এ আর চন্দন

  ০১ জানুয়ারি, ২০২১

মারি-মড়ক কেটে সুদিন ফিরুক

বিষময় একটি বছর পার করল বিশ্ব। নভেল করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ মহামারিতে যেন বিপর্যস্ত গোটা দুনিয়া। নতুন এ ভাইরাসের নামের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশসহ অনেক দেশের মানুষই পরিচিত হয়েছে নতুন আরেকটি শব্দের সঙ্গে ‘লকডাউন’। বাংলাদেশে সরাসরি লকডাউন ঘোষণা না করা হলেও সাধারণ ছুটির সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থায় যেসব কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল তা লকডাউন হিসেবেই পরিচিতি পায় সবস্তরের মানুষের কাছে। তবে কোভিড-১৯ নামের ভাইরাসটি অত্যধিক ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশকে যতটা বিপর্যস্ত করে দেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, বাস্তবে ততটা হয়নি। এ নিয়ে আছে নানা মুনির নানা মত।

গবেষকদের মতে, এ দেশে কোভিডের যে কয়টি ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে সেগুলো মিউটশের মাধ্যমে দুর্বল হওয়া। কারো কারো মতে, দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ভাইরাসজনিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকায় ক্ষতি অনেকটা কম হচ্ছে। তবে আশঙ্কা এখনো কাটেনি। দেশে দেশে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের পাশাপাশি শনাক্ত হচ্ছে ভাইরাসটির নতুন স্ট্রেইন বা রূপ, যা অধিক সংক্রমণ ক্ষমতাসম্পন্ন। এরই মধ্যে বিশ্বের ১৮ লাখের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে ভাইরাসটি। দেশেও আমরা হারিয়েছি অনেক গুণিজনকে। বিশ্বে আক্রান্ত হিসেবে এ পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছে ৮ কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষ। ইউরোপ-আমেরিকার নানা দেশ ছাপিয়ে এমন রূপ ধরা পড়েছে পাশের দেশ ভারতেও। অথচ আমাদের দেশে মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে দেখা যাচ্ছে মারাত্মক অবহেলা।

নতুন বছরের প্রাক্কালে কিছু দেশ অনুমোদন দিয়েছে কোভিডের টিকা প্রয়োগের। বাংলাদেশেও প্রস্তুতি চলছে টিকা আনার। টিকা প্রয়োগ আর স্বাস্থ্যবিধি মানার মধ্য দিয়ে আনন্দধ্বনি বাজুক প্রাণে এমনটিই প্রত্যাশা খ্রিস্টীয় নতুন বছরের কাছে।

মহামারির বিদায়ী বছরজুড়েই প্রত্যাশা ছিল টিকার। টিকা উদ্ভাবনের কার্যক্রম শুরু হয় বিশ্বের উন্নত কয়েকটি দেশে। পিছিয়ে থাকেনি বাংলাদেশও। দেশি কোম্পানি গ্লোব বায়োটেক টিকা উদ্ভাবন করার ঘোষণা দেয়। এতে কোভিড-১৯ টিকা উদ্ভাবনকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হয় বাংলাদেশের নামও। তবে বছর শেষে টিকাটির মানবদেহে পরীক্ষা শুরু করা সম্ভব হয়নি।

নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ দৈনন্দিন কাজে ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয় অনলাইন মাধ্যমের। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসেও যেখানে দেশে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ১ হাজার জিবিপিএসের কম, সেখানে মে-জুন মাসেই তা ১ হাজার ৫০০ জিবিপিএসে পৌঁছে যায়। ডিসেম্বরে এসে এই ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ১০০ জিবিপিএস। ‘লকডাউনে’ নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ই-কমার্স। স্মার্টফোন, ল্যাপটপের মতো ডিভাইসের বিক্রিও বেড়ে যায়। ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে মানুষ।

বিদায়ী বছরে মহামারির মধ্যেও দেশবাসীর কাছে বিশাল প্রাপ্তি হিসেবে আসে পদ্মা সেতুর সর্বশেষ স্প্যান বসানোর সুসংবাদ। এর মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ৬ হাজার ১৫০ মিটারের পুরো সেতু। নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এ সেতু দেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করে তুলেছে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও। আগামী বছরের জুনে এ সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে প্রত্যাশা কর্তৃপক্ষের। মহামারির মধ্যেও বিদায়ী বছরের শেষ দিকে গতি ফিরে আসে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কাজে। দেশে স্বাভাবিক ছিল রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় প্রবাহ।

বিদায়ী বছরে উদ্যাপিত হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ। মহামারির মধ্যেও নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বঙ্গবন্ধুকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয়েছে। মহামারির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে। নতুন বছরে প্রত্যাশা শিগগির দ্বার খুলবে শিক্ষালয়ের। স্কুলের পড়াশোনায় শিশুরা ফিরে পাবে জীবনের পূর্ণ মাত্রা।

নভেল করোনাভাইরাস শুধু কোটি মানুষের প্রাণই সংহার করেনি, শুরু থেকেই চেষ্টা করেছে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পরস্পর থেকে। তবে পুরোপুরি সফল হয়নি সে। আর্তপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে মানুষ। কোভিডের কারণে মৃত মানুষের লাশ দাফনের মধ্য দিয়ে মানবিক দিক বেরিয়ে এসেছে পুলিশ বাহিনীরও। বিভিন্ন জায়গায় পড়ে থাকা লাশ দাফন কিংবা দাহ করেছেন পুলিশ সদস্যরা। পুলিশ বাহিনীর এই মানবিক বোধ আরো প্রসারিত হোক এমনটিই প্রত্যাশা।

২০১৯ সালে গুজব ছড়ানো হয়েছিল ভয়াবহভাবে। ছেলে ধরার গুজব, পদ্মা সেতু নিয়ে গুজব, লবণের দাম বাড়া নিয়ে গুজব। রেনু নামের এক তরুণী মাকে নির্মমভাবে মেরে ফেলা হলো। শোকে স্তব্ধ হলো গোটা দেশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক সংঘাত বাঁধানোর চেষ্টা ছিল ব্যাপক। এর প্রতিবাদে উত্তাল হলো দেশ। তরুণরা প্রতিবাদী হওয়ায় দ্রুত ব্যবস্থা নিল প্রশাসনও। বিদায়ী বছরেও এমন অপচেষ্টা আবার চালানো হলো এবং যথারীতি দেশবাসীর প্রতিবাদ আর প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তা বন্ধ হলো। তাই বলে থেমে যায়নি ধর্ম ব্যবসায়ীরা। বিদায়ী বছরের শেষ দিকে হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকসহ কয়েকজন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে এবং ভাঙার ঘোষণা দিয়ে চরম ঔদ্ধত্য দেখালে দেশজুড়ে ক্ষোভ দেখা দেয়। উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠনগুলোর উদ্দেশ্যমূলক তৎপরতার বিষয়টি তখন আবারও সামনে আসে। এরই মধ্যে কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙে মাদ্রাসার কয়েক শিক্ষক ও ছাত্র। দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদের মধ্যেই কুষ্টিয়ায় ফের ব্রিটিশ উপনিবেশবিরোধী বিপ্লবী বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ভাঙা হয়। এসব ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অঙ্গন।

মহামারির কারণে রাজনীতি গন্ডিবদ্ধ হয়ে পড়ে ভার্চুয়াল মাধ্যমে। বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা সক্রিয় ছিলেন অনলাইন ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

২০২১ সাল বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর। ২০২০ সালের শেষ দিকে এসে জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘মুজিববর্ষ’ উদ্যাপনের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। নতুন বছরে প্রত্যাশা টিকা আসার ফলে মহামারির প্রকোপ কমবে, রক্ষা পাবে মানবসভ্যতা, সুপ্রতিষ্ঠিত হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

পিডিএসও/হেলাল

সুদিন,করোনাভাইরাস,২০২১
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়