নিরাপদ সড়ক কত দূর

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিরাপদ সড়কের দাবিতে ২০১৮ সালের জুলাই ও আগস্টে টানা ৯ দিন আন্দোলন করেছিল খুদে শিক্ষার্থীরা। চাপে পড়ে সড়ক নিরাপদ করতে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল সরকারি উদ্যোগের। স্বরাষ্ট্র, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর, পরিষদ ও কমিটি জারি করেছিল নানা নির্দেশনা। ১৭ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। তবে দুই বছরের মাথায় নেতিয়ে পড়ে সড়ক নিরাপদ করার বেশিরভাগ উদ্যোগ। নভেল করোনাভাইরাস মহামারির অজুহাত দেখিয়ে দায় এড়াচ্ছে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ। তবে হেলমেট না পরাসহ বিভিন্ন কারণে মোটরসাইকেল চালকদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ায় এগিয়ে আছে পুলিশ।

জানা যায়, যাত্রীবাহী বাস থামানোর জন্য রাজধানীর ১২১টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছিল। বাস্তবে যেখানে সেখানে বাস থামিয়ে ওঠানামা করা হচ্ছে যাত্রী। দরজা বন্ধ রেখে বাস চালানোর হার বাড়েনি। বাসের ভেতরে প্রদর্শন করা হচ্ছে না চালকের লাইসেন্সের কপি। অথচ এসব বিষয় মেনে চলতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল ২০১৮ সালের আগস্টে। রাজধানীতে পাম্প থেকে তেল না পাওয়ার ভয়ে মোটরসাইকেল চালক ও সহযাত্রীদের হেলমেট পরার হার বেড়েছে। কিন্তু রেষারেষি করে পাল্লা দিয়ে বাস চালানো বন্ধ হয়নি।

সড়কে শৃঙ্খলা আনার লক্ষ্যে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। তবে এর প্রয়োগও থেমে আছে পরিবহন নেতাদের চাপে। নতুন আইনে বেপরোয়া গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ শাস্তি রাখা হয়েছে পাঁচ বছরের কারাদন্ড। বিভিন্ন অপরাধে বাড়ানো হয়েছে জরিমানা। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর ১৭টি বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিল সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ। ঢাকায় কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল দুই বছর। তা বাস্তবায়নের লক্ষণ নেই। রাজধানীতে নতুন চার হাজার বাস নামানো এবং কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প ছক (ডিপিপি) তৈরি করা হয়েছে। এ অবস্থায় আজ ২২ অক্টোবর উদ্যাপন করা হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস।

গতকাল বুধবার রাজধানীর মিরপুর-১২, মিরপুর-১০, আগারগাঁও, গুলিস্তান, পল্টন, ফার্মগেট, নতুন বাজার, কুড়িলসহ সবখানেই সড়কের ওপর আড়াআড়ি করে বাস রাখতে দেখা গেছে। বাসের ভেতর কোথাও টাঙানো নেই চালক ও তার সহকারীর ছবিসহ নাম, চালকের লাইসেন্স নম্বর, মোবাইল ফোন নম্বর। বাসচালক মো. বাবুল প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘কেউ কিছু মানছে না। আমরা অভিযানের সময় নিয়ম মানি।’

২০১৮ সালের ১৮ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল তাতে বাসের ভেতরে দৃশ্যমান দুটি স্থানে এসব প্রদর্শনের নির্দেশনাও ছিল। এছাড়া ছিল মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীর বাধ্যতামূলক হেলমেট পরিধান এবং সিগন্যালসহ ট্রাফিক আইন মানতে বাধ্য করার নির্দেশনা।

ডিএমপি নির্দেশনা দিয়েছিল, হেলমেট ছাড়া পাম্প থেকে তেল দেওয়া হবে না। তাতে হেলমেট ব্যবহার বেড়েছে। ঢাকা শহরের যেসব স্থানে ফুট ওভারব্রিজ বা আন্ডারপাস আছে, সেসব স্থানের উভয় পাশে ১০০ মিটারের মধ্যে রাস্তা পারাপার সম্পূর্ণ বন্ধ করা কিংবা ফুট ওভারব্রিজ বা আন্ডারপাসগুলোতে প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা ছিল। সেসব নির্দেশনাও বাস্তবায়ন হয়নি। আন্ডারপাসগুলোতে লাইট, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনসহ আন্ডারপাস ব্যবহার করতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১৮ সালের ১৮ আগস্টের মধ্যে ঢাকা মহানগরীর সব রাস্তায় জেব্রাক্রসিং ও রোড সাইন দৃশ্যমান করা, ফুটপাত হকারমুক্ত রাখা, অবৈধ পার্কিং ও স্থাপনা উচ্ছেদ করা, সব সড়কের নামফলক দৃশ্যমান স্থানে সংযোজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল ডিএনসিসি ও ডিএসসিসিকে। জেব্রাক্রসিং ও সড়কে সংকেত চিহ্নিত করা হলেও তার ব্যবহার নেই। অবৈধ পার্কিং ও স্থাপনা উচ্ছেদে অগ্রগতি কম। স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়নি। ঢাকায় চালু হয়নি রিমোট কন্ট্রোলড অটোমেটিক বৈদ্যুতিক সিগন্যালিং পদ্ধতিও। ঢাকা শহরের সব সড়কে রোড ডিভাইডারের উচ্চতা বাড়ানোর নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি। মহাখালী ফ্লাইওভারের পর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত (আপ এবং ডাউন) ন্যূনতম দুটি স্থানে স্থায়ী মোবাইল কোর্ট বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত দৈবচয়নের ভিত্তিতে যানবাহনের ফিটনেস ও ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করার নির্দেশনা ছিল। এ নিয়মে পরিচালনা করা হচ্ছে না অভিযান। ঢাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি বা শুরু হওয়ার সময় জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী, স্কাউট ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের রাস্তা পারাপারের উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশনা ছিল। প্রথম দিকে কাকলী, মিরপুরসহ কয়েকটি এলাকায় তা ছিল। কর্মসূচি বিস্তৃত হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর এগুলো বাস্তবায়নে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় বৈঠক করে ৯ সদস্যের কমিটি করেছিল বিআরটিএ চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে। মহাসড়কে বিশ্রামাগার নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অগ্রগতি আছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চান্দিনা, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের জগদীশপুর, সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে বিশ্রামাগার স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সেগুলোর বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হয়নি।

সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদের ৪২তম সভায় ২০টি সিদ্ধান্তের বেশির ভাগ বাস্তবায়ন হয়নি। যেমন সড়ক ও মহাসড়কে নসিমন, করিমন, ভটভটি, ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও লেগুনা চলাচল বন্ধ করতে বলা হয়েছিল পুলিশকে। সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ বাস, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের অননুমোদিত অ্যাঙ্গেল, হুক ও বাম্পার। এগুলো অপসারণ করা হয়েছে ৯০ শতাংশ।

বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা আনার জন্য বিআরটিএ সচেষ্ট রয়েছে। অন্যান্য সংস্থার মধ্যেও সমন্বয় বাড়ছে।

নিরাপদ সড়ক শুধু দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার নির্বাচনী অঙ্গীকার জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২০ উপলক্ষে এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, দেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ সড়কে প্রাণ দিচ্ছে, আহত হচ্ছে, পঙ্গু হচ্ছে। তাদের সুরক্ষা দিতে এই দিবসটি অন্যান্য জাতীয় দিবসের মতো গতানুগতিকভাবে এক দিন পালন না করে, নিরাপদ সড়ক দিবসকে কেন্দ্র করে মাসব্যাপী স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, নিরাপদ সড়ক ব্যবহার সংক্রান্ত আলোচনা সভা, মসজিদ-মন্দির-গির্জায় সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা সংক্রান্ত আলোচনাসহ দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে সমাজের সব স্তরে নিরাপদ সড়কের বার্তা পৌঁছে দেওয়া গেলে দিবসটি উদ্যাপনের সুফল পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার নির্বাচনী অঙ্গীকার জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩৭,১৭০ : বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে মতে, ২০১৫ সাল থেকে সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ৫ বছরে ২৬,৯০২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৭,১৭০ জন নিহত এবং ৮২,৭৫৮ জন আহত হয়েছে। তবে সংঘটিত দুর্ঘটনার বেশির ভাগই সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় না।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৯ সালে ৫,৫১৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,৮৫৫ জন নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে ১৩,৩৩০ জন। ২০১৮ সালে ৫,৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,২২১ জন নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে ১৫,৪৬৬ জন। ২০১৭ সালে ৪,৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,৩৯৭ জন নিহত ১৬,১৯৩ জন আহত হয়েছে। ২০১৬ সালে ৪,৩১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬,০৫৫ জন নিহত ১৫,৯১৪ জন আহত হয়েছে। ২০১৫ সালে ৬,৫৮১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৮,৬৪২ জন নিহত ২১,৮৫৫ জন আহত হয়েছে।

এসব সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণকালে দেখা যায়, বর্তমান সরকারের সময় সড়ক-মহাসড়ক উন্নয়নের ফলে যানবাহনের গতি বেড়েছে। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো এবং বিপজ্জনক অভারটেকিং বেড়ে যাওয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় বেড়েছে হতাহতের সংখ্যা।

 

 

"