ডোর টু ডোর প্রকল্প

চসিকে অনিয়মের বরপুত্র ‘মোরশেদ’

তদন্ত কমিটির ১১ সুপারিশ

প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একটি প্রকল্পের নাম ‘ডোর টু ডোর প্রকল্প’। এ প্রকল্প সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের উৎসাহে নেওয়া। নগরীর প্রতিটি ঘর থেকে বাঁশি বাজিয়ে সংগ্রহ করা হবে ঘর গৃহস্থালির বর্জ্য। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে শুরু হয় প্রকল্পটির কাজ। অনেক ধনী ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ভ্যানগাড়িসহ নানা কিছু আদায়ও হয়। মেয়র পরিবর্তনের পর প্রশাসক হিসেবে খোরশেদ আলম সুজন দায়িত্ব নেওয়ার পর এ প্রকল্প নিয়ে ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র উঠে আসে। প্রকল্পটির অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্ত করতে গিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মোরশেদ আলম চৌধুরীর নাম অনিয়মের বরপুত্র হিসেবে বেরিয়ে আসে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মন্ত্রলালয়ের অনুমোদন রয়েছে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে দুই হাজার পরিচ্ছন্নকর্মী নিয়োগ দেওয়ার। আর নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মোরশেদ আলম চৌধুরী। নিজের ছেলে, আত্মীয়স্বজন ছাড়াও অনুমোদনের অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ, সার্টিফিকেট জালিয়াতি, বেশি সংখ্যক শ্রমিক দেখিয়ে বেতনের টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন শ্রমিক-কর্মচারী লীগের (সিবিএ) সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে জ্যেষ্ঠতানীতি লঙ্ঘন করে উপপ্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তার পদ ভাগিয়ে নিয়েছেন। পরিচ্ছন্ন বিভাগে চরম অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত দল।

গত ১৮ আগস্ট চসিকের সচিবালয় শাখার এক আদেশে পরিচ্ছন্ন বিভাগে ‘ডোর টু ডোর’ এ কর্মরত শ্রমিক যাচাই-বাছাইয়ের জন্য তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে ছিলেন সংস্থাটির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মুফিদুল আলম, হিসাব বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবে অতিরিক্ত প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির চৌধুরী। অন্যদিকে প্রভাব রাখতে পরিচ্ছন্ন বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মো. মোরশেদুল আলম চৌধুরী। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও চসিক প্রশাসকের অভিযোগ দিয়েছে ভুক্তভোগীরা।

মোরশেদ আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, প্রভাব খাটিয়ে ছেলে নাজমুল হাসানকে পরিচ্ছন্ন সুপারভাইজার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার। এছাড়াও তার গ্রামের বাড়ি বাঁশখালী উপজেলার ইলশা গ্রামে দুই কোটি টাকা বাড়ি, নগরীর পূর্ব বাকলিয়ার কালামিয়া বাজারে পাঁচতলা বাড়ি, অনন্য আবাসিকে দুইটি প্লট, স্ত্রী ও সন্তানদের নামে কোটি কোটি টাকা অবৈধ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১০নং উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্ন সুপারভাইজার হারুনর রশীদ। তাকে সচিবালয়ের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন সুপারভাইজার হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয়। যদিও পরিচ্ছন্ন সুপারভাইজার হওয়ার জন্য যোগ্যতা আবশ্যক এইচএসসি পাস। তিনি সেবক পদের জন্য যে আবেদন করেছিলেন, সেখানে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ আছে অষ্টম শ্রেণি পাস। ১৯৯৯ সালে তিনি দাখিল পাস করেছেন মর্মে সনদ দাখিল করেন। কিন্তু ১৯৯৮ সালে তিনি নবম শ্রেণিতে পড়েন বলে লিখিতভাবে জানান রায়পুর ইউনিয়ন বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, ১৯৯৯ সালে কীভাবে তিনি দাখিল পাস করেন? এমন অসম্ভব কাজকে সম্ভব করেছেন উপপ্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মোরশেদ। এ রকম আরো অন্তত ৫০ জনকে শ্রমিক থেকে টাকা বিনিময়ে সুপারভাইজার বানিয়েছেন। সচিবালয় বিভাগকে এড়িয়ে নিজে মেয়রের কাছে হাতে হাতে ফাইল নিয়ে ব্যবস্থা নিন লিখে নেন। তারপর সেটাকে পুঁজি করে টাকা হাতিয়ে নেন মোরশেদ। এমনটা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

জানা গেছে, সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের আমলে ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় দুটি শর্তে দুই হাজার দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে পরিচ্ছন্নকর্মী নিয়োগ দেওয়ার অনুমতি প্রদান করে। শর্তানুসারে দুই হাজার শ্রমিকের জায়গায় নিয়োগ দিয়েছে ২ হাজার ৬৫ জন এবং এখনো পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ে শ্রমিকদের তথ্য জমা দেয়নি সিটি করপোরেশন। এমনকি সংস্থাটির নিজের কাছেও নিয়োগকৃত শ্রমিকদের ছবিসহ পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই। তবে প্রতি মাসে দুই কোটি টাকারও বেশি বেতন গোনা হতো শুধুমাত্র শ্রমিকদের সংখ্যা উল্লেখ করেই। তাছাড়া মাস প্রতি প্রদেয় বেতনে নেই সামঞ্জস্য। এক শ্রমিককে কয়েকবার হাজিরা দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ করে মোরশেদের নিয়ন্ত্রিত চক্রটি। মাসের পর মাস পরিচ্ছন্ন কর্মীদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। যার বিপরীতে তদন্তদলকে কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি পরিচ্ছন্ন বিভাগ।

তবে সাবেক মেয়রের মৌখিক নির্দেশের কথা বলেই সব ধরনের অসচ্ছতার দায় সেরেছেন পরিচ্ছন্ন বিভাগের দায়িত্বশীলরা। এমনটাই জানা গেছে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে থেকে। সরকারি সংস্থায় নিয়োগের ক্ষেত্রে যা নিয়ম রয়েছে তার কোনোটাই মানা হয়নি ডোর টু ডোর পরিচ্ছন্নকর্মীদের নিয়োগের সময়। নিয়ম রক্ষার একটি বিজ্ঞাপন দিয়ে দায় সেরেছে সংস্থাটি। বিজ্ঞাপনের শর্তাবলি কোনোটাই মানার প্রমাণ পায়নি তদন্ত কর্মকর্তারা।

তদন্ত দলটি সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে ১১টি সুপারিশ করেছে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পরিচ্ছন্ন বিভাগের কোনো শ্রমিক অন্যকোনো বিভাগে নিয়োজিত থাকলে তাকে অবিলম্বে প্রত্যাহার করে পরিচ্ছন্ন বিভাগে নিয়োজিত রাখা উচিত, জরুরি ভিত্তিতে মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত ফরমেটে শ্রমিকদের যাবতীয় তথ্যাদি সংরক্ষণ করতে হবে, পরিচ্ছন্ন বিভাগে পরীক্ষামূলকভাবে ৪/৫টি ওয়ার্ডে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ করা যায়। এতে সফল হলে পর্যায়ক্রমে বাকি ওয়ার্ডগুলোতে একই প্রক্রিয়ায় শ্রমিক নিয়োগ করা যায়, শ্রমিকদের সময়মতো কাজে উপস্থিতি নিশ্চিতকরণে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর তাদের বদলীর ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য সকল কার্যক্রম নথিতে উপস্থাপন করে সচিবালয় শাখার মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে, অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করা উচিত।

বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন বলেন, তদন্ত রির্পোট পেয়েছি। দুর্নীতির সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন আইন মতোবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

 

"