ব্রেকিং নিউজ

বিশ্লেষণ

কোভিড-১৯-এর টিকা কতদূর

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

গত বছরের শেষভাগ থেকে করোনা সংক্রমণে বিধ্বস্ত সারা বিশ্ব। এই অতিমারির প্রকোপ থেকে মুক্তি পেতে চাই ভ্যাকসিন। বহু দেশেই চলছে সেই প্রচেষ্টা। কোনো কোনো দেশ দাবি করছে, তারা এই প্রতিষেধক তৈরিতে অনেকটা পথ এগিয়ে গেছে। কিন্তু সত্যিই কোথায় দাঁড়িয়ে আছে করোনা ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়া! করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন পথে এগোচ্ছে। এরমধ্যে বিগত করোনাভাইরাস মহামারির সময়ে অর্জিত জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে একদল গবেষণা করছে। আরেক দল ইবোলার মতো অন্য মহামারিগুলো থেকে নেওয়া শিক্ষাকে কাজে লাগাচ্ছেন। কিন্তু একটি কার্যকর ভ্যাকসিন পেতে কত দিন অপেক্ষা করতে হবে? বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৫ কোটি ছাড়িয়ে যাবেÑ এমন পরিস্থিতিতে সবাইকে সচেতন থাকতে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। যদিও করোনায় বিপর্যস্ত বিশ্ববাসী অপেক্ষায় আছে কবে নাগাদ এ প্রতিষেধক তৈরির সুখবর দেবেন বিজ্ঞানীরা সেই আশায়। এরই মধ্যে ডব্লিউএইচও বলছে, যত শিগগিরই সম্ভব করোনা ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা চলছে। তবে ঠিক কবে নাগাদ এই ভ্যাকসিন বাজারে আসবে; সে বিষয়ে নিশ্চিত করতে পারেনি সংস্থাটি। করোনাভাইরাসের তান্ডব এখনো চলছে। বিশ্বজুড়ে ইতোমধ্যে সাড়ে তিন কোটিরও বেশি লোক আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গেছে সোয়া ১০ লাখেরও ওপর। সংক্রমণ ঠেকাতে যত রকমের পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব, তা নেওয়া হয়েছে। তার পরও মহামারি ও মৃত্যুর মিছিল ঠেকানো যাচ্ছে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে করোনায় ২০ লাখ লোক মারা যাবে। এই রোগ প্রতিরোধে তাই একমাত্র ভরসা এখন ভ্যাকসিন বা টিকা। তাই সবাই এখন টিকার অপেক্ষায় বসে আছে, যাতে তারা কোভিড-১৯-এর হিংস্র ছোবল থেকে রক্ষা পেতে পারে। অবশ্য দুনিয়াজুড়ে কোভিডের টিকা নিয়ে যে উন্মাদের মতো গবেষণা চলছে, তা থেকে যদি কার্যকর টিকা বের হয় এবং যদি সেই টিকা পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষকে দেওয়া যায় ও যদি টিকাপ্রাপ্ত লোকদের শরীরে সত্যিকার অর্থে এ রোগের প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে, তবেই সেই টিকার অর্থ আছে। আজ ওষুধ ও বায়োটেক কোম্পানিগুলো ১০০রও বেশি কোভিড-১৯ টিকা উদ্ভাবন করেছে এবং তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। এই সুবিশাল বৈশ্বিক উদ্যোগের পেছনে বিভিন্ন দেশের সরকার শত শত কোটি ডলার ঢালছে। ১৯৫০-এর দশকে পোলিওর পর থেকে বিশ্ব পরিসরে এত বিশাল কর্মযজ্ঞ আর দেখা যায়নি। কোভিড-১৯ চিহ্নিত হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে চীনারা ১০টি সম্ভাবনাময় ভ্যাকসিন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছিল। এখন কয়েকটি টিকা অনুমোদন পাওয়ার আগে পরীক্ষার চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। তবে রাশিয়াই প্রথম মানবদেহে ব্যাপক পরিসরে টিকার প্রয়োগ শুরু করেছে-এমনকি চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার আগেই। তবে স্পুটনিক নামে রাশিয়ার এই টিকা মানবদেহের জন্য কতটা নিরাপদ এবং কতটাইবা রোগ প্রতিরোধে কার্যকর, তা নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে প্রশ্ন আছে। চীনের সিএনবিজি ও তার অভিভাবক কোম্পানি সিনোফার্মের টিকা পরীক্ষার তৃতীয় পর্যায়ে থাকা অবস্থায় চূড়ান্ত অনুমোদনের আগেই ব্যাপক পরিসরে মানবদেহে প্রয়োগ শুরু হয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে তিনটি করোনা টিকার শেষ পর্যায়ের পরীক্ষা চলছে সুস্থ ভলান্টিয়ারদের শরীরে। ইতালি, জাপান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতসহ অন্যান্য দেশও নিজ নিজ উদ্ভাবিত টিকা মানবদেহে পরীক্ষা শুরু করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অপারেশন ওয়ার্প স্পিড নামে যে টিকা কার্যক্রম চলছে তার লক্ষ্য হচ্ছে ২০২১ সালের জানুয়ারি নাগাদ ৩০ কোটি ডোজ সরবরাহ করা। সেজন্য মডার্না, অস্ট্রাজেনিকা, ফাইজার, সানোফি এবং জনসন অ্যান্ড জনসনসহ বিভিন্ন কোম্পানি চূড়ান্ত পর্যায়ে টিকা বের করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। একদিকে অর্থনীতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালু করার রাজনৈতিক প্রয়োজন এবং অন্যদিকে টিকা মানবদেহের জন্য নিরাপদ ও কার্যকর কি না তা প্রমাণের জন্য কঠোর বৈজ্ঞানিক ও নিয়ন্ত্রণমূলক প্রক্রিয়ার অপরিহার্যতাÑ এই দুইয়ের ক্রমবর্ধমান টানাপড়েনের মধ্যে টিকার বিষয়টি তাই বেশ স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরমধ্যে অস্ট্রাজেনিকা তাদের উদ্ভাবিত টিকার তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা কিছুদিন স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়। কারণ যাদের দেহে এই টিকা প্রয়োগ করা হয়েছিল তাদের একজন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে যার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। অবশ্য সাধারণভাবে টিকার প্রযুক্তি এত বিকশিত হয়েছে যে একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষার জন্য আগে যেখানে কয়েক বছর সময় লেগে যেত আজ সেখানে ৪২ দিনের মধ্যে সে কাজটা সম্পন্ন করা যাচ্ছে। ম্যাসাচুসেটসভিত্তিক মডার্না কোম্পানি ইতোমধ্যে তার প্রমাণ রেখেছে। তার পরও বলতে হয় যে, নতুন সংক্রমক রোগের টিকা বের করা চাট্টিখানি কথা নয়।

প্রায় চার দশক হলো এইচআইভি আবিষ্কৃত হয়েছে। অথচ এই ভাইরাস দমনের কোনো কার্যকর ভ্যাকসিন এখনো বের হয়নি। সার্স কভ-২ বিজ্ঞানী সমাজের কাছে এতই নতুন যে সংক্রমণ প্রতিরোধে মানবদেহের কী প্রয়োজন কিংবা এই প্রতিরোধের ব্যাপারটা আদৌ সম্ভব কি না, তা এখন পর্যন্ত পরিষ্কার নয়। কার্যকর টিকা শেষ পর্যন্ত যদি বেরও হয় তার পরও আরেকটি চ্যালেঞ্জ আছে। মাত্র এক ডোজ টিকাই সম্ভবত যথেষ্ট হবে না। বিশ্বের গোটা জনগোষ্ঠীর করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন দেশে ভ্যাকসিন লাগবে এবং সব কোম্পানিরই সহযোগিতার দরকার হবে। এটা একটা বৈশ্বিক সমস্যা এবং কোনো একক কোম্পানির হাতে এর সমাধান নেই। কারণ মহামারি থামাতে কোন ভ্যাকসিন কাজ দেবে, কতটা কাজ দেবে, কোনটাতে সর্বোত্তম ফল পাওয়া যাবে, তা কেউ জানেন না। একাধিক শ্রেণির ভ্যাকসিন থাকলেও সঠিক মানুষটিকে যে সঠিক সময়ে তা দেওয়া হবে তা নিশ্চিত করা সহজ হবে না। প্রায় প্রত্যেককেই এক মাস কি অনুরূপ সময়ের ব্যবধানে দুটি ডোজ নিতে হবে। কোন কোন টিকা উৎপাদন কারখানা থেকে শুরু করে ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করানোর আগ পর্যন্ত হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রায় রাখার প্রয়োজন হবে। প্রথম পর্যায়ে বিশেষ করে প্রথম কয়েক মাসে যে পরিমাণ টিকা উৎপাদিত হবে, তা সবাইকে দেওয়া যাবে না। সে ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ঠিক করা সব দেশের জন্যই একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। কোন কোভিড ভ্যাকসিন কতদূর কাজে দেবে, তা এক মস্ত প্রশ্ন। যুক্তরাজ্যে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অস্ট্রাজেনিকার যৌথ উদ্যোগে যে টিকা উদ্ভাবিত হয়েছিল মানবদেহে তার তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা চলাকালে একজন অসুস্থ হওয়ায় কিছুদিন পরীক্ষা বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরে আবার চালু হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী এ পর্যন্ত করোনার ১৭৯টি ভ্যাকসিন উদ্ভাবিত হয়েছে। তার মধ্যে ১৪৪টি প্রাক ক্লিনিক্যাল মূল্যায়নের স্তরে রয়েছে এবং ৩৫টি মানবদেহে পরীক্ষার ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে রয়েছে। কোভিড-১৯-এর ভ্যাকসিনগুলো সংক্রমণের বিরুদ্ধে যদি শতভাগ সুরক্ষা নাও দিতে পারে তার পরও এগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়ার দিকে বিশাল গতিবেগ সঞ্চার করতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা কার্যকর ও নিরাপদ টিকা পাওয়া গেলে কোভিড নিয়ে যে টানা আতঙ্ক চলছে, তা থেকে অনেকটা মুক্তি পাওয়া যাবে। এই মুক্তিলাভ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আতঙ্ক দূর হলে আবার আমাদের মনে আশা জাগাবে। আবার আমরা সূক্ষ্ম সমাজ নির্মাণ করতে পারব। আবার আমরা জীবনকে উপভোগ করতে পারব। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের গতি থামাতে সারা বিশ্বেই ভ্যাকসিন তৈরির তোড়জোড় চলছে। সাধারণত একটি ভ্যাকসিন মানুষের শরীরে প্রয়োগের জন্য উন্মুক্ত করতে দুই তিন বছর লেগে যায়। সেখানে করোনার ভ্যাকসিন এ বছরই প্রয়োগ যোগ্য করার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় গবেষকরা ভ্যাকসিনের জন্য ২ কোটি পাউন্ডেরও বেশি নগদ অর্থ অনুদান পেয়েছেন। সব ঠিক থাকলে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই কমপক্ষে ১০ লাখ মানুষকে এ ভ্যাকসিন দেওয়া যাবে। ইম্পেরিয়াল কলেজ অব লন্ডনে গবেষকরাও এমনটি ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করেছেন। সেটিও এ বছরের শেষ নাগাদ মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা শুরু হতে পারে। তারা সরকারের যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছেন। বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, করোনার ভ্যাকসিন তৈরিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর তরফে যে সমর্থন মিলছে, তা এক কথায় অভূতপূর্ব।

কিন্তু তা সত্ত্বেও ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ের আগে কারো পক্ষেই ভ্যাকসিন বাজারে আনার সম্ভাবনা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, প্রতিষেধক হাতে আসতে দেরি হচ্ছে। কিন্তু অন্যান্য রোগের ভ্যাকসিন তৈরির চেয়ে ঢের আগে করোনার প্রতিষেধক বাজারে আসতে চলেছে। যদিও তা নিশ্চিতভাবে কার্যকরী হবে কি না, তা হলফ করে কেউই বলতে পারবেন না।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"