দৃষ্টিপাত

শান্তিময় সমাজ গঠনে বিশ্বনবীর আদর্শ

প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

মাহমুদ আহমদ

সর্বকালের ও সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ মানুষ এবং নবিকুল শিরোমণি হজরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনে ধন্য ত্রিভুবন। সারা জাহান যখন জুলুম, অত্যাচার ও নির্যাতনের জাঁতাকলে নিষ্পেসিত; ঠিক তখন মানবতার মুক্তি ও ত্রাণকর্তা হিসেবে পবিত্র এ রবিউল আউয়াল মাসে তার আগমন। বিশ^নবীর সমগ্র জীবন অতিবাহিত হয়েছে মানুষের মুক্তি সাধন, ঐক্য ও সুসভ্য জাতি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। এজন্যই আল্লাহতায়ালা তাকে সম্বোধন করে বলেছেন, ‘রহমতুল্লিল আলামীন’ অর্থাৎ সারা বিশ্বের রহমতস্বরূপ। জন দরদি এই মহানবী (সা.) মানুষকে সব ধরনের পঙ্কিলতা, অনিয়ম, অনাচার, পাপাচার ও অন্ধকারের বেড়াজাল হতে মুক্ত করতে আজীবন চেষ্টা চালিয়েছেন, সংগ্রাম করেছেন। তার সংগ্রাম ছিল শান্তি প্রতিষ্ঠার, তিনি রাজ্য দখলের জন্য সংগ্রাম করেননি। সর্বত্র শান্তি প্রতিষ্ঠার অভীষ্ট লক্ষ্যে না পৌঁছা পর্যন্ত তিনি ক্ষান্ত হননি। নিজে বহু কষ্ট করেছেন, নানা বাধাবিঘেœর সম্মুখীন হয়েছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন, লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়েছেন, জীবনের ওপর বারবার হুমকি এসেছে; তবু তিনি পিছিয়ে যাননি। একাধারে বিরামহীন চেষ্টা ও অক্লান্ত পরিশ্রম দ্বারা তিনি জয়যুক্ত হয়েছেন। এভাবে সেকালের ঘুণে ধরা সমাজ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

মহানবীর (সা.) মাধ্যমে বিশ্বের জাতিসমূহ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অনুগ্রহপ্রাপ্ত হয়েছে। কারণ আগে কখনো মানবজাতির ওপর আল্লাহতায়ালার রহমত এরূপ ব্যাপক আকারে বর্ষিত হয়নি। তিনি (সা.) নিজেও একই বক্তব্য বিভিন্ন হাদিসে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। যেমন মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আমাকে সাদা কালো নির্বিশেষে সকলের জন্য পাঠানো হয়েছে।’ (মুসনাদে আহমদ)

মহানবীর (সা.) পূর্বে আবির্ভূত আল্লাহতায়ালার সব নবী জাতীয় নবী ছিলেন। তাদের শিক্ষা যে জাতির নিকট তারা প্রেরিত হয়েছিলেন, সে জাতির উদ্দেশ্যে ছিল এবং সেই বিশেষ কালের জন্য প্রযোজ্য ছিল যে সময়ে তাদের আবির্ভাব হয়েছিল। পক্ষান্তরে বিশ^নবী (সা.) প্রেরিত হয়েছিলেন সমগ্র মানবজাতির হেদায়াত ও কল্যাণের জন্য। মানবেতিহাসে তার আবির্ভাব এক অনুপম ঘটনা। যার উদ্দেশ্য ছিল সব পৃথক পৃথক জাতি ও বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীকে একই ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ করা; যেখানে জাতি, ধর্ম ও বর্ণজনিত সব ভেদাভেদ বিলীন হয়ে যাবে। যেভাবে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তোমাকে বিশ্বজগতের জন্য কেবল এক রহমতরূপেই পাঠিয়েছি।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭) তাইতো উম্মতে মুহাম্মদিয়াকে সবসময় দরুদ পাঠের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেভাবে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করছেন ‘নিশ্চয় আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা এ নবীর প্রতি রহমত বর্ষণ করছেন। হে যারা ঈমান এনেছ! তোমরাও তার প্রতি দরুদ পাঠ করো এবং তার জন্য বেশি বেশি করে শান্তি কামনা করো। নিশ্চয় যারা আল্লাহ ও তার রাসুলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের প্রতি ইহকালে ও পরকালে অভিসম্পাত করেছেন এবং তিনি তাদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক আজাব প্রস্তুত করে রেখেছেন।’ (সুরা আল আহযাব : ৫৫-৫৬)

মহানবী (সা.) সব ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য যেভাবে শান্তি কামনা করেছেন, তেমনি তিনি সর্বস্তরে সেই শান্তি প্রতিষ্ঠাও করেছেন। ইসলাম এমন একটি সত্য-ধর্ম, যার প্রমাণ দেওয়ার যেমন কোনো প্রয়োজন নেই, ঠিক তেমনই বিশ্বনবীর (সা.) শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়েও কারো সন্দেহ থাকার কোনো অবকাশ নেই। তাইতো এ সত্য-ধর্ম ইসলাম এবং সত্য ও শ্রেষ্ঠ নবীর অবমাননা করাও কারো পক্ষে সম্ভব নয়। যারা এমনটি করার ধৃষ্টতা দেখাবে, তারা নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যাবে।

মহানবীর আদর্শ কতইনা অনুপম ছিল যে, তিনি (সা.) বলেছেন, ‘একজন মুসলমান হলো সেই ব্যক্তি, যার হাত এবং জিহ্বা হতে অন্যরা নিরাপদ থাকে।’ (বোখারি-মুসলিম) বস্তুত ইসলামী-শিক্ষা এক মুসলমানকে শান্তিপ্রিয়, বিনয়ী এবং মহৎ গুণাবলির অধিকারী হতে উদ্বুদ্ধ করে। এই শিক্ষা ভুলে পরস্পর হানাহানির নীতি কোনোক্রমেই ইসলাম সমর্থন করে না। যদিও এ কথা অনেকেই বাস্তব ক্ষেত্রে বেমালুম ভুলে বসেছে। যদি আমার হাত ও মুখ থেকে অন্যরা নিরাপদই না থাকে তাহলে আমার কার্যে প্রমাণ করে যে, আমি শান্তির ধর্ম ইসলাম এবং উম্মতে মুহাম্মদিয়ার অনুসারী নই।

খাতামান্নাবীইন হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর শিক্ষা দেখুন, একবার এক জিহাদের ময়দানে উসামা বিন যায়েদ (রা.)-এর সঙ্গে এক ব্যক্তির লড়াই হচ্ছিল। উসামা বিন যায়েদ লোকটিকে যুদ্ধে পরাস্ত করেন এবং হত্যা করতে উদ্যত হন। এমন সময় অবিশ্বাসী লোকটি সম্পূর্ণ কলেমা নয় বরং এর প্রথমাংশ পাঠ করে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন। তথাপি উসামা তাকে হত্যা করেন। ঘটনাটি হজরত রাসুল করিম (সা.)-এর কাছে রিপোর্ট করা হলে তিনি (সা.) উসামাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, সে ইসলাম গ্রহণ করার পরও তুমি তাকে কেন হত্যা করলে? উত্তরে উসামা বলেছিলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! সে তো প্রাণের ভয়ে ইসলাম কবুল করেছিল? মহানবী (সা.) তখন বলেছিলেন, ‘তুমি কি তার হৃদয় ফেড়ে দেখেছিলে যে, সে সত্য সত্যই ইসলাম গ্রহণ করেছিল, না প্রাণের ভয়ে এ কথা উচ্চারণ করেছিল? মহানবী (সা.) অতঃপর বলতে লাগলেন, কাল হাশরের ময়দানে আল্লাহর সামনে তুমি কী করে তোমার কাজকে সঠিক সাব্যস্ত করবে? তিনি (সা.) বলেন, যখন কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে তখন তুমি কী করবে? মহানবীর (সা.) এরূপ ভয়ানক অসন্তুষ্টি দেখে উসামা ভীষণ ঘাবড়ে যান আর তিনি (সা.) তখনো ওই কথাই বারবার বলছিলেন যে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্ল­াহ’ যখন তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে, তখন তুমি কী করবে? উসামা পরে বলেছিলেন, ‘হায়! আমি যদি এ ঘটনার পরে ইসলাম গ্রহণ করতাম’। এ ঘটনা এবং আরো নানা ঘটনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, বলপূর্বক মুসলমান বানানো ইসলামী ‘জিহাদে’র উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না এবং সে যুগে বলপূর্বক কাউকে মুসলমান করাও হয়নি, কোনো যুদ্ধ বন্দিকেও না। ইসলাম কখনো তরবারির দ্বারা প্রসার লাভ করেনি, ইসলাম প্রসার লাভ করেছে বিশ^নবীর (সা.) উন্নত আদর্শ, মানবপ্রেম, তাবলিগ ও ক্ষমার দৃষ্টান্তের মাধ্যমে।

হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, মহানবী (সা.) কখনো বিধবা ও অভাবী লোকদের সাহচর্যকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখতেন না আর তাদের এড়িয়েও চলতেন না। বরং তিনি তাদের অভাব মোচন করে দিতেন (মসনাদ দারেমি)। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘হজরত রাসুল করিম (সা.) কখনো কাউকে প্রহার করেননি, না কোনো মহিলাকে, না কোনো খাদেমকে, যদিও তিনি আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদ করেছেন। যদি তিনি কখনো কারো দ্বারা কষ্ট পেতেন তবু তিনি তার প্রতিশোধ নিতেন না। কিন্তু যখন আল্লাহর বর্ণিত পবিত্র স্থানসমূহকে অপবিত্র করা হতো, তখন তিনি আল্লাহতায়ালার জন্য এর প্রতিশোধ নিতেন’ (মুসলিম)। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, ‘রাসুল করিম (সা.) গোলামদের সঙ্গে আহার করতেন এবং গম ভাঙানোর সময় গোলামরা ক্লান্ত হয়ে পড়লে তিনি তাদের সাহায্য করতেন। বাজার হতে জিনিসপত্র ঘরে বহন করে নিয়ে যাওয়াকে তিনি হেয় মনে করতেন না। ধনী-দরিদ্রের সঙ্গে একইভাবে মুসাফাহা (করমর্দন) করতেন। সর্বপ্রথম সালাম করতেন। তিনি কোনো নিমন্ত্রণকে অবজ্ঞা করতেন না, যদিওবা সেই নিমন্ত্রণ শুধু খেজুরের হতো। তিনি দুঃখীদের পরিত্রাণ দান করতেন। তিনি কোমল হৃদয়ের অধিকারী ও দয়ালু ছিলেন। তার আচার-ব্যবহার উত্তম ছিল’ (মিশকাত)।

আল্লাহতায়ালা মহানবীর (সা.) মাধ্যমে ন্যায়ের তুলাদন্ড তুলে ধরেন এবং ইনসাফ ও রহমতের শাসন কায়েম করেন, যার ফলে তিনি (সা.) ঘোষণা করলেন কারো ওপর আর জুলুম হবে না। ধর্মের ব্যাপারে কারো হস্তক্ষেপ থাকবে না, জবরদস্তি থাকবে না। নারী ও ক্রীতদাসের প্রতি যে জুলুম করা হচ্ছে, তা শেষ করা হবে এবং শয়তানের হুকুমতের স্থলে এক আল্লাহর হুকুমত প্রতিষ্ঠিত হবে। ঠিক এমনই হলো, জুলুম অত্যাচারের রাজত্বের পর দলে দলে লোকেরা মহানবীর (সা.) আদর্শ দেখে ইসলাম গ্রহণ করতে লাগলেন। মুসলমানদের একের পর এক বিজয় হতে লাগল। মদিনার পৌত্তলিকরাও ইসলাম গ্রহণ করতে লাগলেন। ধীরে ধীরে মুসলমানদের অন্ধকার রজনি কেটে গেল, উদিত হলো নতুন সূর্যের, মক্কা মুসলমানদের অধীনে চলে এলো। অল্প দিনের মধ্যেই গোটা আরবে ইসলামী পতাকা পত পত করে উড়তে থাকল। এত অল্প সময়ে ইসলামের বিজয়ের পেছনে কোন শক্তি কাজ করেছিল? এর পেছনে বিশ^নবীর (সা.) মানবপ্রেম ও দোয়ার বরকতেই ইসলামের বিজয় ও অন্ধকার যুগকে আলোকিত করেছিল। তাই আমরাও যদি মানবপ্রেমী হই, তাহলেই সমাজ থেকে সব অশান্তি দূর করা সম্ভব হবে।

নবীপ্রেমিক নজরুল তার প্রেমের বহিঃপ্রকাশ করেছেন কবিতার ছন্দে

‘আহমদের’ ঐ মিমের পর্দা উঠিয়ে দেখ মন

আহাদ সেথায় বিরাজ করে হেরে গুণীজন।

যে চিনতে পারে রয়না ঘরে, হয় সে উদাসী

রুহানী আয়নাতে দেখরে সে নুরী রওশন।

নবীর পদ ধুলায় নিজেকে কবি ধন্য করার জন্য নিজ শরীরকে লালগালিচা বানিয়ে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন-

‘আমি যদি আরব হতাম মদিনারই পথ

এই পথে মোর চলে যেতেন নুরনবী হজরত।’

শেষে এটাই বলব, শ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো ইসলামের প্রকৃত-সৌন্দর্য, কোরআনের প্রকৃত শিক্ষা এবং বিশ্বনবীর (সা.) অনুপম আদর্শ সারা বিশ্বের মাঝে ফুটিয়ে তোলা আর নিজ জীবনে তা বাস্তবায়ন করা।

লেখক : ইসলামী গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

 

"