বিশ্লেষণ

ফিরে এসেছে রুপালি ইলিশ

মো. জিল্লুর রহমান

প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ এবং ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের ইলিশ মাছ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সাগর ও নদী দুই জায়গায়ই ইলিশের বিচরণ ক্ষেত্র। ইলিশ পছন্দ করেন না এমন বাঙালি দেশে ও বিদেশে খুঁজে পাওয়া খুব দুষ্কর। ইলিশ স্বাদে ও গুণে সত্যিই অতুলনীয়। সরষে ইলিশ দেখলে সব বাঙালির জিহ্বায় পানি চলে আসে। সরষে ইলিশ, ইলিশ পোলাও, ইলিশ দোপেয়াজা, ইলিশ পাতুরি, ইলিশ ভাজা, ভাপা ইলিশ, স্মোকড ইলিশ, ইলিশের মালাইকারী এমন নানা পদের খাবার বাংলাদেশের সব বাঙালির কাছে খুবই জনপ্রিয়।

বিগত বছরগুলোতে ইলিশ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল এবং এমন প্রেক্ষাপটে মা ইলিশ শিকারের ওপর অবরোধসহ সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের কারণে ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মাছের রাজা ইলিশ, মাছে-ভাতে বাঙালি যেন তার পুরোনো ঐতিহ্য ফিরে পেয়েছে। মাছের বাজারে গেলে চোখে পড়ে বড় বড় রুপালি ইলিশ। স্বাদ ও সাধ্য মিলিয়ে কেনা যায় পছন্দের ইলিশ এবং এ বছর দামও বেশ নাগালের মধ্যে। এ বছরের ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত জেলেদের ওপর ৬৫ দিন ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। দীর্ঘ বিরতির পর মাছ ধরা শুরু হলে জেলেদের জালে বিপুল পরিমাণে ইলিশ ধরা পড়তে শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গাতেই গত কয়েক বছরের তুলনায় কম দামে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে।

ইলিশ একটি চর্বিযুক্ত মাছ আর ইলিশে প্রচুর পরিমাণে প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড (ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড) রয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় পাওয়া গেছে, এই অ্যাসিড মানুষের কোলেস্টোরেল ও ইনসুলিনের মাত্রা কমিয়ে দিতে সাহায্য করে। এটি লবণাক্ত জলের মাছ। সাধারণত বড় নদী এবং মোহনায় সংযুক্ত খালে বর্ষাকালে পাওয়া যায়। এ সময় ইলিশ মাছ ডিম পাড়তে সমুদ্র থেকে বড় নদী এবং মোহনায় সংযুক্ত খালে আসে। ইলিশ সাধারণত চাষ করা যায় না। তবে ইদানীং চাঁদপুরের ইলিশ গবেষণা ইনস্টিটিউটে মিঠাপানির পুকুরে ইলিশের চাষ নিয়ে গবেষণা চলছে। মৎস্যবিজ্ঞানীদের মতে, ইলিশ সারা বছর সাগরে থাকে। শুধু ডিম ছাড়ার জন্য নদীতে আসে। নদী ও সাগর দুই পদের ইলিশই টর্পেডো আকারের। কিন্তু নদীর ইলিশ একটু বেঁটে ও খাটো হয়, আর সাগরের ইলিশ হয় সরু ও লম্বা। সেই সঙ্গে নদীর ইলিশ বিশেষ করে পদ্মা ও মেঘনার ইলিশ একটু বেশি উজ্জ্বল। নদীর ইলিশ বেশি চকচকে হয় এবং রং একটু বেশি রুপালি হয়। সাগরের ইলিশ তুলনামূলক কম উজ্জ্বল। এ ছাড়া নদীর ইলিশ বিশেষ করে পদ্মা-মেঘনা অববাহিকার ইলিশ মাছের আকার পটোলের মতো হয় অর্থাৎ মাথা আর লেজ হয় সরু আর পেটটা হয় মোটা।

পৃথিবীর সর্বত্র বাঙালি অধ্যুষিত এলাকার বাজারে কম বেশি বাংলাদেশ থেকে পাঠানো ইলিশ পাওয়া যায়। এসব প্রবাসী বাঙালির কাছে ইলিশের কদর অন্যরকম। তাদের বিভিন্ন উৎসব, পালা পার্বণে ইলিশের উপস্থিতি অন্যরকম মাত্রা যোগ করে এবং বাঙালিরা বিদেশিদের ইলিশ দ্বারা আপ্যায়ন করতে পারলে তারা খুব গর্ব অনুভব করেন। উত্তর আমেরিকার ইলিশ সব সময় পাওয়া যায় না বলে বাঙালি অধিবাসীরা সাদ নামের একপ্রকার মাছ ইলিশের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করে রান্না করে থাকেন। সাদ মাছকে ইলিশের বিকল্প হিসেবে ধরা হয়, কারণ এই মাছের রং ও স্বাদ ইলিশের মতো।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশের প্রাচুর্য দেখে মনে হয়েছে যেন, ইলিশের সেই সুদিন আবার ফিরে এসেছে। বিগত বছরগুলোতে যে পরিমাণ ও ওজনের একটি ইলিশ মাছের দাম যা ছিল, তা এ বছর কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্ধেকেরও কমে চলে এসেছে। তা ছাড়া দেড়-দুই কেজির ওজনের পর্যন্ত ইলিশও এ বছর বাজারে দেখা গেছে, আগে যা ছিল স্বপ্নের মতো। গত বছর গোয়ালন্দের কাছে পদ্মা নদীতে প্রায় তিন কেজি ওজনের একটি ইলিশ ধরা পড়েছে এবং দুই বছর আগেও চাঁদপুরের কাছে মেঘনা নদীতেও ঠিক একই আকারের তিন কেজি ওজনের একটি ইলিশ ধরা পড়েছিল। দাম যাই হোক, সব শ্রেণি-পেশার মানুষই তাদের স্বাদ, সংগতি ও সাধ্যের মধ্যে একেকটি ইলিশ মাছ কিনে খেতে পারছেন। অথচ বিশেষ বিশেষ দিনে বিশেষত পহেলা বৈশাখ কিংবা অন্য কোনো পূজা-পার্বণের সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণ হিসেবে এ ইলিশ সোনার চেয়ে বেশি দামি বিবেচিত হয়। একটি বড় সাইজের ইলিশের দাম পাঁচ হাজার থেকে ১৫-২০ হাজার পর্যন্ত ওঠানামা করে। তখন ইলিশের কদর সবচেয়ে বেশি এবং বিত্তশালীরা ভোজনবিলাসিতার জন্য টাকার মূল্য বিবেচনা করে না। তখন ইলিশের আভিজাত্য স্বাদ ও গুণকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। বিদেশি রাষ্ট্রীয় মেহমানদের কাছে ইলিশ শুধু স্বাদে ও গুণে অনন্য নয়, বরং তখন ইলিশ একটি ব্র্যান্ড এবং সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। আমাদের সরকারপ্রধান বিগত সময়ে ভারত সফরে গেলে উপহার হিসেবে ইলিশ নিয়ে যাওয়া হয় এবং সব গণমাধ্যম বিষয়টি খুব গুরুত্ব দিয়ে ফলাও করে প্রচার করে। তখন ইলিশ হয়ে ওঠে কূটনীতি ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে। উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার ভারতে ইলিশ রফতানি বন্ধ করে দিয়েছিল। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ সাত বছর। বাংলাদেশ সরকার ২০১৯ সালে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ৫০০ টন ইলিশ পাঠিয়েছিল। এক বছর পর ২০২০ সালে আবার বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্ত হয়ে পশ্চিম বাংলায় যাচ্ছে ১ হাজার ৪৭৫ টন ইলিশ।

ওয়ার্ল্ড ফিসের তথ্যানুযায়ী অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ইলিশের প্রায় ৮৫ ভাগ উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী ও সাগর থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টন ইলিশ আহরণ করা হয়। ইলিশ উৎপাদনের হিসেবে বরিশাল বিভাগের ভোলা জেলার স্থান সবার শীর্ষে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই জেলায় মোট ইলিশ আহরণ হয় ১ লাখ ৭০ হাজার টনের মতো। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বরগুনা। গত অর্থবছরে এই জেলা থেকে আহরিত ইলিশের মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ টন। বরগুনার প্রধান তিনটি নদী বিষখালী, বুড়িশ্বর (পায়রা) ও বলেশ্বর নদী থেকে আহরণ করা হয় ৪ হাজার ৯০০ টন এবং সাগর থেকে ৯১ হাজার টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বরগুনা জেলা থেকে আহরিত ইলিশের মোট পরিমাণ হচ্ছে ৯৫ হাজার ৯৩৮ টন। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে পটুয়াখালী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা। অন্যদিকে একই অর্থবছরে চাঁদপুর থেকে ইলিশ ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার টন। ইলিশ আহরণের হিসাবে এই জেলার অবস্থান ষষ্ঠ স্থানে।

ইলিশ অর্থনৈতিকভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রীষ্মমন্ডলীয় মাছ। বঙ্গোপসাগরের ব-দ্বীপাঞ্চল, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নদীর মোহনার হাওর থেকে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে ইলিশ ধরা হয়। এটি সামুদ্রিক মাছ, কিন্তু এই মাছ বড় নদীর মিঠাপানিতে ডিম দেয়। ডিম ফুটে গেলে ও বাচ্চা বড় হলে ইলিশ সাগরে ফিরে যায়। সাগরে ফিরে যাওয়ার পথে জেলেদের শিকারে এই মাছ ধরা পড়ে। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম মূলত দুটি সেপ্টেম্বর-অক্টোবর (ভাদ্র মাস থেকে মধ্য কার্তিক) ও জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি (মধ্য পৌষ থেকে মধ্য ফাল্গুন)। তবে দ্বিতীয় মৌসুমের তুলনায় প্রথম মৌসুমে প্রজনন হার বেশি। মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে ইলিশের গতিপথ। বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পেলে নদীতে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে ইলিশের আমদানিও বাড়ে। তাছাড়া তাদের মতে, বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে যদি এসব নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, তবে প্রতি বছরই ইলিশ এভাবেই সবার জন্য সহজলভ্য হবে। এজন্য মাঠ প্রশাসনের সুষ্ঠু তদারকির পাশাপাশি কঠোর নজরদারি করা যেমন দরকার, ঠিক একই সঙ্গে ক্রেতা-বিক্রেতা ও জেলেদের সচেতন হওয়া একান্ত জরুরি। এতে করে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ হিসেবে পরিচিত ইলিশের হারানো গৌরব ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ ফিরতে খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না।

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট

 

 

"