাপ ব্যবহার হচ্ছে তার বেশির ভাগই দেশে তৈরি। আমাদের ডেভেলপাররা আন্তর্জাতিক মানের অ্যাপ তৈরির সক্ষমতা রাখেন। তারা দেশের পাশাপাশি বিদেশের জন্যও অ্যাপ বানাচ্ছেন।’

বাংলাদেশের মানুষ ব্যবহার করে এমন শীর্ষ ৫০টি ওয়েবসাইটের তালিকা সম্প্রতি প্রকাশ করেছে ওয়েবসাইট রেটিং প্রতিষ্ঠান অ্যালেক্সা। এরমধ্যে ২০টিই বাংলাদেশের অ্যাপ, ১৫টি বিভিন্ন সংবাদপত্র ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের। বাকি ৫টি অন্য প্রতিষ্ঠানের, যেমন বিডিজবস, দারাজ, টেলিটক, বিক্রয় ডটকম, পোর্টাল ডট গভ. বিডি।

এদিকে টপ অব স্ট্যাক সফটওয়্যার নামের একটি ওয়েবসাইট দেশের শীর্ষ জনপ্রিয় কয়েকটি অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপের তালিকা প্রকাশ করেছে। এরমধ্যে রয়েছে কানেক্ট ব্যাকআপ, প্রেয়ার টাইম-কোরআন-কিবলা ও তাসবিহ, হাফিজি কোরআন ১৫ লাইনস, কিডস লার্ন বাংলা অ্যালফাবেট, রিদমিক কি-বোর্ড, বিকাশ, পাঠাও। এদিকে দেশিজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান দেশি অ্যাপের (অ্যান্ড্রয়েড) যে তালিকা প্রকাশ করেছে তার মধ্যে রয়েছে সেবা ডট এক্সওয়াইজেড, উবার, পাঠাও, ডক্টরোলা, দারাজ, চালডাল, ফুডপান্ডা, হাংগ্রি নাকি, সহজ ডট কম ও বিক্রয় ডট কম। জনপ্রিয় অ্যাপগুলোর মধ্যে আরো রয়েছে নগদ, প্রথম আলো, বিডিজবস, রেলওয়ে টিকিট, নূর, কফি আড্ডা, ওয়াও বক্স, ইভ্যালি, শিখো, বঙ্গ, পালস ইত্যাদি।

অ্যাপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমসিসি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী আশরাফ আবীর বলেন, ‘আমরা অ্যাপ তৈরির কাজ শুরু করি ২০০৯ সালে। তখন তৈরি করতাম জাভা ও সিমবিয়ান হ্যান্ডসেটের জন্য। ওই বছর থেকেই আমরা নকিয়ার জন্য অ্যাপ বানাতে শুরু করি। তখন নকিয়ার অভি স্টোরের জন্য অ্যাপ বানাতাম।’

সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে এই প্রযুক্তি নির্মাতা বলেন, শুধু অ্যাপ তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনার বিষয় হিসেবে অ্যাপ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আশরাফ আবীর আরো জানান, বর্তমানে দেশে ৫০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার অ্যাপের বাজার রয়েছে। সরকারের অন্তত ৫০০ সেবা অ্যাপের মাধ্যমে দেওয়া সম্ভব। তিনি সরকারকে অ্যাপের মাধ্যমে জনগণকে সেবাদানের বিষয়টি আরো গুরুত্ব দিয়ে ভাবার পরামর্শ দেন।

 

 

"

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়