শরতের গল্প

স্বপ্ন

প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৬:০৫

সুফিয়ান আহমদ চৌধুরী

শরতের সকাল। সেই রাত থেকে বৃষ্টি ঝরছে। সরল চাষি মজনু মিয়ার চোখে ঘুম নেই। হিসাব করছে জীবনের। সেই মুক্তিযুদ্ধের মাসে জন্ম তার। দেখতে দেখতে অনেকটা বছর পেরিয়ে এসেছে। কয় মাস ধরে মন ভালো নেই। দেশে করোনার অসুখে বেহাল অবস্থা। গাঁয়ের অনেক প্রিয়মুখ হারিয়েছে। পাশে বউ নাক ডেকে ঘুমে।

সকালে কাক ডাকছে কা কা রবে। ঘরের মেঝেতে আলোর ফুলঝুড়ি। বিছানা ছাড়ে সে। বাইরে পা রাখে। বৃষ্টি থেমেছে। চারদিকে পানি জমে আছে। পুকুরে গিয়ে গোসল করে। ঘরে ফিরে পান্তা মুখে দেয়। গামছাটা কাঁধে নেয়। হাতে নেয় ছাতা। পা বাড়ায় মাঠের দিকে। মাঠে গিয়ে কাজ করে। মাঝে মাঝে আলের পাশে বসে বিড়ি টানে। সুখ টান দেয় জোরে। আজ কদিন ধরে মন ভালো নেই। বুকটা যেন খালি খালি লাগে। কাবাডি খেলার বন্ধু আরশ আলী সেদিন মারা গেল করোনায়। পাশের বাড়ির জয়গুন বিবিও মারা গেছে করোনায়। জয়গুন বিবি তার বউয়ের লগে পিরিত ছিল বেশি। মাঝে মাঝে কচুর ও লতার শুঁটকি, নানা রকমের ভর্তা দিয়ে যেত। যা খেতে খুব টেস্ট পেত মজনু মিয়া। মজনু নিজেও মাছ শিকার করত। বউ রান্না করলে জয়গুনকে দিয়ে আসত। গেরাম যেন বিরান করছে করোনা।

মজনু মিয়া আকাশের দিকে অবাক নয়নে চায়। সাদা সাদা মেঘ উড়ছে। পাখির দল ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে। সে গান ধরে লালন ফকিরের গান। বাড়ির আঙিনায় আসতে শুনে বউয়ের কাশির শব্দ। ঘরে ঢুকে দেখে, বউ কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। হাত দিয়ে দেখে শরীর গরম। দৌড়ে যায় গাঁয়ের ডাক্তার রহমানের বাড়িতে। বাজারের ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিয়ে আসে। নিজ হাতে বউয়ের মুখে তুলে দেয়। বউয়ের অসুখ কমে না। চার দিন পর বউ মারা যায়। হাউমাউ করে কাঁদে মজনু। সে কান্না যেন থামতে চায় না।

গাঁয়ের গোরস্থানে দাফন করে বউকে। রাতে ঘুম আসে না চোখে। বউয়ের ছবি ভেসে ওঠে। কিশোরী মেয়ে কুলসুমকে বিয়ে করে আনে ঘরে। রূপে ছিল রাজকন্যা। সে ডাকত লালপরী। রঙে-ঢঙে জীবনের দিন কাটে। কোনো সন্তান আসেনি পরিবারে। মনে ছিল আহাজারি। তারপরও দুজন মিলে হাসি-খুশি, দুঃখ-কষ্টকে জয় করে। সেই প্রিয় বউটি চলে গেল। একা হয়ে গেল মজনু মিয়া। ভাবনার সাগরে হাবুডুবু খায়। বউয়ের সঙ্গে জীবনের দিনগুলো বারবার মনে পড়ে। বউয়ের মায়ার কথাগুলো মনে নাড়া দেয়। শরৎ এলে শিরনি করত ঘরে। সামনে হেমন্ত ধান উঠবে ঘরে। স্বপ্ন বুনত সুখে।

পিডিএসও/হেলাল