মাসুদ আলম

  ০৩ ডিসেম্বর, ২০২১

পর্যবেক্ষণ

ইসলামে শুকরিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম

জীবন আনন্দ-বেদনা, সুখণ্ডদুঃখ, সাফল্য-ব্যর্থতার এক অধ্যায়। কখনো আনন্দের প্লাবন এসে জীবনকে করে তোলে উপভোগ্য। কখনো দুঃখ এসে জীবনকে করে তোলে ভারাক্রান্ত। তেমনি সাফল্যে আমরা উদ্বেলিত হই এবং ব্যর্থতায় মুষড়ে পড়ি। জীবনে যতই ঝড়ঝঞ্ঝা আসুক না কেন, এসব মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে যেতে হয়।

কখনো কোনো অবস্থাতেই হালছাড়া যাবে না, থামা যাবে না। সাফল্য না আসা পর্যন্ত অবিরত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। সাফল্যের পথে প্রথম পদক্ষেপ হলো শুকরিয়া বা (কৃতজ্ঞচিত্ততা)। শোকর আলহামদুলিল্লাহ, থ্যাংকস গড, প্রভু তোমাকে ধন্যবাদ। ছোট্ট এ বাক্যটি বলার মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় সঠিক জীবনদৃষ্টি। অর্থাৎ আপনি প্রথম পা ফেলতে শুরু করলেন সাফল্যের পথে। শুকরিয়া মনকে প্রশান্ত করে। মুহূর্তে ব্যক্তির চিন্তার জগৎকে বদলে দেয়। ব্যক্তি সচেতন হয়ে ওঠে বর্তমান উপকরণ সম্পর্কে, ভাবতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে।

একটি শিশুজন্মের পর প্রথমে চিত হয়ে শুয়ে শুধু হাত পা নাড়ে। একসময় সে কাত হয়, পরে উপুড় হয়। তারপর শুরু হয় হামাগুড়ি দিয়ে হাতে-পায়ে হাঁটা। এরপর সে উঠে দাঁড়ায়, হাঁটি হাঁটি পা পা করে। হাঁটতে গিয়ে সে বারবার পড়ে। আবার উঠে দাঁড়ায়, আবার হাঁটতে শুরু করে। একসময় কারো সাহায্য ছাড়াই সে দৌড়ায়। ঠিক একইভাবে ক্রমাগত লেগে থাকতে হয়। জীবনের চিত্রটাও ঠিক এরকম।

জন্ম থেকে একটি শিশু মা-বাবার পরম মমতা ও আদর যতেœ বড় হতে থাকে। একসময় মা-বাবার অবর্তমানে একাই পথ চলতে হয়। জীবন চলার পথের চ্যালেঞ্জটা শুরু হয় তখনি। মা-বাবা কত কষ্ট করে শৈশব-কৈশরে লালন-পালন করেন। শিক্ষিত করে মানুষ করেন। সম্পত্তির উত্তরাধিকার করেন। বিনিময়ে কী দিতে পারি জনমদুঃখী মা-বাবাকে? বৃদ্ধ বয়সে একটুখানি সহানুভূতি, মমতা, সদাচরণ ছাড়া আর কীইবা প্রত্যাশা? অথচ কজনইবা মা-বাবার এ ছোট্ট প্রত্যাশাকে পূরণ করতে পারে?

অথচ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ আদেশ করেছেন যে, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো উপাসনা করবে না। বাবা-মার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। তোমার জীবদ্দশায় তাদের একজন বা উভয়েই যদি বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবু তাদের ব্যাপারে ‘উহ-আহ’ শব্দ পর্যন্ত করো না। তাদের ধমক দিও না বা অবজ্ঞা করো না, তাদের সঙ্গে আদবের সঙ্গে কথা বল। শ্রদ্ধাভরা দৃষ্টিতে মমতার ডানা মেলে ছায়ার মতো আগলে রাখো এবং সব সময় তাদের জন্য দোয়া করো : হে আমার প্রতিপালক। আমার মা-বাবা শৈশবে যে মমতায় আমাকে লালন করেছেন, তুমিও তাদের ওপর সে-রূপ করুণাবর্ষণ করো।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ২৩-২৪)।

পিতাণ্ডমাতা মহান স্রষ্টার নেয়ামত। পিতাণ্ডমাতা সব সময় সন্তানের ওপর ছায়া হয়ে থাকে। তাদের দোয়া ও আশীর্বাদ সব সময় সন্তানের জন্য পাথেয়। যার পিতাণ্ডমাতা দুনিয়ায় নেই তার দোয়া ও আশীর্বাদ করার কেউ থাকে না। তাই পিতৃমাতৃহীন সন্তানকে দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে হয় নিজের সৎকর্ম দিয়ে। সর্বদা সৎকর্ম, সদাচার, ধর্মচর্চা, দান, আর্তমানবতার সেবা করে যেতে পারলে ইহকালীন কল্যাণের পাশাপাশি মিলবে পরকালীন মুক্তি। সেই সঙ্গে পিতাণ্ডমাতার জন্য সন্তানকে সব সময় দয়াময় প্রভুর কাছে প্রার্থনা করতে হবে এই বলে- ‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সাগিরা’। জীবনে সর্বাবস্থায় শোকরগুজার থাকতে হবে। কী পেলাম কী পেলাম না এ হিসাব না করে, কী দিতে পারলাম পরিবার সমাজ তথা দেশকে এটাই জীবনের ব্রত হওয়া উচিত।

শোকরগুজার মন প্রশান্ত মন। প্রশান্ত মন সুস্পষ্ট বুঝতে পারে করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে, সহজেই সংযুক্ত হয়ে যায় শক্তির মূল উৎসের সঙ্গে, যেখান থেকে উৎসারিত হয় সাফল্যের ফল্গুধারা। পৃথিবীর সব ধর্মেই স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কথা প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মানুষ! আমি পৃথিবীতে তোমাদের (প্রাচুর্য, সম্পত্তি ও ক্ষমতায়) প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং দিয়েছি জীবনের সব উপকরণ। হায়! তার পরও তোমরা কত কম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’

‘হে নবী! ওদের বলো, আল্লাহই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন। তিনি তোমাদের শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি দান করেছেন। সেই সঙ্গে দিয়েছেন বিচারবুদ্ধি, অন্তকরণ। অথচ তোমাদের শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতার প্রকাশ খুবই কম।’

কৃতজ্ঞতা ও ধৈর্য একই সূত্রে গাথা। ধৈর্যশীল ব্যক্তি সহজে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে। ধৈর্য সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে বিশ্বাসীরা তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গেই থাকেন।’

‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদের অনেককে ভয়, ক্ষুধা, জানমাল ও শ্রমের ফল বিনষ্ট করে অর্থাৎ বিপদণ্ডআপদ দিয়ে পরীক্ষা করব। তবে এ বিপদের মধ্যে যারা ধৈর্যধারণ করে তাদের সুসংবাদ দাও। ধৈর্যশীলরা বিপদে পড়লে বলে আমরা আল্লাহর। তার কাছ থেকে এসেছি। তার কাছেই ফিরে যাব।’

তাই জীবনের সর্বক্ষেত্রে সর্বাবস্থায় সৃষ্টিকর্তার কাছে বলুন, শোকর আলহামদুলিল্লাহ। সব সময় শোকরগুজার মানুষদের সংস্পর্শে থাকুন, সৎসঙ্গে থাকুন, যা আপনাকে সব সময় প্রাণশক্তিতে উজ্জীবিত রাখবে এবং জীবনে আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন।

মানুষের সহজাত অভ্যাস হলো মানুষ নিজের দিকে না তাকিয়ে অন্যের দিকে তাকায়। অন্যের কী আছে, অন্যে কী বলল, কী ভাবল, কী করল এ নিয়েই বেশি ভাবে। অন্যের মতামতকে বেশি প্রাধান্য দেয়, অন্যের জিনিসটা বেশি দামি মনে হয়, অন্যের হাসি দেখলে বেশি সুখী মনে হয় ইত্যাদি। অন্যের দিকে তাকাতে গিয়ে মানুষ আসলে নিজের কী আছে তাণ্ডই ভুলে যায়। অন্যের দিকে তাকিয়ে কোনো লাভ নেই। আমাদের তাকাতে হবে নিজের দিকে। যত নিজের দিকে অন্তরদৃষ্টি দিয়ে তাকাবেন ততই বিস্মিত হবেন। যাদের সাফল্য আমাদের ক্ষণিকের জন্য ঈর্ষান্বিত করে তোলে তাদের প্রাপ্তির পেছনের সব উপকরণ সব মানুষের মধ্যে বিদ্যমান, যা দিয়ে সে অনায়াসে নতুন উদ্যমে শুরু করতে পারে।

আজ যে আমরা সুস্থদেহে ঘুম থেকে উঠতে পেরেছি এজন্য স্রষ্টার কাছে শুকরিয়া আদায় করা প্রয়োজন। গতকাল কয়েক লাখ মানুষ পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন, বহু মানুষ অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। আপনি বেঁচে আছেন, কাজ করার, জীবনকে উপভোগ করার আরো একটি দিন পেয়েছেন, আপনার শোকরগুজার হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট।

আমরা যে এখনো বেঁচে আছি, দম নিতে পারছি এটিই হতে পারে শুকরিয়া আদায়ের একটি প্রধান কারণ। হাসপাতালের বেডে শায়িত রোগীর কথা ভাবুন, যিনি দমও নিতে পারছেন না, যাকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। মানবদেহের কথাই ভাবুন। এতে রয়েছে পাঁচ শতাধিক মাংসপেশি, দুই শতাধিক হাড়, ৭০ থেকে ১০০ ট্রিলিয়ন দেহকোষের সমন্বয়ে গঠিত শরীরের প্রতিটি কোষে খাবার ও অক্সিজেন পৌঁছে দিচ্ছে, সিরা ও ধমনির ৬০ হাজার মাইল দীর্ঘ পাইপলাইন দিয়ে। রয়েছে ফুসফুসের মতো রক্ত শোধনাগার। হার্ট কোনো রকম ক্লান্তি ছাড়াই প্রতিদিন প্রায় লক্ষবার স্পন্দনের মাধ্যমে ১৬০০ গ্যালনেরও বেশি রক্ত পাম্প করে দেহকে সচল রাখছে। রয়েছে লেন্সের মতো একজোড়া ছোট চোখ, যা দিয়ে বিশাল পৃথিবীর সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়। রয়েছে মানুষের মনোদৈহিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী মস্তিষ্করূপী জৈব কম্পিউটার, যা যেকোনো কম্পিউটারের চেয়েও কমপক্ষে দশ লাখ গুণ বেশি শক্তিশালী। কম্পিউটারের দামের অনুপাতে প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্কের মূল্য কমপক্ষে পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

বিশ্বের সাড়ে ছয় শ কোটি মানুষের মধ্যে প্রতিটি মানুষ অনন্য। একজনের মতো হুবহু কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সৃষ্টিকর্তা প্রত্যেককে অনন্য করে সৃষ্টি করেছেন। তিনি আপনাকে এমন কিছু মেধা ও যোগ্যতা দিয়েছেন, যা আর কাউকে দেননি। যত নিজের দিকে তাকাবেন তত দেখবেন, সাফল্যের জন্য যে উপকরণ প্রয়োজন তার সবই আপনার রয়েছে। এ উপকরণগুলো ব্যবহার করে একজন মানুষ নির্মাণ করতে পারে নিজের ভবিষ্যৎ। এজন্য প্রথমে এক এক করে তালিকাভুক্ত করতে হবে কী কী আছে আপনার। কোন কোন জিনিসের জন্য আপনি শোকরগুজার হবেন। আপনি কী কী পারেন, আপনার বিশেষ গুণ বা বৈশিষ্ট্যগুলো কী? দেখবেন নিজের ভেতরের গুণ বা যোগ্যতাগুলো মনে এলে নিজেই বিস্মিত হবেন।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close