কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম

  ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

ধ্বংস করা হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের বিপজ্জনক পণ্য

অবশেষে টনক নড়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমসের। বছরের পর বছর ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে থাকা ২৫ টন বিপজ্জনক রাসায়নিক পণ্যের মজুদ ধ্বংসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালে ৪৯ টন এবং এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ১০ টন পণ্য ধ্বংস করা হয়েছিল। আরো বিপজ্জনক পণ্য বহু বছর ধরে পড়ে থাকার কারণে বন্দরের একটি অংশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত আরো পণ্য ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বন্দর সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে এসব পণ্য ধ্বংসের কোনো সুযোগ না থাকায় সুনামগঞ্জে নিয়ে ধ্বংস করা হবে। আগের পণ্যগুলোও এভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল।

পণ্যগুলো নিলামে তুলতে বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বন্দর কর্মকর্তারা। বন্দরে পড়ে থাকা রাসায়নিক বা কেমিক্যাল জাতীয় পণ্য ধ্বংস করতে হলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে। পণ্য ধ্বংস করতে হলে কমপক্ষে ১৩ থেকে ১৪টি প্রতিষ্ঠানে ছাড়পত্র ও সম্মতি নিতে হয়। আর এ ফাইল চালাচালিতে নষ্ট হয়ে যায় অনেক সময়। আবার বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া এগুলো ধ্বংস করা যায় না।

কাস্টম সূত্র জানায়, এবারে ধ্বংসের তালিকায় লেবানন থেকে ফেরত আসা ত্রুটিযুক্ত প্যারাসিটেমল সিরাপও রয়েছে। স্কেফ ফার্মাসিউটিক্যাল নামের একটি প্রতিষ্ঠান এগুলো রপ্তানি করেছিল। এর পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার কেজির মতো। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান পণ্যের মধ্যে ত্রুটি আছে বলে ফেরত পাঠায়। ফেরত পাঠানোর পর রপ্তানিকারক এগুলো আর ফেরত নেয়নি। ফলে দীর্ঘদিন পড়ে থাকার পর এগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বন্দরের পি শেডে প্রায় ৫ টনের মতো মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক মজুদ রয়েছে বন্দরের পি শেডে। এর মধ্যে হাইড্রোক্লোরাইড, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, বিপজ্জনক কঠিন পদার্থ, বিপজ্জনক উপাদান ছাড়াও কিছু কস্টিক সোডা রয়েছে। সোডিয়াম ক্লোরাইড, সালফেট, বিভিন্ন ধরনের ওষুধ তৈরির কাঁচামাল, ব্যাটারি জাতীয় পণ্য, হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডসহ নানা ধরনের দাহ্য পদার্থও রয়েছে। যা রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ডেপুটি কমিশনার জানান, ‘বন্দরের পি শেডে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা রাসায়নিক পণ্য ধ্বংস করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পণ্য একাধিকবার নিলামের তোলার পরও কোনো ব্যবসায়ী এগুলো গ্রহণ করেননি। কিছু পণ্যের দরদাতা পাওয়া যায়নি। কিছু পণ্যের কাক্সিক্ষত দর না পাওয়ার কারণে পড়ে আছে। তাই এগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরে ১ লাখ ২৬ হাজার প্যাকেজে ৫ হাজার ৭৪১ টন নিলামযোগ্য পণ্য পড়ে আছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৯৫ প্যাকেজ বিপজ্জনক পণ্য। যা পর্যায়ক্রমে নিলাম করার বা ধ্বংস করার কথা। কিন্তু কোনোটিই হয়ে উঠছে না। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আনা রাসায়নিক পদার্থ ও বিপজ্জনক পণ্য রাখা হয় পি শেডসহ বিভিন্ন শেডে। সাধারণত দুই ধরনের রাসায়নিক পণ্য বন্দর দিয়ে আমদানি হয়। এর মধ্যে রয়েছে গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল সেক্টরের রাসায়নিক পণ্য, যেগুলোর রয়েছে বন্ড সুবিধা। এর বাইরে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পণ্য।

অভিযোগ রয়েছে, এক ধরনের ঘোষণা দিয়ে অন্য ধরনের পণ্য আনার পর এগুলো বিভিন্ন সময় আটকে যায়। এ অবস্থা চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এক সময় আমদানিকারক এগুলো নেয় না। বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকে বন্দরে। পরে নানা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। প্রচলিত নিয়মে আমদানিকৃত পণ্য ইয়ার্ড থেকে ৩০ দিনের মধ্যে না নিলে শুল্ক বিভাগে হস্তান্তর করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এরপর পণ্য খালাস না নিলে আমদানিকারককে নোটিস দেয় কাস্টমস। ১৫ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস না করলে কাস্টম কর্তৃপক্ষ সেসব নিলামে তুলতে পারে। কিন্তু নিলাম আর হয়ে ওঠে না। এ নিলামকে কেন্দ্র করে রয়েছে বিশাল সিন্ডিকেট। নিলামে অংশ নিতে গিয়ে অনেকে হয়রানির মধ্যে পড়ে। সিন্ডিকেটের বাইরে নিলামে অংশ নিয়ে বন্দর থেকে পণ্য বের করা রীতিমতো কঠিন। যদিও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা পণ্য এবং বিভিন্ন সময়ে আটক হওয়া পণ্য নিলামে তোলার জন্য কাগুজে সবকিছু সম্পন্ন করে। কিন্তু বাস্তব চিত্র অন্যরকম। দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায় সবকিছু। একই পণ্য বার বার নিলামে উঠলেও নিলামে কেউ নিতে পারে না। ফলে দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছরের রাসায়নিক পণ্যও রয়ে গেছে বন্দরের গোলায়। এর মধ্যে করোনা মহামারির কারণে সনাতন পদ্ধতির নিলামে বাইরে ই-অ্যাকশন চালু করে। ঘটা করে চালু হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে এটি আগ্রহ হারায়। এত দিন সনাতন পদ্ধতিতে বিডাররা সশরীরে উপস্থিত হয়ে বিডিংয়ের মাধ্যমে নিলামে অংশগ্রহণ করছিলেন বিডাররা। কাস্টমসের মতে, এই প্রক্রিয়াটিকে স্বচ্ছ ও গতিশীল করতে ই-অ্যাকশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নতুন পদ্ধতিতে ঘরে বসেই অনলাইনের মাধ্যমে নিলামে অংশ নিতে পারবে বিডাররা। কিন্তু পরে দেখা যায় এটি তেমন ফলপ্রসূ হচ্ছে না। বিশেষ করে রাসায়নিক পণ্যের ক্ষেত্রে ই-অ্যাকশন তেমন কাজে লাগছে না বলে ব্যবসায়ীদের অভিমত।

বন্দর সূত্রে জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরে ১৪টি শেডে বিভিন্ন পণ্য রাখা হয়। এর মধ্যে পি শেডে বিপজ্জনক পণ্যগুলো রাখা হয়। সাধারণত ড্রাম, কার্টন ও বস্তাবোঝাই বিপজ্জনক পণ্য পড়ে রয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে। প্রায় ২৫ বছর আগের রাসায়নিক পণ্যও রয়েছে এই শেডে। ঝুঁকিপূর্ণভাবে রয়েছে হাইড্রোক্লোরাইড, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, নানা কঠিন পদার্থ, কস্টিক সোডা, সালফেট, ফার্মাসিউটিক্যালসের কাঁচামাল, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, রং তৈরির কাঁচামাল, টেক্সটাইল কেমিক্যাল, রাসায়নিক সলিউশন, পারফিউমারি কাঁচামাল, ফিক্সিট সিলিকন, এস্ট্রোজেন, সারফেস একটিভ ক্লিনিংসহ নানা জাতীয় পণ্য। এগুলোর বেশির ভাগই দাহ্য ও বিস্ফোরক জাতীয় পদার্থ বলে জানা গেছে।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close