যশোর শিশু উন্নয়নকেন্দ্র

৩ কিশোরকে হত্যা : গ্রেফতার ৫ আসামি রিমান্ডে

তত্ত্বাবধায়ক বরখাস্ত, তদন্ত কমিটি গঠন

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২০, ২১:২৩

এইচ আর তুহিন, যশোর

যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তিন কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা ও ১৫ জনকে নির্মম নির্যাতনের সত্যতা পেয়েছে পুলিশ। ওই কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক আবদুল্লাহ আল মাসুদসহ ১৯ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পুলিশ লাইনের ব্যারাকে নিয়ে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদের পর প্রাথমিকভাবে তাদের অনেকের বিরুদ্ধে জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এদিকে যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক (সহকারী পরিচালক) আবদুল্লাহ আল মাসুদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে গত শুক্রবার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ জয়নুল বারী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।এছাড়া এ ঘটনায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদফতর আলাদা দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

শনিবার দুপুরে যশোরের পুলিশ সুপার আশরাফ হোসেন সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কেন্দ্রের কয়েকজনকে হেফাজতে নিয়ে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের পর পাঁচজনকে শুক্রবার রাতে গ্রেফতার করা হয়। এরা হলেন কেন্দের তত্ত্বাবধায়ক আবদুল্লাহ আল মাসুদ, সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ, সাইকোসোশ্যাল কাউন্সিলর (প্রবেশন অফিসার) মুশফিকুর রহমান, শরীর চর্চা শিক্ষক ওমর ফারুক ও কারিগরি শিক্ষক শাহানুর আলম। 

সন্ধ্যায় আদালতে হাজির করে তাদের প্রত্যেককে ১০ দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানায় পুলিশ। এদের মধ্যে শেষের তিনজনকে ৫ দিন করে এবং প্রথম দুজনকে তিনদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। 

তিনি আরো জানান, ১৩ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে ১৮ জনকে ডেকে নেওয়া হয় সহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল মাসুদের কক্ষে। সেখান থেকে এক একজন করে ডেকে অপর একটি কক্ষে নিয়ে নির্দয়ভাবে পেটানো হয়। কক্ষের জানালার গ্রিল দিয়ে হাত ও পা বের করিয়ে বাইরে থেকে টেনে ধরে লোহার রড ও লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে পেটানো হয়। জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাদের মাঠে, ঘরে ও বারান্দায় রাখা হয়। জ্ঞান ফিরে আসলে আবারো পেটানো হয়। এক্ষেত্রে অভিযুক্তরা সহায়তা নেন কিশোর বন্দিদের কয়েকজনের। কর্মকর্তারা চিকিৎসকও আনেননি। পরে যখন একজন মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে তখন সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর পুলিশ ও প্রশাসন জানতে পারে।

এদিকে তদন্ত সূত্র জানায়, গত ৩ জুলাই বন্দি কয়েকজন কিশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রধান নিরাপত্তা কর্মীর ওপর হামলা করে তার একটি হাত ভেঙে দেয়। এর আগে ওই নিরাপত্তা কর্মী বন্দি কিশোরদের একজনকে তার মাথার চুল কেটে দিতে বলেন। তাতে রাজি না হওয়ায় গালাগাল করেন তিনি। তখন হামলা করে তারা। নিরাপত্তা কর্মীর ওপর হামলার এ ঘটনায় দায়ী ১৮ জনকে সিসি ক্যামেরার ভিডিওচিত্র থেকে শনাক্ত করে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ।

সূত্র আরো জানায়, ঘটনার দিন মৃত্যু শুরু হলে কেন্দ্রের কর্মকর্তারা কিশোরদের দুই পক্ষের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রচার করে। পুলিশকেও তারা প্রথমে এ কথা জানায়। কিন্তু জেলা প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে রাত পর্যন্ত করে সেখানে অবস্থান করে বুঝতে পারেন মিথ্যা বলছেন শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মকর্তারা। ওই রাতেই ১০ জনকে কেন্দ্র পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

এদিকে শুক্রবার রাতে নিহত পারভেজ হাসানের বাবা রোকা মিয়া যশোর কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় তিনি অজ্ঞাত কর্মকর্তাদের অভিযুক্ত করেন। এ মামলায় পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা যশোরের চাঁচড়া ফাঁড়ি ইনচার্জ ইন্সপেক্টর রোকিবুজ্জামান।

যশোর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি সোমেন দাশ বলেন, তারা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী হওয়ায় খুবই সতর্কতার সঙ্গে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একাধিকজনকে মুখোমুখি ও জিজ্ঞাসা-পুনঃজিজ্ঞাসা করা হয়েছে। এরপর নিশ্চিত হওয়া গেছে তাদের সম্পৃক্ততা নিয়ে। তত্ত্বাবধায়ক বরখাস্ত, দুটি তদন্ত কমিটি গঠন : যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক (সহকারী পরিচালক) আবদুল্লাহ আল মাসুদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। কেন্দ্রের তিন বন্দি নিহত ও ১৫ জন আহতের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শুক্রবার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ জয়নুল বারী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অপরদিকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মাহমুদা ইয়াসমিন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে জানানো হয়েছে, তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে। এছাড়া সদস্য সচিব সমাজসেবা অধিদফতর যশোরের উপপরিচালক ও সদস্য জেলা পুলিশ সুপারের একজন প্রতিনিধি (যিনি এএসপি পদমর্যাদার নিচে নন)। কমিটিকে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।  

এর আগে সমাজসেবা অধিদফতর দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিজ্ঞপ্তি জারি করে। ওই কমিটির প্রধান করা হয় সমাজসেবা অধিদফতরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) সৈয়দ মোহাম্মদ নুরুল বসিরকে। তার সঙ্গে তদন্তকাজে সহায়তা করবেন উপপরিচালক (প্রতিষ্ঠান-২) এস এম মাহমুদুল্লাহ। আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে এ কমিটিকে মহাপরিচালকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে বন্দিদের ওপর ‘কর্তৃপক্ষের’ হামলায় তিন কিশোর নিহতের ঘটনায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদফতর থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে এক কমিটিতে যার বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অপর কমিটিতে খোদ তাকেই সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে বন্দিদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে তিন কিশোর নিহত হয়। আহত হয় আরো অন্তত ১৫ জন। এই ঘটনায় শুক্রবার ভোরে কেন্দ্রটির তত্ত্বাবধায়ক আবদুল্লাহ আল মাসুদ, সহ-তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ, প্রবেশন অফিসার মুশফিকুর রহমান, শারীরিক প্রশিক্ষক শাহনুর রহমানসহ ১০ জনকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে মন্ত্রণালয় থেকে তত্ত্বাবধায়ক আবদুল্লাহ আল মাসুদকে সামায়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় নিহত কিশোরের বাবা ‘কর্তৃপক্ষের’ বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

এদিকে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করতে শুক্রবার দুপুরের পর সমাজসেবা অধিদফতর থেকে দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা হলেন সমাজসেবা অধিদফতরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) সৈয়দ মোহাম্মদ নুরুল বসির ও উপপরিচালক (প্রতিষ্ঠান-২) এস এম মাহমুদুল্লাহ। তদন্ত কমিটিকে পাঁচ দফা কর্মপরিধি ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। ওই পাঁচ দফার ৫ নম্বরে বলা হয়েছে, ‘উপপরিচালক, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়, যশোর এর কোনোরূপ ব্যর্থতা ছিল কিনা তাও যাচাই করতে হবে।’ কিন্তু বিকালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে গঠিত কমিটিতে সেই জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালককে সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তিন সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে। আর সদস্য করা হয়েছে জেলা পুলিশ সুপারের একজন প্রতিনিধি। কমিটিকে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।

এ ব্যাপারে যশোর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক অসিত কুমার সাহা বলেন, ‘অধিদফতর থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে আমি শুনেছি। তবে আমার বিরুদ্ধে যদি কোনো কিছু তদন্তের বিষয় থাকে তাহলে কমিটি সেটা দেখবে। এর বেশি আমি এখন আর কিছু বলতে চাই না।’

পিডিএসও/এসএম শামীম