মো. মাঈন উদ্দিন

  ০৮ ডিসেম্বর, ২০২১

পর্যবেক্ষণ

চোখ রাঙাচ্ছে ওমিক্রন

২০১৯ সালের শেষের দিকে সারা বিশ্বে একটি উদ্বেগের রেখা ছড়িয়ে পড়ে। উদ্বেগের নাম কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস। নিরাপত্তার ঘন চাদরের ভেতর দিয়েই মারাত্মক এই ভাইরাসটি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর সব দেশে। করোনাভাইরাসের কাছে এককথায় অসহায় হয়ে পড়ে সব দেশের বিজ্ঞানী। বর্তমানে এই ভাইরাসের প্রতিরোধ হিসেবে প্রায় প্রতিটি দেশে শুরু হয়েছে টিকা গ্রহণ। ফলে যখন পৃথিবীর মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে ঠিক তখনই করোনাভাইরাসের নতুন ধরন বা ভ্যারিয়েন্ট ‘ওমিক্রন’ নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে তোলপাড়। এরই মধ্যে করোনার এই শক্তিশালী ভ্যারিয়েন্ট ক্ষিপ্রগতিতে ছড়িয়ে পড়েছে ৩০ দেশে। যুক্তরাষ্ট্রে দুই ডোজ টিকা নেওয়া ব্যক্তিরাও আক্রান্ত হয়েছেন ওমিক্রনে। এর পুনঃসংক্রমণ ক্ষমতা ডেল্টার চেয়ে তিন গুণ বেশি। পাশাপাশি ওমিক্রন সংক্রমণ ব্যক্তির মধ্যে পরিচিত উপসর্গ দেখা যায় না। তাই প্রতিদিনই নতুন নতুন স্থানে ওমিক্রন সংক্রমণের খবর মিলছে। ফলে উদ্বেগ বাড়ছে বিশ্বজুড়ে। ওমিক্রন প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী সতর্কতামূলক প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এদিকে গত সপ্তাহে ওমিক্রন শনাক্তে উদ্বেগ বেড়েছে ভারতে। করোনাভাইরাসের নতুন এই ভ্যারিয়েন্টে ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশকেও ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় ফেলেছিল ভারত। দক্ষিণ আফ্রিকার বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, ওমিক্রনে পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে তিন গুণ বেশি। তবে ডেল্টার চেয়ে আরো ভয়াবহ উদ্বেগের তথ্য জানিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিজ্ঞানীরা। এ অবস্থায় আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

করোনাভাইরাসের ওমিক্রন ধরন নিয়ে প্রাথমিক একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ডেল্টা ও বেটা ধরনের তুলনায় ওমিক্রনের পুনরায় সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি তিন গুণ বেশি। আগে করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে গড়ে ওঠা প্রতিরোধব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার সক্ষমতাও রয়েছে ওমিক্রনের। গত নভেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকায় ২৮ লাখ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৩৫ হাজার ৬৭০ জন পুনরায় সংক্রমিত হয়েছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। সাউথ আফ্রিকান ডিএসআই-এনআরএফ সেন্টার অব এক্সিলেন্স ইন এপিডেমিওলজিক্যাল মডেলিং অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের পরিচালক জুলিয়েট পুলিয়াম জানান, দক্ষিণ আফ্রিকায় করোনার প্রথম তিন ঢেউয়ে যারা সংক্রমিত হয়েছিলেন, তাদের অনেকের শরীরেই আবার ভাইরাসটি ধরা পড়েছে। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই আগে ডেল্টা ধরনে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে দুই ডোজ টিকা নেওয়া ব্যক্তিও ওমিক্রনে আক্রান্ত হচ্ছেন। দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) জানিয়েছে, আক্রান্ত ব্যক্তি পূর্ণ ডোজ টিকাপ্রাপ্ত। ক্যালিফোর্নিয়ার এই বাসিন্দা গত ২২ নভেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরেন। এর সাত দিনের মাথায় তিনি করোনা আক্রান্ত হন। বর্তমানে তিনি স্ব-বিচ্ছিন্ন রয়েছে বলে সিডিসি জানিয়েছে।

তবে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রনের সংক্রমণ এখনো বাংলাদেশে কারো মধ্যে পাওয়া যায়নি। যদিও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতের মহারাষ্ট্রে ফিরে আসা এক ব্যক্তির দেহে করোনা পজিটিভ ধরা পড়ায় ভারত সরকার বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে নির্দেশনা জারি করে। ভারতের তালিকায় ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো হলো- যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, সিঙ্গাপুর, হংকং, চীন, নিউজিল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে, মরিশাস, বোতসোয়ানা ও ইসরায়েল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সূত্র জানায়, মাত্র ১০ দিনে ৩০ দেশে ছড়িয়ে পড়েছে করোনার নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট। গত ২৪ নভেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম নতুন প্রজাতির ভাইরাস নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে রিপোর্ট করেছিল। ‘ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল’ (ইসিডিসি) গত বৃহস্পতিবার যে তালিকা প্রকাশ করেছে, সেখানে দেখা গেছে মাত্র ১০ দিনে ১২ থেকে ৩০টি দেশে সংক্রমিত হয়েছে ওমিক্রন প্রজাতির করোনা। ডেল্টার থেকেও দ্রুতগতিতে এই প্রজাতি সংক্রমিত হচ্ছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। তবে নতুন প্রজাতির সব তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন। এই প্রজাতি কতটা ভয়ংকর তাও এখনো স্পষ্ট নয়।

তবে ইসিডিসি গত বৃহস্পতিবার যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তাতে বলা হয়েছে, আগামী কিছুদিনের মধ্যে ওমিক্রন মূল সংক্রমক স্ট্রেইন বা ডমিন্যান্ট স্ট্রেইনে পরিণত হতে পারে। এখন করোনার মূল সংক্রমক স্ট্রেইন ডেল্টা। ওমিক্রন তার জায়গা নিয়ে নিতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। বস্তুত, ইউরোপে নতুন করে করোনা ছড়াতে শুরু করেছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, আগামী কিছুদিনের মধ্যে ইউরোপে করোনা ধরা পড়বে তার অর্ধেকই হবে ওমিক্রন।

ইসিডিসি এদিন দাবি করেছে, আফ্রিকার বোতসোয়ানায় ১১ নভেম্বর প্রথম ওমিক্রন পাওয়া গেছিল। এরপর তা দক্ষিণ আফ্রিকায় ছড়ায়। দক্ষিণ আফ্রিকার চিকিৎসকরা অবশ্য এখনো বলতে পারেননি, কবে সেখানে প্রথম ওমিক্রন পাওয়া যায়। তবে গত বেশ কিছুদিন ধরেই যে সেখানে করোনার নতুন উপসর্গ দেখা যাচ্ছিল, তা জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এদিকে ওমিক্রনে সতর্কতামূলক প্রস্তুতি নিতে বলল ডব্লিউএইচও। যে কারণে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি করোনা বিধিনিষেধে কড়াকড়ি করেছে বিভিন্ন দেশ। এর মাঝেই এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোকে সতর্কতামূলক প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

জানা গেছে, ওমিক্রনের সংক্রমণে অসুস্থতার মাত্রা তীব্র নয়, বরং হালকা মাত্রার হয়। এটি মৃদু রোগের উপসর্গের সঙ্গে পেশিতে ব্যথা এবং এক বা দুদিনের জন্য ক্লান্তিবোধ সৃষ্টি করে। ভাইরাসটি সংক্রমিতের স্বাদ বা গন্ধের ক্ষতি করে না বলে এখন পর্যন্ত আমরা জানতে পেরেছি। আক্রান্তদের হালকা কাশি হতে পারে। কোনো বিশেষ লক্ষণ নেই। এদিকে, এরই মধ্যে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের কারণে সাউথ আফ্রিকাসহ সাত দেশ থেকে বাংলাদেশে আসলে ১৪ দিন হোটেলে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত বৃহস্পতিবার রাতে এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। এ ছাড়া পৃথিবীর সব দেশ থেকেই বাংলাদেশে আসতে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আরটি পিসিআর পদ্ধতিতে করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট থাকতে হবে, যা আগে ছিল ৭২ ঘণ্টা।

বেবিচকের ফ্লাইট স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড রেগুলেশন্সের সদস্য গ্রুপ ক্যাপ্টেন চৌধুরী এম জিয়াউল কবির স্বাক্ষরিত আদেশ গত শনিবার থেকে কার্যকর হয়। এই সাত দেশ হচ্ছে- বোতসোয়ানা, এসওয়াতিনি, ঘানা, লেসোথো, নামিবিয়া, সাউথ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ে। এই দেশগুলো থেকে আসলে ১৪ দিন নিজ খরচে হোটেলে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। সেখানে সাত দিন পর একবার এবং ১৪ দিন পর আবার করোনা পরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষার খরচ যাত্রীকেই বহন করতে হবে। এ ছাড়া ফ্লাইটে ওঠার আগেই সরকার নির্ধারিত হোটেল বুক করতে হবে। হোটেলে সপ্তম দিনে করোনা পরীক্ষায় পজিটিভ রিপোর্ট আসলে আলাদা করে আইসোলেশনে পাঠানো হবে। নেগেটিভ রিপোর্ট আসলে হোটলে বাকি সাত দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন। ১৪তম দিনে নেগেটিভ রিপোর্ট আসলে যাত্রী নিজের বাড়িতে যেতে পারবেন। এই সাত দেশ ছাড়া অন্যান্য দেশ থেকে আসলে ২৩ অক্টোবর জারি করা বেবিচকের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, চেক রিপাবলিক, জাপান, ভারত, ইরান ও থাইল্যান্ড ওমিক্রনের বিস্তার ঠেকাতে আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি দেশ থেকে ফ্লাইট বাতিল, নিষেধাজ্ঞা এবং নিজ নিজ দেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

ওমিক্রন গত ২৪ নভেম্বর প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকায় শনাক্ত হয়। তারপর অন্যান্য দেশে শনাক্ত হয়েছে নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট। করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রন নিয়ে এরই মধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। উদ্বিগ্ন বিজ্ঞানীরাও। তারা বলছেন, করোনাভাইরাস ব্যাপকভাবে রূপান্তরিত হয়ে নতুন এই রূপ নিয়েছে। এটি মারাত্মক হুমকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সুতরাং ওমিক্রন নিয়ে এখনই বাড়তি সর্তকতা জরুরি। নচেৎ বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারি আমরা।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close