তিন ‘চৌকি আদালত’ পরিচালনায় এক বিচারক

তিন উপজেলায় মামলার জট ৬ হাজার

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০

রাকিবুল ইসলাম রাকিব, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ)

বিচারক সংকটের কারণে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ অবস্থিত ‘চৌকি আদালতে’ প্রায় ৬ হাজার মামলার জট সৃষ্টি হয়েছে। জেলার গৌরীপুর, ঈশ্বরগঞ্জ ও নান্দাইল উপজেলার যাবতীয় দেওয়ানি মোকদ্দমার কাজ ঈশ্বরগঞ্জ চৌকি আদালতে সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু দেড় বছর ধরে গৌরীপুর ও নান্দাইল সহকারী জজ আদালতে বিচারক না থাকায় ঈশ^রগঞ্জ সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের বিচারক অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ওই দুটি আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। একজন বিচারক তিনটি আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করার কারণে আদালতে মামলার নিষ্পত্তি সংখ্যা কমে গেছে, পাশাপাশি বিচার প্রার্থীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তের পাশাপাশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ২০১২ সালে তৎকালীন আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম সিনিয়র সহকারী জজ আদালতটিকে যুগ্ম জেলা জজ আদালতে উন্নীত করার ঘোষণা দিলেও তা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

স্থানীয় বার অ্যাসোসিয়েশনের কয়েকজন আইনজীবী জানান, বদলি ও পদোন্নতির কারণে গৌরীপুর ও নান্দাইল আদালতে বিচারকের পদ শূন্য রয়েছে। দুটি আদালতে বিচারক না থাকায় মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে ভুক্তভোগীরা বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ হতাশায় ভোগেন। এতে আমরা আইনজীবীরাও অসহায় বোধ করছি।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ব্রিটিশ সরকার ১৮৮০ সালের দিকে ভূমি আইন সংশোধন করে প্রজাদের জমির মালিকানা দেয় এবং খাজনা আদায়ের বিধান প্রবর্তন করে। তখন খাজনা আদায়-সংক্রান্ত মামলার বিচারের জন্য প্রত্যন্ত এলাকায় চৌকি আদালত নামে এক ধরনের অঞ্চলভিত্তিক আদালত স্থাপন করে ব্রিটিশ সরকার।

এরপর সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে উপজেলা পর্যায়ে আদালত স্থাপন করা হয়। পরবর্তীকালে ১৯৯১ সালে আবারও বিচার ব্যবস্থাকে উপজেলা থেকে জেলা সদরে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু ব্রিটিশ আমল ছাড়াও পরবর্তীকালে যেসব উপজেলা থেকে জেলা শহরে যোগাযোগব্যবস্থা কষ্টসাধ্য সেসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থাপিত আদালতগুলো রেখে দেওয়া হয়। এসব আদালত আজও ‘চৌকি আদালত’ নামেই পরিচিত। বর্তমানে ঈশ্বরগঞ্জ, গৌরীপুর ও নান্দাইল উপজেলার দেওয়ানি মামলার কার্যক্রম চালু রয়েছে ঈশ্বরগঞ্জের অবস্থিত চৌকি আদালতে।

ঈশ^রগঞ্জ বার অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, তিনটি আদালতে মামলার পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার। এ আদালতে জমি-সংক্রান্ত, পারিবারিক মামলা, অভিভাবক-সংক্রান্ত মামলা, অধিকার আদায়-সংক্রান্ত মামলা, টাকা আদায়ের মামলার বিচার কার্যক্রম চালু রয়েছে। তিনটি উপজেলার প্রায় ৬ হাজার মামলা মাত্র একজন বিচারকের পক্ষে পরিচালনা করা প্রায় দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এতে আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার পরিমাণ কমে গেছে। মামলাজট বাড়তে থাকায় বিচারপ্রার্থী মানুষ পড়েছেন দুর্ভোগে। এই অবস্থায় দ্রুত আদালতে বিচারক নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় আইনজীবীরা জানান, ২০১২ সালে তৎকালীন আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ঘোষণা দেন ঈশ্বরগঞ্জে অবস্থিত সিনিয়র সহকারী জজ আদালতটিকে যুগ্ম জেলা জজ আদালতে উন্নীত করার। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতার কারণে সেই ঘোষণা আলোর মুখ দেখেনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিচারপ্রার্থী প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, জমি-সংক্রান্ত একটি মামলা বিচারাধীন। মামলার নির্ধারিত তারিখে আদালতেও আসছেন। কিন্তু বিচারক সংকটের কারণে মামলাটি নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এতে তিনি আর্থিক ও মানসিক দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

ঈশ্বরগঞ্জ বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আইনজীবী মো. আবদুল মালেক বলেন, তিনটি আদালতে প্রায় ৬ হাজার মামলা রয়েছে। কিন্তু গৌরীপুর ও নান্দাইল আদালতে বিচারক না থাকায় মামলাগুলো পরিচালনা করতে একজন বিচারক হিমশিম খাচ্ছেন। আমরা দুটি আদালতে বিচারক দেওয়ার জন্য জেলা জজের সাথে কথা বলেছি। কিন্তু নারী বিচারক এখানে আসতে না চাওয়ায় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে মামলাজট নিরসন করার জন্য দ্রুত পুরুষ বিচারক নিয়োগ দেবেন।

"