ডায়াবেটিস আক্রান্তদের করোনার ঝুঁকি!

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে করোনা আক্রান্ত প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন ডায়াবেটিস রোগী বলে একটি গবেষণায় দাবি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল ও বিআইটিআইডির যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশনা সংস্থা এলসেভিয়ারের জার্নালে ‘ডায়াবেটিস অ্যান্ড মেটাবলিক সিনড্রোম : ক্লিনিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড রিভিউস’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে। চট্টগ্রামের চারটি কোভিড হাসপাতালে এপ্রিল থেকে জুন মাসে ভর্তি হওয়া রোগীদের ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ডায়াবেটিস ও হরমোন রোগ বিভাগের প্রধান ডা. ফারহানা আক্তার এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষক ড. আদনান মান্নান। গতকাল শুক্রবার ড. আদনান মান্নান গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, চট্টগ্রামে করোনায় আক্রান্তদের প্রতি পাঁচজনে একজন ডায়াবেটিস রোগী। ৩১ থেকে ৫০ বছরের ডায়াবেটিস রোগীরা সবচেয়ে বেশি শারীরিক জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছেন। কোভিড-১৯ পরবর্তী প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয় ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্তদের মধ্যে। সুস্থ হয়ে উঠার পর তাদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ ডায়াবেটিসজনিত কোনো না কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়ায় ভুগছেন।

গবেষকরা জানান, আন্তর্জাতিকভাবেও ডায়াবেটিসকে করোনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে কোভিড-১৯ আক্রান্তদের মাঝে ২০ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ১১ শতাংশ এবং চীনে ১০ শতাংশ করোনা রোগীর ডায়াবেটিস আছে। চট্টগ্রামে ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে কোভিড-১৯-এর তীব্রতা, উপসর্গ এবং কোভিড পরবর্তী অবস্থা নিয়ে এই গবেষণাটি কোভিড থেকে সুস্থ হয়ে উঠার চার সপ্তাহ পর রোগীদের মাঝে পরিচালনা করা হয়। পৃথিবীতে প্রতি ১০ জনে একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে প্রায় ১ কোটি লোক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। চট্টগ্রামে প্রায় ১০ লাখের বেশি লোক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। পৃথিবীতে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ অষ্টম। ডায়াবেটিসের তীব্রতার কারণে কোভিডের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্ক, প্রতিক্রিয়া, সুস্থ হতে জটিলতা ও চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা জরুরি।

গবেষণার তথ্য বলছে, চট্টগ্রামে প্রতি ১ শতাংশ কোভিড রোগীর মাঝে সুস্থ হয়ে উঠার পর নতুন করে ডায়াবেটিস শনাক্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে এইচবিএওয়ানসি টেস্টের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা হয়েছে। কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার পরবর্তী সময়ে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য অন্যান্য দেশেও পাওয়া গেছে। আগে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ইতালি ও সিঙ্গাপুরে অনেকেই কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার পর নতুন করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছেন বলে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়াও ওই গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিডে আক্রান্ত ৪০ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগীকেই ইনসুলিনের মাত্রা তিন গুণ করতে হয়, রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য। করোনা আক্রান্ত ডায়াবেটিস রোগীদের ৯০ ভাগেরই জ্বর, ৬০ ভাগের কফ ও কাশি এবং ৪৫ ভাগের শারীরিক ব্যথা হয়েছে। ৬০ ভাগের বেশি রোগীর ফেরিটিন ও ডি ডাইমারের পরিমাণ অধিক পাওয়া গেছে। ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের মধ্যে উপসর্গবিহীন হওয়ার সংখ্যা কম। মাত্র ৪ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে কোভিড আক্রান্ত হওয়ার পর কোনো উপসর্গ বা লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়নি। কিন্তু ডায়াবেটিসবিহীন করোনা রোগীদের মধ্যে বেশি উপসর্গবিহীন হওয়ার মাত্রা দেখা গেছে।

গবেষণা সম্পর্কে গবেষক দলের নেতৃত্বদানকারী ড. আদনান মান্নান বলেন, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা যাদের থাকে, তাদের কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার পর বিভিন্ন উপসর্গ ও সমস্যার সম্ভাবনা দেখা যায়, যা এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে ১ কোটি ডায়াবেটিস রোগী থাকার কারণে তাদের শারীরিক প্রতিক্রিয়া আলাদাভাবে জানা প্রয়োজন। কারণ ডায়াবেটিস একটি বহুমাত্রিক শারীরিক সমস্যা, যা অনেক উপসর্গের সঙ্গে সম্পর্কিত। সে কারণেই কোভিডে একইসঙ্গে একজন রোগীর অনেক অঙ্গকে আক্রান্ত করার প্রবণতা দেখা যায়।

ডা. ফারহানা আক্তার জানান, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণায় কোভিড আক্রান্ত রোগীর বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার মধ্যে ডায়াবেটিস অন্যতম, যা আমাদের গবেষণায়ও প্রতিফলিত হয়েছে। আমরা জানি, ডায়াবেটিস রোগীর যেকোনো সংক্রমণ হলে স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়, যা রক্তে গ্লুকোজ বৃদ্ধি করে। একইভাবে কোভিড আক্রান্ত রোগীরও এই স্ট্রেস হরমোনের কারণে ডায়াবেটিস মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যায়। তা ছাড়া কোভিডের চিকিৎসায় কিছু ওষুধ ব্যবহার করা হয়, যার কারণে ডায়াবেটিস বেড়ে যেতে পারে। তিনি আরো বলেন, অন্যদিকে বেশি সংক্রমণের কারণে ইনসুলিনও ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। ফলে রোগীর ইনসুলিন গ্রহণের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। এর পাশাপাশি কোভিড আক্রান্ত ডায়াবেটিস রোগীর আরো কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আমরা পেয়েছি যা এই গবেষণার একটি বিশেষ দিক। আমরা কোভিড পরবর্তী নতুন ডায়াবেটিস রোগী পেয়েছি, যাদের ব্যাপারে আমাদের আরো দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার পরিকল্পনা আছে।

গবেষক দলের সহ-তত্ত্বাবধায়ক ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী বলেন, ডায়াবেটিস রোগীদের শারীরিক বিভিন্ন জটিলতা দূর করতে করোনা পরবর্তী সময়ে হাঁটাচলা, শরীরচর্চা ও নিয়মিত চিকিৎসকের সংস্পর্শে থাকতে হবে। করোনা পরবর্তী সময়ে ডায়াবেটিস রোগীদের ৪৫ ভাগ প্রচ- কিংবা মাঝারি মানের শারীরিক ব্যথা অনুভব করেন, অন্তত চার থেকে ছয় সপ্তাহ। ৩০ ভাগ রোগীর রাতে নিরবচ্ছিন্ন ঘুমাতে সমস্যা হচ্ছে।

গবেষকরা দাবি করেন, আগে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় তুরস্ক ও অন্যান্য দেশে কোভিড-১৯ প্রতিরোধে বিসিজি টিকার কার্যকারিতা দাবি করলেও বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে তার নিদর্শন পাননি তারা। কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত ডায়াবেটিস রোগীদের ৮৭ ভাগেরই বিসিজি এবং প্রয়োজনীয় সব টিকা দেওয়া আছে।

এই গবেষকরা মনে করেন, করোনা আক্রান্ত ডায়াবেটিস রোগীদের বিশেষ সুরক্ষা ও সতর্কতা প্রয়োজন এবং কোভিড পরবর্তী সময়ে নিয়মিত চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকা দরকার। গবেষণাটির সামগ্রিক তত্ত্বাবধানে ছিল চট্টগ্রামের ডিজিজ বায়োলজি অ্যান্ড মলিকুলার এপিডেমিওলজি রিসার্চ গ্রুপ। গবেষণা তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে ছিলেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী ও ডা. আবদুর রব মাসুম, বিআইটিআইডির ল্যাবপ্রধান ও অণুজীব বিজ্ঞানী ডা. শাকিল আহমেদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. মাহবুব হাসান এবং তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে নেতৃত্ব দেন গবেষণা শিক্ষার্থী আসমা সালাউদ্দিন ও সাখাওয়াত হোসেন মিয়াজি।

 

"