আমিনুল ইসলাম হুসাইনী

  ২৬ নভেম্বর, ২০২১

দৃষ্টিপাত

নীরব রাতে সরব হও প্রভুর ইবাদতে

সন্ধ্যার মুগ্ধতায় ভর করে পৃথিবীতে নেমে আসা রাত যেমন রহস্যময়, তেমনি সৌন্দর্যের আধার। রাত মহান আল্লাহর এক অনন্য নিয়ামত। সারা দিনের ক্লান্তি দূর করে দেহ ও মনে শান্তি আনয়নে রাতের জুড়ি নেই। আল্লাহতায়ালা রাতকে সৃষ্টিই করেছেন বিশেষ আরামদায়ক করে। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আমি তোমাদের বিশ্রামের জন্য নিদ্রা দিয়েছি, তোমাদের জন্য রাত্রিকে করেছি আবরণস্বরূপ আর দিনকে বানিয়েছি তোমাদের কাজের জন্য’ (সুরা নাবা : ৯-১১)।

রাতের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মাঝে রুপালি আলোর পসরা সাজায় পূর্ণিমার চাঁদ। চাঁদের সেই নির্মল আলোর স্নিগ্ধতায় মুমিন বান্দার হৃদয়ে দুলে উঠে ইবাদতের সবুজ চারা। তাইতো আল্লাহর প্রিয় বান্দারা সিজদায় লুটিয়ে পড়েন প্রভুর কুদরতি পায়ে। নির্জন রাতের এই ইবাদত মুমিনকে এনে দেয় বিজয়ীর সম্মান। যেমন এনে দিয়েছিল বদরের মুজাহিদদের। বদরের মুজাহিদরা রাতের শেষ প্রহরে জেগে ওঠতেন। চোখের পানি ফেলে কাঁদতেন আর আল্লাহতায়ালার কাছে গুনাহ মাফ চাইতেন। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে তা উল্লেখ করে বলেন, ‘এসব লোক অগ্নি পরীক্ষায় অটল ও অচল, সত্যের অনুরাগী, পরম অনুগত, আল্লাহর পথে সম্পদ উৎসর্গকারী এবং রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহর কাছে ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থী’ (সুরা আল ইমরান : ১৭)।

আফসোস! আমরা এই রাতকে ইবাদতের জায়নামাজ না বানিয়ে পাপের নিয়ামক বানিয়ে ফেলছি। রাত যত গভীর হয় আমাদের পাপাচারও ততই বেগবান হয়। অহেতুক গল্পগুজব, পরনিন্দা বা অনৈতিক কথাবার্তায় লিপ্ত থেকে ইবাদতের সুবর্ণ সুযোগটি নষ্ট করছি। বন্ধুদের সঙ্গে অযথা রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়ে রাত পার করে দিচ্ছে। আর যারা বাইরে বেরোয় না, তারা ঘরে বসে ইন্টারনেটে সারা দুনিয়া চষে বেড়ায়। এতে যে আমাদের স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে তা কী ভেবে দেখেছি? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যানসারবিষয়ক গবেষণা বিভাগ ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসারের তথ্য মতে, যখন সূর্যের আলো থাকে না তখন শরীরকে কাজ করতে বাধ্য করা বা জাগিয়ে রাখা শরীরে মেলাটনিন হরমোন তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করে। এর ফলে টিউমার, এমনকি ক্যানসারও হতে পারে। এজন্যই তো নবীজি এশার নামাজ এক-তৃতীয়াংশ রাত পরিমাণ দেরি করে পড়া পছন্দ করতেন, আর এশার আগে ঘুমানো এবং এশার পর না ঘুমিয়ে গল্পগুজব করা অপছন্দ করতেন (সহিহ বোখারি : ৫৯৯)।

সকাল সকাল না ঘুমালে ভোর বেলায় জাগতে কষ্ট হয়। যারা ভোর বেলায় ঘুমিয়ে থাকে তারা সফলতা ও রিজিকের বরকত থেকে বঞ্চিত হয়। ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ (সা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসুল (সা.) আমার ঘরে এসে আমাকে ভোরবেলায় ঘুমন্ত অবস্থায় দেখলেন, তখন আমাকে পা দিয়ে নাড়া দিলেন এবং বললেন, ‘মামণি। ওঠো। তোমার রবের পক্ষ থেকে রিজিক গ্রহণ করো। অলসদের দলভুক্ত হয়ো না। কেননা আল্লাহ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত মানুষের মধ্যে রিজিক বণ্টন করে থাকেন’ (আত-তারগিব ওয়াত তারহিব : ২৬১৬)।

অপর এক হাদিসে নবীজি এরশাদ করেন, ‘সকাল বেলায় রিজিকের অন্বেষণ করো। কেননা সকাল বেলা বরকতময় ও সফলতা অর্জনের জন্য উপযুক্ত সময়’ (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ : ৬২২০)। আল্লাহতায়ালা রাতকে ঘুম ও স্রষ্টাকে নিজের করে নেওয়ার মাধ্যম বানিয়েছেন। সে জন্যই তো রাতের ভাঁজে ভাঁজে এত সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছেন। একটিবারও কি সেই সৌন্দর্য অবলোকন করে মহান আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করেছি? মাথা ঝুঁকিয়েছি তার কুদরতি পায়ে? আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই নভোম-ল ও ভূম-ল সৃজনে এবং দিন-রাতের পরিবর্তনে সুস্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য। যারা দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে আল্লাহর জিকির করে এবং নভোম-ল ও ভূম-ল সৃজন নিয়ে চিন্তাভাবনা করে (তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বীকার করতে বাধ্য হয়) হে আমার প্রতিপালক। আপনি এগুলো বৃথা সৃষ্টি করেননি। আপনি বৃথা সৃষ্টি করার দোষ থেকে পবিত্রতম (সুরা আল ইমরান : ১৯০, ১৯১, ১৯২)।

রজনীগন্ধার সুবাস বিলানো এ রাত যেমন দেহের ক্লান্তি দূর করে, তেমনি মনেরও প্রশান্তি জোগায়। আর এই প্রশান্তি আসে ইবাদতের মাধ্যমে। আমরা কি পারি না এই নির্জন রাতটি পাপাচারে নষ্ট না করে কিছুটা সময় মহান আল্লাহর ইবাদতে কাটাতে? দুই-চার রাকাত তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তে? এখন তো রাত যথেষ্ট বড় এবং নাতিশীতোষ্ণ। ইচ্ছা করলেই আমরা পরিমাণ মতো ঘুমিয়েও তাহাজ্জুদে অভ্যস্ত হতে পারি। রাত ১০টায় ঘুমিয়ে পড়লে রাত ৪টায় সহজেই উঠা যায়। এতে ছয় ঘণ্টা ঘুমও হবে, আবার তাহাজ্জুদও পড়া যাবে। তাহাজ্জুদের ফজিলত বর্ণনাতীত। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ নামাজ কায়েম করুন; এটা আপনার জন্য এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায়, আপনার প্রতিপালক আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন মাকামে মাহমুদে (প্রশংসিত স্থানে)’- (সুরা বনি ইসরাইল : ৭৯)।

তাহাজ্জুদ নামাজ হলো আম্বিয়া আলাইহিস সালামদের সুন্নাত। আল্লাহতায়ালার মাহবুব বান্দাদের অভ্যাস। আল্লাহতায়ালার সঙ্গে বান্দার গভীর সম্পর্ক স্থাপন তথা নৈকট্য ও সন্তোষ অর্জনের অন্যতম পন্থা। তাইতো রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহপ্রেমীদের প্রেমও গভীর হতে থাকে। তারা নির্জনে রাতের আঁধারে প্রভুর কুদরতি পায়ে লুটিয়ে পড়ে ক্ষমা ভিক্ষা চান নিজ নিজ অপরাধ ও অক্ষমতার। এই প্রেমময় ইবাদতের মাধ্যমেই তারা আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত হন। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘আল্লাহর প্রিয় বান্দা তারা, যারা তাদের প্রতিপালকের দরবারে সিজদা করে এবং দাঁড়িয়ে থেকেই রাত কাটিয়ে দেয়’ (সুরা ফুরকান : ৬৩-৬৪)।

রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহতায়ালা প্রথম আসমানে আসেন। বান্দাদের প্রয়োজন মিটানোর জন্য তাদের ডাকেন। তার কাছে চাইতে বলেন। কিন্তু সেই সময় আমরা ঘুমিয়ে থাকি।

হজরত আবু হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের মর্যাদাবান বরকতপূর্ণ রব দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন, ‘যে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দেব। যে আমার নিকট কিছু প্রার্থনা করবে আমি তাকে তা দান করব। যে আমার নিকট মাফ চাইবে আমি তাকে মাফ করে দেব’ (সহিহ বোখারি : ১১৪৫)।

ধরুন কোনো এক মন্ত্রী আপনার বাড়িতে আসবেন। আপনাকে পাঁচ লাখ টাকা দেবেন। আপনাকে বলা হলো রাতের অতটায় সজাগ থাকতে। আপনি কি তখন ঘুমিয়ে থাকবেন? আমার তো মনে হয় শুধু রাতই নয়, দিনেও আপনি চোখের পাতা এক করবেন না। তবে কেন আহকামুল হাকেমিন, সব বাদশাহর বাদশাহ মহান আল্লাহর বেলায় আপনার এই উদাসিনতা? একটিবার ভাবুন তো, আল্লাহ আপনাকে ডাকছে আর আপনি ঘুমিয়ে আছেন, ব্যাপারটা খুবই খারাপ নয় কি? নবীজি বলছেন, ‘আল্লাহ ওই বান্দার ওপর রহম করুন, যে রাত্রিকালে উঠে নামাজ আদায় করে এবং তার স্ত্রীকেও জাগায় ও সেও নামাজ আদায় করে। যদি সে (স্ত্রী) নিদ্রার চাপে উঠতে না চায়, তবে সে (ভালোবেসে) তার মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। আল্লাহ ওই নারীর ওপরও রহম করুন, যে রাত্রিতে উঠে নামাজ আদায় করে এবং তার স্বামীকে ঘুম থেকে জাগায় ও সেও নামাজ আদায় করে। যদি সে ঘুম থেকে উঠতে না চায়, তবে সে (ভালোবেসে) তার মুখে পানি ছিটিয়ে জাগিয়ে তোলে’ (আবু দাউদ : ১৪৫০)।

আসুন, আমরা অহেতুক গল্প, ঘুম আর পাপাচারে রাত না কাটিয়ে ইবাদতে মশগুল হই। এটাই তো মোমিনদের বৈশিষ্ট্য। কেন না প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের অন্তর্নিহিত গোপন কথার জন্য রাতের এই নির্জনতা থেকে অধিক উপযোগী সময় আর হয় না। তাই এমন তারাভরা রাতে রুপালি চাঁদের ইন্দ্রজালে মুগ্ধ হয়ে এই রাত এবং রাতের প্রকৃতি নিয়ে আসুন একটু ভাবি। নত মস্তকে সিজদায় লুটোই আল্লাহর কুদরতি পায়ে।

লেখক : ইমাম ও খতিব

কসবা রেলস্টেশন মসজিদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

aminulislam[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close