আরব দেশগুলোতে পণ্য বর্জন ঠেকানোর আহ্বান ফ্রান্সের

প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর মন্তব্যের জের ধরে ফরাসি পণ্য বর্জন না করতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে আহ্বান জানিয়েছে দেশটি। এর আগে ম্যাক্রোঁ হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর ব্যঙ্গচিত্র দেখানোর পক্ষে সাফাই দিয়েছিলেন। ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, উগ্র সংখ্যালঘুদের পক্ষ থেকে এই বয়কটের ‘ভিত্তিহীন’ ডাক দেওয়া হয়েছে। বিবিসি জানিয়েছে, কুয়েত, জর্ডান ও কাতারের কিছু দোকান থেকে ফরাসি পণ্য সরিয়ে ফেলা হয়েছ। এরই মধ্যে লিবিয়া, সিরিয়া ও গাজা ভূখ-ে প্রতিবাদ হয়েছে।

শ্রেণিকক্ষে হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর ব্যঙ্গচিত্র দেখানোর পর এক শিক্ষককে হত্যার ঘটনায় ম্যাক্রোঁর মন্তব্যের পর এই প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।

প্রেসিডেন্ট বলেন যে, স্যামুয়েল পাটি নামের ওই ‘শিক্ষক খুন হয়েছিলেন কারণ ইসলামপন্থিরা আমাদের ভবিষ্যৎ চায়’, কিন্তু ফ্রান্স ‘আমাদের কার্টুন ছাড়বে না’। হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর ব্যঙ্গচিত্র মুসলিমদের জন্য গুরুতর আপত্তির জায়গা হয়ে উঠার কারণ হচ্ছে, ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী হজরত মোহাম্মদ (সা.) এবং আল্লাহর প্রতিকৃতি তৈরি কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু ফ্রান্সে জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম অংশ হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা বা ‘লেইসিতে’। কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের অনুভূতির রক্ষার জন্য বাক-স্বাধীনতা কমিয়ে আনা হলে তা জাতীয় ঐক্য কমিয়ে আনবে বলে জানানো হয়। গত রোববার ম্যাক্রোঁ এক টুইটে ফরাসি মূল্যবোধের পক্ষে তিনি বলেন, ‘আমরা কখনোই এটা বিসর্জন দেব না।’

তুরস্ক এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতারা ম্যাক্রোঁর প্রতি ক্ষোভ জানিয়ে অভিযোগ তুলে বরেছেন, ম্যাক্রোঁ ‘বিশ্বাসের স্বাধীনতা’কে কদর করছেন না এবং ফ্রান্সের লাখ লাখ মুসলিমদের কোণঠাসা করছেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেন, ইসলামের প্রতি ম্যাক্রোঁর দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে তার মানসিক চিকিৎসা করানো দরকার। শনিবার একই মন্তব্যের জন্য তুরস্কে থাকা ফরাসি রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছিল দেশটি।

রোববার জর্ডান, কাতার ও কুয়েতের অনেক দোকানের তাক থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় ফরাসি পণ্য। ফ্রান্সে তৈরি হওয়া চুল এবং সৌন্দর্য পণ্য ডিসপ্লেতে রাখা হয়নি। কুয়েতে প্রধান একটি রিটেইল ইউনিয়ন ফরাসি পণ্য বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে। বেসরকারি ইউনিয়ন অব কনজ্যুমার কো-অপারেটিভ সোসাইটি বলে, হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর ব্যঙ্গচিত্র বারবার অসম্মান করার কারণে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আরব দেশগুলোতে ফরাসি পণ্য বয়কটের আহ্বান অনলাইনে প্রচারিত হচ্ছে। বিভিন্ন আরব দেশ যেমন সৌদি আরবে অনলাইনে এ ধরনের বয়কটের আহ্বান জানানো হচ্ছে।

আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ সৌদি আরবে ফরাসি সুপারমার্কেট চেইন শপ ‘ক্যাফৌ’তে বয়কট করা নিয়ে হ্যাশট্যাগ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ট্রেন্ডিং ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে। এদিকে, লিবিয়া, গাজা এবং উত্তর সিরিয়ার তুরস্ক সমর্থিত সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে ফরাসিবিরোধী ছোট ছোট বিক্ষোভও হয়েছে। এদিকে এক বিবৃতিতে ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্তের কথা স্বীকার করে লিখেছে, বয়কটের এই ডাক ভিত্তিহীন এবং অবিলম্বে বাতিল করা উচিত। সেইসঙ্গে আমাদের দেশের বিরুদ্ধে উগ্র সংখ্যালঘুদের পরিচালিত সব হামলাও বন্ধ করা উচিত।

ফ্রান্স যেভাবে এই বিতর্কে জড়ালো : পাটির হত্যার পর ইসলামের নামে উগ্রতার বিপক্ষে এবং ফরাসি ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে ম্যাক্রোঁর অবস্থান মুসলিম বিশ্বের অনেকেরই ক্ষোভের কারণ হয়েছে। এরদোয়ান এক বক্তব্যে বলেন, ইসলাম এবং মুসলিমদের নিয়ে ম্যাক্রোঁর মতো ব্যক্তিদের কী সমস্যা। এর মধ্যে পাকিস্তানের নেতা ইমরান খান ফরাসি নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন যে, তিনি কোনোকিছু না বুঝেই তিনি ইসলামকে আক্রমণ করছেন। এক টুইটে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ ইউরোপ এবং পুরো বিশ্বে থাকা মুসলিমদের অনুভূতিকে আঘাত করেছেন। চলতি মাসের শুরুর দিকে, ওই শিক্ষকের হত্যার আগেই মি. ম্যাক্রোঁ ফ্রান্সে ‘মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদীদের’ রুখতে কঠোর আইন তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। তিনি ইসলামকে ‘সংকটে’ থাকা ধর্ম উল্লেখ করে বলেন, ফ্রান্সের প্রায় ৬০ লাখ মুসলিম ‘কাউন্টার সোসাইটি’ তৈরির চিন্তা করছে। ফ্রান্সে হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর ব্যঙ্গচিত্র প্রতিকৃতি আঁকার অন্ধকার রাজনৈতিক ইতিহাস রয়েছে। ২০১৫ সালে তার কার্টুন প্রকাশের পর ফরাসি ব্যঙ্গ-পত্রিকা শার্লি এবদোর ১২ জন এক হামলায় মারা গিয়েছিল। পশ্চিম ইউরোপের মুসলিম সম্প্রদায় ম্যাক্রোঁর বিরুদ্ধে তাদের ধর্মকে দাবিয়ে রাখার অপচেষ্টা এবং তার এই প্রচারণা ইসলামোফোবিয়াকে বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে বলে অভিযোগ করেন।

 

"