ফের বাড়ল পেঁয়াজের দাম, চাল বিকোচ্ছে চড়ায়

প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৯:০১ | আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৪:২০

হাসান ইমন

রাজধানীর পাইকারি বাজারে ফের বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছেন আড়তদাররা। দাম বাড়ার কারণ হিসেবে সরবরাহের স্বল্পতাকে দায়ী করছেন তারা। তবে দোকানভেদে দামের প্রার্থক্য রয়েছে। এদিকে চালের দামও বাড়ছে বাজারে। মোটা চালের সরবরাহ কমে যাওয়ায় চিকন চালের দামে এর প্রভাব পড়েছে। বাজারভেদে কেজিপ্রতি চালের দাম ৪ থেকে ৬ টাকা বেড়েছে।

জানা গেছে, গতকাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে ৬ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নেওয়া হয়েছে। কৃষি বিভাগের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরু থেকে ব্যবসায়ীরা ভারতের বিকল্প দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নেওয়া শুরু করেন। ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেওয়া (১৪ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত ২ লাখ ২৩ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নেয় ব্যবসায়ীরা। আর রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকে গত রোববার পর্যন্ত আরো সাড়ে ৩ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। এর মধ্যে গত ১৭ সেপ্টেম্বর এক দিনে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৮ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নিয়েছেন দুই শতাধিক ব্যবসায়ী। ৮৩৫টি চালানে আসবে এসব পেঁয়াজ। এছাড়া তুলে নেওয়া হয়েছে আমদানির ৫ শতাংশ শুল্ক। যা ৩১ মার্চ পর্যন্ত মওকুফ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আর আমদানিকারকদের সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত বাকিতে এলসি খোলার সুযোগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাজারে অভিযানের পাশাপাশি চলছে অনলাইনে পেঁয়াজ বিক্রি। এসব উদ্যোগের প্রভাব বাজারে পড়ছে না।

দেশের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২৪ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ। এর মধ্যে সংরক্ষণ দুর্বলতায় পচে যায় ৩০ শতাংশ যা প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মেট্রিক টন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য, এরই মধ্যে ভারত থেকে ৮ লাখ মেট্রিক টনের বেশি পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। এসব পরিসংখ্যান বলছে, দেশে পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি নেই। আর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ২৫ লাখ মেট্রিক টন।

গতকাল কারওয়ানবাজারে গিয়ে দেখা যায়, পাইকারিতে পাল্লাপ্রতি (৫ কেজি) কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪০০-৪২০ টাকায়। যা কেজিতে দাঁড়ায় ৮০-৮৪ টাকায়। আর আমদানি করা পেঁয়াজ পাল্লাপ্রতি বিক্রি হয়েছে ৩০০-৩২০ টাকায়। যা কেজিপ্রতি দাঁড়ায় ৬০-৬৪ টাকায়। এছাড়া কারওয়ানবাজারের খুচরা বাজারে দেশি (হাইব্রিড) ৯০ টাকা কেজি। আর দেশিটা বিক্রি হয়েছে ৯৫ টাকা কেজি। আর আমদানি করা পেঁয়াজ কেজিপ্রতি বিক্রি হয়েছে ৭০ টাকা।

দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে আড়তদার মো. ইসমাইল বলেন, বিভিন্ন দেশ থেকে এখন আর পেঁয়াজ আসছে না। আর এলসি খোলা পেঁয়াজ আসতেও দেরি হবে। এছাড়া দেশের গোডাউনে জমা থাকা এখন বিক্রি হচ্ছে। ফলে সরবরাহের সংকট থাকায় দাম বাড়ছে। তবে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ বাজারে না আসা পর্যন্ত দাম কমবে না মনে হয়।

একই বাজারে পেঁয়াজ কিনতে আসা বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মেসবাহ উদ্দিন বলেন, শুনলাম বিদেশ থেকে পেঁয়াজ এসেছে। আরো আসছে। পেঁয়াজ আমদানিতে ৫ শতাংশ শুল্কও প্রত্যাহার করা হয়েছে। তারপরও এখনো যদি পেঁয়াজ আগের দামে না আসে তাহলে আমাদের কী হবে? এই দেশে শুধু দাম বাড়ে, কমে না।

পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে অভ্যন্তরীণ চাহিদার বিপরীতে জোগান ঠিক রাখতে ভারত সরকার পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর থেকেই বিভিন্ন বন্দর এলাকায় আটকা পড়ে বাংলাদেশে ঢোকার অপেক্ষায় থাকা পেঁয়াজভর্তি শত শত ট্রাক। ভারত সরকার পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করেছে এমন ঘোষণা আসতে না আসতেই অস্থির হয়ে উঠে দেশের বাজার। এক রাতের ব্যবধানে রাজধানী ঢাকার আড়তগুলোতে কেজিতে ৩০ টাকা বেড়ে যায় এই নিত্যপণ্যের দাম। প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয় ৮০ টাকা দরে। আর ভারতীয় পেঁয়াজের দাম বাড়ে কেজিতে ২০ টাকা পর্যন্ত। প্রতি কেজি বিক্রি হয় ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। অনেক আড়তদার আবার বিক্রিও বন্ধ করে দেন।

এদিকে চালের বাজারে নতুন সংকট দেখা দিয়েছে, আর সেটি হচ্ছে গরিব মানুষের মোটা চালের সরবরাহ কম। ফলে চাপ পড়েছে সব ধরনের চিকন চালের ওপর। ব্যবসায়ীরা বলেন, এ কারণেই নাকি বেড়েছে চালের দাম। বাজারভেদে প্রতি কেজিতে চালের দাম বেড়েছে ৪ থেকে ৬ টাকা। ৫৪ টাকা কেজি দরের মাঝারি মানের মিনিকেট চাল এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি দরে। আর ৫৬ টাকা কেজি দরের নাজিরশাইল চাল বিক্রি হচ্ছে ৬২ টাকা করে।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, চালের এই মূল্য বৃদ্ধির পেছনে কোনো ধরনের কারসাজি নেই। চালের দাম বাড়ার প্রধান কারণ হচ্ছে প্রথমত, চালের চলতি মৌসুম শেষের দিকে। দ্বিতীয়ত, এবার সারা বছর কেটেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগে। প্রথমে হলো শিলাবৃষ্টি। এরপর ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ছোবল। তারপর দেশের ৩৩ জেলাজুড়ে বন্যা যা এখনো চলছে। এছাড়া বছরজুড়ে করোনার তাণ্ডব তো রয়েছেই। এর বাইরে এ বছর বৃষ্টিপাতের পরিমাণও বেশি। প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে। এসব কারণে বাজারে ধানের সরবরাহ কমে গেছে বিধায় দামও বেশি। ধানের দাম বেশি হলে চালের দাম বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক এমন দাবি ব্যবসায়ীদের।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবির হিসাবে, গত এক বছরে গরিব মানুষের মোটা চালের দাম বেড়েছে ২৭ শতাংশ। চিকন চালের দামও বেড়েছে ১৪ শতাংশ। মাঝারি মানের বিভিন্ন চাল বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৪৮ থেকে ৫৩ টাকা। আর প্রতি কেজি চিকন মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে বাজারভেদে ৫৬ থেকে ৬০ টাকা। টিসিবির হিসাবে, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় এখন মাঝারি মানের চালের দাম ৯ শতাংশ ও সরু চালের দাম ১৫ শতাংশ বেশি।

কারওয়ানবাজারে মাঝারি চিকন চালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, যা আগে ছিল ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা। আর মোটা চালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪২ থেকে ৪৪ টাকা, যা আগে ছিল ৪০ থেকে ৪২ টাকা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী জানিয়েছেন, চালের বাজারে কারো কোনো কারসাজি নাই। ধানের মৌসুম শেষের দিকে। এখন বাজারে ধান নাই। এবার বছরজুড়েই একটার পর একটা দুর্যোগ লেগেই রয়েছে। প্রতিদিন বৃষ্টি হচ্ছে। কারোনার তাণ্ডব তো আছেই। এসব কারণে বাজারে ধানের সরবরাহ কম, দামও বেশি। ধানের দাম বেশি হলে তো চালের দাম বাড়বে।

এ প্রসঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, চালের বাজার নিয়ে কেউ কারসাজি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দেশে পর্যাপ্ত চাল মজুদ আছে। তাই চাল নিয়ে কোনো ধরনের কারসাজি সরকার বরদাশত করবে না।

পিডিএসও/হেলাল