বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাস ও ত্যাগের রাজনীতি

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২০, ০৮:৩০

নিতাই চন্দ্র রায়

একটি চুম্বকখণ্ড হাজার পিনকে আকর্ষণ করতে পারে। কাছে টেনে নিতে পারে। স্থান দিতে পারে বুকের ভেতর। রুপা, তামা, দস্তা এমনকি সোনারও সেই ক্ষমতা নেই। চুম্বকের ভেতর থাকে আকর্ষণের উষ্ণ আগুন। লোহাকে কাছে টানার অসীম শক্তি। সেই শক্তির জন্য দরকার মনের ভেতর মহৎ গুণের। দেশ, মাটি ও মানুষকে ভালোবাসার প্রবল ইচ্ছাশক্তি। বালক শেখ মুজিবের ভেতর সেই শক্তি ছিল। দরিদ্র্য সহপাঠীদের প্রতি তার ছিল অসীম মমত্ববোধ ও গভীর ভালোবাসা। নিজের জামা, বইখাতা, গায়ের চাদর তিনি তার গরিব সহপাঠীদের দান করে হাসিমুখে বাড়ি ফিরতেন। অভাবের সময় বাড়ির চালের গোলা থেকে গরিব মানুষের মধ্যে চাল বিলিয়ে দিতেন। বাবা শেখ লুৎফর রহমান তার ছেলের এসব গুণাবলি দেখে অন্তরে আনন্দ পেতেন। মা সায়েরা খাতুন ছেলের মহানুভবতা, মানবপ্রেম ও পরোপকারের এসব গুণাবলি দেখে হয়তো অজান্তে ভাবতেন তার ছেলে আর ১০টি সাধারণ ছেলের মতো নয়। তার মধ্যে নেতৃত্বের সুপ্ত অঙ্কুর লোকায়িত আছে। এক দিন এই অঙ্কুর বীজের প্রাচীর ভেঙে বেরিয়ে আসবে। বাংলার মাটি জলে আলো বাতাসে বড় হবে। সবুজ পাতা ও ডালপালা ছড়াবে। পোকামাকড়, রোগবালই এবং প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে মহিরুহে পরিণত হবে। মানুষকে ছায়া দেবে। ভালোবাসা দেবে। ভরসা দেবে। ফুল দেবে। ফল দেবে। পাখিদের আশ্রয় দেবে। খাবার জোগাবে। দেবে স্বাধীনতা।

ছোট সময়ে খোকা নামের ছেলেটি খুব দুষ্ট প্রকৃতির ছিল। খেলাধুলা করত। গান গাইত। খুব ভালো ব্রতচারী করতে পারত। ১৯৩৬ সালে গ্লুকোমা রোগের জন্য চক্ষু অপারেশনের পর মাদারীপুরে ফিরে আসেন শেখ মুজিব। কাজ নেই। লেখাপড়া নেই। খেলাধুলা নেই। শুধু একটি কাজ; বিকালে সভায় যাওয়া। তখন স্বদেশি আন্দোলনের যুগ। মাদারীপুর-গোপালগঞ্জের ঘরে ঘরে স্বদেশি আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ। মাদারীপুরের সুভাস বসুর দলই ছিল শক্তিশালী। ১৫-১৬ বছর বয়সের ছেলেদের স্বদেশিরা দলে ভেড়াত। সশস্ত্র সংগ্রমে উদ্বুদ্ধ করত। যুবক মুজিবকে নিয়মিত সভায় উপস্থিত থাকতে দেখে তার ওপর কিছু যুবকের নজর পড়ে।

ইংরেজ বেনিয়াদের প্রতি কিশোর মুজিবের মনেও বিরূপ ধারণা ছিল। ঘৃণা ছিল। ক্ষোভ ছিল। ওরা ব্যবসা করতে এসে ভারতের মসনদ কেড়ে নেয়। কৃষকদের দিয়ে জোর করে নীল চাষ করায়। নির্যাতন করে। জমিদারি প্রথা চালু করে। মনে মনে ভাবতেন, ইংরেজদের এ দেশে থাকার কোনো অধিকার নেই। স্বাধীনতা আনতে হবে। এ ভাবনা থেকে সুভাষ বাবুর ভক্ত হয়ে গেলেন এবং সভায় যোগদান করতে মাঝেমধ্যে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ছুটে যেতেন। গভীর মনোযোগসহকারে শুনতেন স্বদেশি নেতাদের জ্বালাময়ী ভাষণ। স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার দীপ্ত আহ্বান। ইংরেজ তাড়ানোর অগ্নিমন্ত্র। শুনতেন সেই মহাকাব্যের মানব মুক্তির অমর বাণী—‘আমাকে রক্ত দাও আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব’। তখন থেকেই স্বাধীনতার সুপ্ত আকাঙ্ক্ষার বীজ অঙ্কুরিত হতে থাকে শেখ মুজিবের উর্বর মনের মাটিতে। বাড়িতে তার পিতা বেশকটি বাংলা পত্রিকা রাখতেন। ছোটকাল থেকেই তিনি ওইসব পত্রিকা পড়তেন। ফলে শৈশব থেকেই দেশ, মাটি ও মানুষের প্রতি তার নিঘাদ ভালোবাসার উন্মেষ ঘটে। দেশপ্রেমের অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত হতে থাকে হৃদয়ের গোপন গুহায়। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনে নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসুর অসীম সাহস, দেশপ্রেম, প্রজ্ঞা, দৃঢ়তা, রণকৌশল, ইংরেজ তাড়ানোর অদম্য ইচ্ছা, দেশের জন্য হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার শক্তি, জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার বাগ্মিতা দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য জেলখাটা, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করা, ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের তুচ্ছ জ্ঞান করার অনুপ্রেরণাও আমার মনে হয় তিনি সুভাষ বসুর মতো নেতাদের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন।

১৯৩৭ সালে বালক মুজিব গ্লুকোমা রোগ থেকে আরোগ্য লাভের পর আবার গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে লেখাপাড়া শুরু করেন। এ সময় কাজী আবদুল হামিদ এমএসসিকে তার গৃহশিক্ষক হিসেবে রাখা হয়। আবদুল হামিদ ছিলেন মহান হৃদয়ের অধিকারী। গরিব-দুঃখী ছাত্রদের জন্য তার দয়ার অন্ত ছিল না। মাস্টার সাহেব ‘মুসলিম সেবা সমিতি’ নামে একটি সংগঠন করে গরিব ছাত্রদের সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। মুষ্টি ভিক্ষার চাল ওঠাতেন সব মুসলমানের বাড়ি থেকে। প্রতি রোববার বালক মুজিব থলি নিয়ে অন্য বালকদের সঙ্গে বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাল সংগ্রহ করতেন। সেই চাল বিক্রি করে মাস্টার সাহেব গরিব ছাত্রদের বই, পরীক্ষার ফিস ও অন্যান্য খরচের ব্যবস্থা করতেন। বাড়ি বাড়ি ঘুরে ছাত্রদের জন্য জায়গীরের ব্যবস্থাও করে দিতেন তিনি। এসব কাজে বালক মুজিবকে অনেক সময় দিতে হতো। হঠাৎ যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে এক দিন শেখ মুজিবের প্রিয় শিক্ষক আবদুল হামিদ স্যার মারা গেলেন। কিশোর মুজিব খুব দুঃখ পেলেন। তখন সেই মুসলিম সেবা সমিতি পরিচালনার দায়িত্ব পড়ে কিশোর মুজিবের ওপর। অনেক দিন তিনি সেই সেবা সমিতি পরিচালনা করেন। অন্য একজন মুসলিম মাস্টারের কাছেই সমতির টাকা-পয়সা জমা থাকত। সেই শিক্ষক সভাপতি ছিলেন। আর অল্প বয়সি মুজিব ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। কোনো মুসলমান চাল না দিলে মুজিব দলবল নিয়ে তার ওপর জোর খাটাতেন। এজন্য বাবার কাছে অনেক সময় শাস্তি পেতে হতো। তার আব্বাও তাকে এসব কাজে বাধা দিতেন না। এ থেকেই বোঝা যায় গরিবের প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল শৈশব থেকেই। তাদের সেবা করার মানসিকতা এবং নেতৃত্বের বিকাশও ঘটেছিল তখন থেকে ধীরে ধীরে। নিঃস্বার্থভাবে সমাজের জন্য কাজ করার মানসিকতা তখন থেকেই তার মধ্যে বাসা বাঁধতে শুরু করে। এই বাসা তৈরির কারিগর ছিলেন তার প্রিয় শিক্ষক কাজী আবদুল হামিদ। মহৎ, উদার মনের মানুষের সান্নিধ্য ছাড়া জীবনে বড় হওয়া যায় না। দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা যায় না। ত্যাগ স্বীকার করা যায় না। বঙ্গবন্ধু এটা বিশ্বাস করতেন প্রবলভাবে। তাই তিনি বলেন, ‘যেকোনো মহৎ কাজ করতে হলে ত্যাগ ও সাধনার প্রয়োজন। যারা ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয়, তারা জীবনে কোনো ভালো কাজ করতে পারেন নাই—এ বিশ্বাস আমার ছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, এ দেশে রাজনীতি করতে হলে ত্যাগের প্রয়োজন আছে এবং ত্যাগ আমাদের করতে হবে।’ এসব কথা কি বর্তমান সময়ের রাজনীতিবিদগণ বিশ্বাস করেন? যদি বিশ্বাস করতেন তা হলে ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ এবং যুবলীগে আগাছা ও পরগাছার এত উইপোকার সৃষ্টি হতো না। ব্যবসায়ীরা ভিড় জমাতেন না রাজনীতিতে। রাজনীতি করতেন উদার নীতিবান, সৎ ও নির্ভীক আদর্শবান পরোপকারী মানুষ। সমাজসেবকরা। আন্দোলনের মাঠের লড়াকু সৈনিকরা। রাজনীতি করতেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক গুণী নির্লোভ লোকেরা।

বর্তমান নেতারা কি জানেন, অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কলকাতায় নিজের কোনো বাড়ি ছিল না। ৪০ নম্বর থিয়েটার রোডের বাড়িটি ছিল ভাড়া করা বাড়ি। তিনি করাচিতে তার ভাইয়ের বাসায় উঠেছিলেন। কারণ তার খাবার পয়সাও ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী মরহুম তাজউদ্দীন আহমদের একটি সার্ট ছিল। সার্টটি ময়লা হলে রাতে নিজ হাতে ধুয়ে পরিষ্কার করে শুকিয়ে সেই সার্টটি পরেই সকালে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে যেতেন। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার শহীদুল্লা সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও মরহুম রফিক উদ্দিন ভূঞার সঙ্গে রাজনীতি করতেন। জাতির জনকের সঙ্গেও ছিল তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ৫২-এর ভাষাসৈনিক ও ৭১ সালের বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তাগাছা পৌরসভার মেয়র, জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন এই ত্যাগী ও আদর্শবান নির্লোভ নেতা। বিশ্বাস করা যায় অর্থের অভাবে তার সুচিকিৎসা হচ্ছে না। তার কোনো পাকাবাড়ি নেই। অট্টালিকা নেই। নেই ব্যাংক ব্যালান্স।

ভারত বিভক্তির আগে ইংরেজ সরকারের সঙ্গে আলোচনার জন্য মহাত্মা গান্ধী ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন। জিন্নাহ সাহেবের পরনে ছিল প্যান্ট-কোট ও টাই আর গান্ধিজীর পরনে ছিল এক খণ্ড দেশীয় তাঁতে বোনা মোটা ধুতি। ইংরেজ নেতারা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে সম্মোধন করে বলেছিলেন, হি ইজ আওয়ার লিডার অ্যান্ড গান্ধী ইজ দি লিডার অব ইন্ডিয়া। লিডার অব পুওর পিপুল অব সাব কন্টিনেন্ট। এটার মধ্যেই ছিল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও মহাত্মা গান্ধীর মধ্যকার পর্বত সমান পার্থক্য। রাজনীতি, সমাজনীতি, জীবনাচার এবং নীতি-আদর্শ ও মূল্যবোধের ব্যবধান। বঙ্গবন্ধু মহাত্মা গান্ধীর মতো সহজ-সরল জীবনযাপন করতেন। সাধারণ পোশাক পরতেন। তার মধ্যে উচ্চ ও মননশীল চিন্তা ছিল দৃশ্যমান। বাঙালি ও বাঙালির ভাবনা ছিল দীপ্তমান। তাই তিনি জাতিসংঘে গিয়ে বাংলাতে ভাষণ দিয়ে বাঙালি জাতির গৌবর তুলে ধরে ছিলেন বিদেশিদের কাছে। এখানেই অন্য নেতাদের সঙ্গে শেখ মুজিবের পার্থক্য। চিন্তাচেতনার ভিন্ন বহিঃপ্রকাশ।

শেখ মুজিব সাম্প্রদায়িকতাকে ঘৃণা করতেন প্রচণ্ডভাবে। তার কাছে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান বুদ্ধের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। তিনি বলতেন, এই দেশ হিন্দুর না, মুসলমানের না। দেশকে যে নিজের ভাববে, এ দেশ তার। দেশের কল্যাণে খুশিতে যার মন ভরে উঠবে, এই দেশ তার। দেশের দুঃখে যে কাঁদবে, এ দেশ তার। এই দেশ তাদের যারা এ দেশের স্বাধীনতায় সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছে এবং এবং ভবিষ্যতেও দেবে।

লেখক : কৃষিবিদ ও কলামিস্ট
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল