পূর্বধলা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি

  ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১

জনবলসহ নানা সংকটে পূর্বধলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নানা সংকটে এখন নিজেই রোগী। ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এ হাসপাতালে ৩১টি পদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ১৫ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ শূন্য, করোনাকালীন সময়ের জন্য অন্যত্র রয়েছেন ৭ জন। মাতৃত্ব ছুটিতে রয়েছেন ২ জন, দায়িত্বরত আছেন মাত্র ৭ জন।

২০১২ সালে এক্স-রে মেশিন নষ্ট হওয়ার পর হাসপাতালে নতুন করে আর কোনো এক্স-রে মেশিন নেই। কয়েকবার মেরামত করা হলেও এখন আর ব্যবহার করাই হচ্ছে না। ইসিজি মেশিন অফিস চলাকালীন সময় চলে পরবর্তীতে বন্ধ। আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন আছে সনোলজিস্ট জনবল সংকটে বন্ধ হয়ে আছে। রক্ত সংরক্ষণ এর জন্য রেফ্রিজারেটর থাকলেও নেই জনবল। ওটির সংখ্যা তিনটা একটা লেবার ওয়ার্ড, একটি ইমার্জেন্সি রুম আরেকটা এমনিতেই খালি, যন্ত্রপাতি কিছু আছে। জেনারেটর থাকলেও নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।

অবশ্য উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শাহীন মিয়া দাবি করেছেন, এক্স-রে মেশিন রাখার কক্ষটি ব্যবহারের অনুপযোগী এবং ভবন সংকটও রয়েছে। চিকিৎসক ও কর্মচারীদের জন্য উপযুক্ত আবাসনব্যবস্থা নেই। দুটি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে একটি সচল থাকলেও অন্যটি জেলা সদরের কাজে ব্যবহৃত হয়। করোনা কেবিন রয়েছে মাত্র একটি তাও অপরিস্কার এবং কম ভলটিজের কারনে অক্সিজেন সঠিকভাবে দেয়ার সুবিধা নেই। যাও আছে সেগুলিও ঝরাজীর্ণ।

আরো জানা গেছে, জরুরি প্রয়োজনীয় মেডিসিনের জুনিয়র কনসালট্যান্টসহ সার্জারি, গাইনি, শিশু, কার্ডিওলজি, ইএনটি, চর্ম ও অর্থোপেডিকের জরুরী গুরুত্বপূর্ন পদগুলি শূন্য রয়েছে। সনোলজিস্ট না থাকার কারণে আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন থাকলেও বিকল পড়ে আছে। এছাড়া করোনাকালে নেই পিসিআর ল্যাব। যে কারণে ময়মনসিংহ থেকে নমুনা পরীক্ষা করাতে হয়। এছাডা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট।

পূর্বধলায় উপজেলার ১১ ইউনিয়নে ৫ লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসার জন্য একমাত্র সরকারি হাসপাতাল এটি। চিকিৎসকরা যেমন সেবা দিতে সমস্যায় পড়ছেন, তেমনি রোগীরাও দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অপারেশন থিয়েটার থাকলেও তা চালু হয়নি দুই যুগেও। সার্জারি, অ্যানেসথেসিয়া ও গাইনি ডাক্তারের অভাবে অকেজো পড়ে আছে অপারেশন থিয়েটার (ওটি)। বন্ধ রয়েছে সিজারিয়ানসহ জটিল ও কঠিন অপারেশন। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় নষ্ট হওয়ার উপক্রম অপারেশন থিয়েটারের অ্যানেসথেসিয়া মেশিনসহ অন্যান্য সরঞ্জাম। এতে ভোগান্তিতে পরছেন দরিদ্র রোগীরা। সরকার কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে স্বয়ংক্রিয় আধুনিক অপারেশন থিয়েটার স্থাপন করলেও তা কাজে লাগছে না সেবা প্রত্যাশীদের। হাসপাতাল তৈরির শুরুর দিকে অপারেশন থিয়েটার চালু থাকলেও জনবল সংকটের কারনে তা বর্তমানে বন্ধ আছে। এতে বিকল হওয়ার পথে কয়েক লাখ টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালটিতে কেউ ছোটখাটো সেবা নিতে এলে তাদের নানা অজুহাতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এছাড়া অনেক সময় এখানে সেবা না দিয়ে বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ক্লিনিকগুলিতে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নেই এবং এগুলি স্বাস্থ্য সম্মত নয় যা কোনো সময় পরিদর্শন করা হয় না। সেখানেও রোগীরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হন। একই ব্যাক্তি বারেবারে প্রতিদিন আউটডোর থেকে ওষুধ নেয়।

অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালে প্রতিনিয়ত ঘটছে চুরি, মাদকাসক্ত একটি চক্র হাসপাতালের অভ্যন্তরে ঘোরাফেরা করে। সুযোগ বুঝে তারা রোগী ও স্বজনদের টাকা, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন জিনিস হাতিয়ে নিয়ে যায়।রোগীদের আরো অভিযোগ রয়েছে, এক্স-রেসহ অন্য বেশির ভাগ পরীক্ষা তারা বাইরের ক্লিনিক থেকে করিয়ে আনতে হয়। সাধারণ মানুষের অভিযোগ শুধুমাত্র টেকনিশিয়ান ও জনবল সংকটের অভাবে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করায় নষ্ট হচ্ছে। ছুটির দিন বন্ধ থাকে বহির্বিভাগ ও প্যাথলজি। ছুটির দিনে জরুরি বিভাগ খোলা থাকলেও বহির্বিভাগে চিকিৎসক না থাকায় ছোট খাট দুর্ঘটনা, জ্বর, মাথা ও পেটে ব্যথা, পেটে সমস্যা, বমি এবং সর্দি-কাশির মতো অসুখে ভুক্তভোগীদের চিকিৎসার জন্য পরদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এছাড়া বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন হাসপাতালের বহির্বিভাগ বন্ধ থাকায় রোগীদের পড়তে হয় সমস্যায়।

জানা যায়, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে চিকিৎসকরা শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি উপভোগ করেন। কিন্তু যে পেশার সঙ্গে মানুষের জীবন-মৃত্যু জড়িত, সেখানে ছুটির দিনে রোগীদের সেবা প্রদানের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকা উচিত বলে মনে করেন ভুক্তভোগীরা। সরকারি হাসপাতালে কর্মরত কয়েকজন চিকিৎসক বলেন, বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করে সীমিত পরিসরে ছুটির দিনে বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা চালু করা যেতে পারে। পূর্বধলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও উপকেন্দ্রসহ মোট কর্মকর্তা কর্মচারীর তালিকা: ডাক্তারের পদ সংখ্যা ৩১ এর মধ্যে আছে ১২জন, নাই ১৯ জন।

জুনিয়র কনসালটেন্ট পদ সংখ্যা ১০ জন, শূন্য পদ ১০ জন, নার্স পদ সংখ্যা ২০ আছে ১৫ জন খালি ৫ পদ। মিডওয়াইফ পদ সংখ্যা ৮, জনবল আছে ৫ খালি ৩ জন, সহকারি নার্স পদ খালি ১জন, ইমারজেন্সি ১০ ইউনিয়ন পরিষদসহ ১০ জন। সেকমো পদ সংখ্যা ১২ জন, আছে ৭জন খালি পদ ৫ জন। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদ সংখ্যা ৭ জন, পূরণকৃত ৩ খালি সংখ্যা ৪, স্বাস্থ্য পরিদর্শক পদের সংখ্যা ৪ সবগুলো পূরণকৃত। ফার্মাসিস্ট পদের সংখ্যা ২জন শূন্য পদ ২জন। স্বাস্থ্য সহকারী পদ সংখ্যা মোট ৫৭ জন পূরণকৃত ৪২ জন শূন্য পদ ১৫ জন, অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার অপারেটর পদের সংখ্যা ৩জন শূন্য পদ সংখ্যা ৩জন। স্টোর কিপার পদ সংখ্যা ১ জন শূন্য পদ ১জন, পরিসংখ্যান পদ সংখ্যা ১ শূন্য পদ আছে ১জন, এমএলএসএস/ অফিস সহায়ক পদ সংখ্যা ৮ পূরণকৃত ২ খালি পদ ৬, ওয়ার্ড বয় পদ সংখ্যা ৩ পূরণকৃত ২ শূন্য পদ ১, আয়া সংখ্যা ২ পূরণকৃত ১ খালি পদ ১, পরিচ্ছন্নকর্মী ৫ জন পূরণকৃত সংখ্যা ৪ খালি শূন্য পদ ১। নিরাপত্তাকর্মী পদ সংখ্যা ২ পূরণকৃত ১ শূন্য পদ ১। ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে আউটডোর চালু আছে।

চিকিৎসক, জনবল ও অন্যান্য সমস্যা নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ শাহীন মিয়া জানান, হাসপাতালের শূন্যপদ পূরণে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর চিঠি দেওয়া হয়েছে। সময় সময় চিকিৎসক পোস্টিং দেওয়া হলেও সব শূন্যপদে দেওয়া হয় না। ফলে কিছু সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য পদে সব জেলায় সংকট রয়েছে । হাসপাতালের আশপাশে গড়ে উঠা ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই পরিদর্শন করা হবে। সব ধরনের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে এবং সমাধানের উদ্দ্যোগ নেয়া হবে। জেনারেটর বর্তমানে নেই, একই ব্যক্তি বারবার ওষুধ নেয় না। পানির ব্যবস্থা দ্রুত করা হবে।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
পূর্বধলা,উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close