বিএনপি এখনই আন্দোলনে যেতে চায়

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:৩১

বদরুল আলম মজুমদার

বিএনপি আশা করেছিল অল্প সময়ের মধ্যে জাতীয় ঐক্য গঠন প্রক্রিয়া একটি কার্যকর রূপ লাভ করবে। সে জন্য দলটির নেতারা দৌড়ঝাঁপও কম করেননি। বর্তমান সময়ে এই প্রক্রিয়া অনেকটা দৃশ্যমান হলেও তাতে বিএনপির অংশগ্রহণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। বিএনপির সঙ্গে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের নানা বোঝাপড়ার কারণে এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না কবে হবে সেই কাঙ্ক্ষিত জাতীয় ঐক্য।

অন্যদিকে, ঐক্যের নেতারা এমন কিছু প্রস্তাব নিয়ে বিএনপির সঙ্গে বসতে চায়, বিএনপির পক্ষে তা কতটুকু মানা সম্ভব এ নিয়ে সংশয় আছে দলে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন ও ২১ আগস্ট মামলার রায় ঘোষণার কথা রয়েছে চলতি মাসে। তাই ঐক্য প্রক্রিয়ার আশায় আর বসে থাকলে বিএনপির দাবি অধরাই থেকে যেতে পারে বলে মনে করছেন অনেক নেতা। অস্তিত্বের প্রশ্নে দুইটি বড় ইস্যু নিয়ে এখনই মাঠে নামতে চায় দলটি। দলের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান ২০ দলীয় জোটকে অটুট রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এ অবস্থায় ঐক্য হলে ভালো, আবার না হলেও বিএনপির করণীয় নিয়েই সামনে এগোনোর যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে দলটি। নির্দেশনার অংশ হিসেবে চলতি মাসের শুরুতেই খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। তাছাড়া জেলখানায় আদালত বসানো নিয়ে বিএনপিতে তোলপাড় চলছে। নেতাদের মতে, সংবিধান পরিপন্থি এমন কোর্ট বসানোর বিরুদ্ধে রাজপথে সোচ্চার হতেই হচ্ছে বিএনপিকে। এখন আর বসে থাকার সময় বিএনপির হাতে নেই। সময়ও খুব অল্প। এ অবস্থায় চলতি মাসের শেষের দিকে চূড়ান্ত আন্দোলনে যাওয়ার নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়ে এগোনোর সিদ্ধান্তও নিয়েছে দলটির হাইকমান্ড। আর এভাবেই খালেদার মুক্তি আন্দোলনকে নির্বাচনী দাবি আদায়ের পর্যায়ের নিতে চায় বিএনপি। ততদিনে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনের নির্বাচনের দাবি নিয়ে নামতে পারে আরো কিছু রাজনৈতিক দলও। তফসিল ঘোষণার পরই সেই আন্দোলন গণজোয়ারে রূপ নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ঐক্য প্রক্রিয়ার জন্য বসে থাকা না থাকার বিষয় নয়, বিএনপি একটি জাতীয় ঐকমত্যের ডাক দিয়েছে। যারা গণতন্ত্রে চায়, জনগণের সরকার চায় এমন চিন্তার সব রাজনৈতিক দলই একটি প্লাটফর্মে আসার চেষ্টা করছে। এখানে প্রত্যেক দলেরই একটি নিজস্ব চিন্তা থাকতে পারে। তবে বিএনপির প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে দলের চেয়ারপারসনের মুক্তি। আমরা মনে করি, সরকার খালেদা জিয়াকে জেল খানায় রেখে একটি ৫ জানুয়ারি মার্কা নির্বাচন করাতে চায়। কিন্তু এটা এবার দেশের মানুষ হতে দেবে না। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার খালেদা জিয়া মুক্ত হওয়ার কথা অনেক আগেই। কিন্তু সরকার আইন আদালতকে নিজের মতো ব্যবহার করছে। এমন অনৈতিক ব্যবহারের কারণে চেয়ারপারসন মুক্তও হতে পারছেন না। তাই বিএনপির একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে চেয়ারপারসনকে মুক্ত করা। এ লক্ষ্যে শিগগিরই রাজপথে নামবে বিএনপি। এর বাইরে অন্য কিছু ভাবছি না আমরা।

বিএনপির সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারে যে শর্তগুলো সামনে আনছেন ফ্রন্ট নেতারা তা রীতিমতো উচ্চাভিলাষী বলেই দলের নেতারা মনে করছেন। তারা মনে করছেন, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেওয়া যাবে না বলতে কি বোঝাতে চাইছেন জোট নেতারা তা বোধগম্য নয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের এক নেতা বলেন, ক্ষমতার ভারসাম্য আনার যে কথাটি বলা হচ্ছে তার কিছুটা যৌক্তিকতা হয়তো আছে। এটা মানাও যেতে পারে। কিন্তু বিএনপিকে ১৫০টি আসনের কম দেওয়া হবে, এমন দাবি কি বিএনপি মানতে পারবে?

এদিকে বিকল্প ধারার সভাপতি বদরুদ্দোজা চৌধরী এক আলোচনায় আবোরও বলেছেন, একটি স্বৈরাচারকে হটিয়ে আরেকটি স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করতে চাই না আমরা। আমরা চাই ক্ষমতার ভারসাম্য। এককভাবে স্বৈরাচার হতে দেওয়া যাবে না। রাজনীতির ভারসাম্যের দরুন জনতার ওপর স্বেচ্ছাচারী সরকারের জুলুম থাকবে না। একমাত্র ভারসাম্যের রাজনীতিই স্বেচ্ছাচারমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করতে পারে। এ দেশের ইতিহাস থেকে এ শিক্ষাই পাওয়া গেছে, নির্বাচনে কোনো দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে দেশে স্বেচ্ছাচারী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

বিএনপি সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত জাতীয় ঐক্যের নেতাদের যে সমস্ত বক্তব্য বিবৃতি বা অস্পষ্টভাবে উপস্থাপিত দাবি দাওয়া দেখে দলের মাঝে এখনই সমালোচনা শুরু হয়েছে। তাছাড়া এসব দাবি দাওয়া বি চৌধরীর পক্ষ থেকে বেশি আসাটা বিএনপি ভালো চোখে দেখছে না। দলের তরুণ নেতারা মনে করছেন এখানে বি চৌধরীর ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে। ভোটের মাঠের গুরুত্ব মাথায় না রেখে শুধু গায়ের জোরে সব চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতার পরিবর্তন হতে হবে। তাহলেই যৌক্তিক কিছু হতে পারে। অন্যথায় দেশের সব চেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের এমন আত্মসমর্পণও দেশের মানুষ ভালোভাবে নেবে না। নেতারা জানান, যেকোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ব্যাপারে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায়, তাকে ছাড়া কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। তাই জোটের দাবি দাওয়া নিয়ে হঠাৎ করে কিছু ঘটে যাওয়াও সম্ভব নয়।

স্থায়ী কমিটির সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, এ নিয়ে বিএনপি নীতিনির্ধারণী ফোরামে আলোচনা করে করণীয় নির্ধারণ করবে। তিনি জানান, আন্দোলন ছাড়া কিছু হয় না, বিএনপিতো আন্দোলন বিমুখ দলও নয়, সময়মতো আন্দোলনে যাবে বিএনপি। বিষয়টি নিয়ে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আলোচনা হতে পারে বলেও জানান তিনি। এই নেতা বলেন, আমরা বিশ্বাস করি আন্দোলনের মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে।

পিডিএসও/হেলাল