পর্যবেক্ষণ

প্রোপাগান্ডা : রাজনীতিতে বহুল চর্চিত কৌশল

রায়হান আহমেদ তপাদার

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

গত কয়েক দশকে আমরা এমন কিছু কাজ করতে পেরেছি, যেগুলোকে মানবজাতির কল্যাণকর অবদান হিসেবে বিবেচনা করা যায়। দুর্ভিক্ষ নিরসন, মহামারি নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধের হার কমিয়ে আনা এগুলোর মাঝে অন্যতম। কিন্তু এসবের পাশাপাশি অন্য যেকোনো সময়ের থেকে বর্তমান সময়ে পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীর অবস্থা অধিকতর শোচনীয় পর্যায়ে নেমে এসেছে। মানবতা, উদারতার যেসব মহৎ বুলি আমরা চারপাশে সম্প্রতি শুনতে শুরু করেছি; সেসব নিতান্তই নতুন এবং ভবিষ্যতে কত দিন সেসব শুনতে পারব, সে ব্যাপারেও আমরা সন্দিহান। তার ওপর বর্তমানে মানুষের বিস্ময়কর কাজকর্ম করার ক্ষমতা থাকলেও আমরা ঠিক জানি না আমাদের লক্ষ্য কী এবং দিনকে দিন আমরা ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি। আমরা ডিঙি নৌকা থেকে অগ্রসর হয়ে বানিয়েছি বাষ্পচালিত জাহাজ, নির্মাণ করেছি অত্যাধুনিক মহাশূন্যযান, কিন্তু কেউ জানেন না মানবজাতির গন্তব্য কী। অন্য যেকোনো সময়ের থেকে মানুষ আজ অনেক বেশি ক্ষমতাধর, কিন্তু এতসব ক্ষমতা দিয়ে তার কী করা উচিত; সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই বললেই চলে। এর চেয়েও ভয়াবহ ব্যাপার হলো, আজকের মানুষ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বজ্ঞানহীন। আজকে মানুষ নিজেই নিজের ঈশ্বর, তাকে সঙ্গ দেওযার জন্য আছে কেবল পদার্থবিজ্ঞানের কিছু সূত্র, কিছু প্রাকৃতিক নিয়মকানুন। এ ছাড়া সে আজ আর কারো কাছে দায়বদ্ধ নয়। আর একটু বেশি সুখ আর একটু বেশি আমোদের জন্য আমরা আমাদের আশপাশের প্রাণিকুলের জীবন ও পরিবেশের প্রতি ক্রমাগত হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছি। এত কিছুর পরও কিন্তু আমরা তৃপ্ত নই, সন্তুষ্ট নই। আমরা অতৃপ্ত, অশান্ত।

বিশ্বরাজনীতিতে এক বহুল চর্চিত একটি কৌশল হলো প্রপাগান্ডা। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এর কোনো বিকল্প নেই। গত শতকে ঠান্ডাযুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একে অপরের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করেছে। কাছাকাছি সময়ে প্রপাগান্ডায় সফল ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ইরাক ও লিবিয়ায় হামলার আগে আগে সফল প্রপাগান্ডা করে জনমত পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। আমরা ইরাকের গণবিধ্বংসী অস্ত্রের গল্প শুনেছি। লিবিয়ার গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু ইরাক ও লিবিয়া এখন বিরান ভূমি। সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা ব্রায়ান রেমন্ড মনে করছেন, রাশিয়া, ইরান ও চীনের প্রচারণার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কুলিয়ে উঠতে পারছে না। সম্প্রতি ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন গত শতকের ঠান্ডাযুদ্ধের কৌশল অবলম্বন করে রাশিয়া, ইরান ও চীনকে সাইবারযুদ্ধে মোকাবিলা করতে চাইছে। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রপাগান্ডা পরিচালনার অন্যতম হাতিয়ার ছিল গণমাধ্যম। সঙ্গে বইপুস্তকও প্রকাশিত হতো প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় ও থিংকট্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হতো। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের নথি চুরি করত। গণমাধ্যমে ওই গোপন দলিল সরবরাহ করে প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করত। অনেক সময় ভুয়া নথিকেই আসল নথি বলে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে প্রচারণায় লিপ্ত হতো যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম। জনমতের ইস্যু তৈরি করে দিত পশ্চিমাদের গণমাধ্যম। এখন উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের নথি ফাঁস হচ্ছে। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ লোকদের ই-মেইল হ্যাকড হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রতিপক্ষ হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইল হ্যাকড হয়েছিল। এর সঙ্গে রাশিয়া জড়িত বলে যুক্তরাষ্ট্র বারবারই অভিযোগ করেছে। নির্বাচনের ফল নির্ধারণে রুশ গুপ্তচরদের হাতিয়ে নেওয়া তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে অভিযোগ আছে। ৭০ হাজার বছর আগেও মানুষ ছিল প্রাণিজগতের আর দশটা প্রাণীর মতো সাধারণ একটি প্রাণী। তাদের বিচরণও সীমাবদ্ধ ছিল কেবল আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যেই। পরবর্তী সময়টুকুতে মানুষ হয়ে উঠেছে সব পৃথিবীর শাসক এবং তাবৎ পৃথিবীর বাস্তুসংস্থানের জন্য হুমকিস্বরূপ। আজ মানুষ নিজেই ঈশ্বর হয়ে ওঠার দ্বারপ্রান্তে, চিরজাগ্রত তারুণ্যকে সে কেবল গ্রাসই করতে চাইছে না, সৃষ্টি এবং ধ্বংসের মতো স্বর্গীয় ক্ষমতাগুলোকেও নিজের আয়ত্তে আনার জন্য সে বদ্ধপরিকর। দুঃখজনক হলেও সত্যি, পৃথিবীতে এত দিন রাজত্ব করেও মানুষ খুব একটা বেশি কিছু করতে পারেনি; যা নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি। পুরো সময়টাজুড়ে মানুষ তার চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে পেরেছে, বাড়িয়েছে খাদ্যের উৎপাদন, নির্মাণ করেছে নগর-সাম্রাজ্য এবং বিশাল, বিস্তৃত ব্যবসায়িক ক্ষেত্র। কিন্তু এতসব কাজ কি পৃথিবীতে ব্যক্তি মানুষের দুঃখ-কষ্ট-অশান্তির নিরসন ঘটাতে পেরেছে? ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে, মানুষের অর্জিত বিপুল ক্ষমতা মানুষের জন্য নিয়ে এসেছে কান্না-হাহাকার-ধ্বংসযজ্ঞ। মানুষের নিজের মানসিকতার উন্নতি তো তেমন হয়ইনি, বরং মানুষের কারণে অন্যান্য প্রাণীর জীবন ক্রমাগত দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস বিভাগ শতাধিক ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিয়েছে।

এসব ওয়েবসাইটে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা চালানো হতো। জাস্টিস বিভাগ সন্দেহ করছে, ওয়েবসাইটগুলোর সঙ্গে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের সম্পর্ক রয়েছে। ইরান ছাড়াও সৌদি আরব, থাইল্যান্ড, রাশিয়া, কিউবা ও উত্তর কোরিয়া থেকে এ ধরনের হাজার হাজার ওয়েবসাইট পরিচালনা করা হচ্ছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস বিভাগের সন্দেহ। উল্লিখিত দেশগুলোর সরকারের সহায়তায় ওয়েবসাইটগুলো পরিচালনার অভিযোগ করছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যা অপপ্রচার, ইরানসহ অন্যান্য আরব দেশের ওয়েবসাইট পরিচালনাকারীরা বলছে, এটা সাইবার ক্রুসেড। প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা দিয়ে মোকাবিলা। তিন ফ্রন্টে যুক্তরাষ্ট্র এর মোকাবিলা করছে। একদিকে আরবের কয়েকটি মুসলিম দেশ, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনও পৃথক পৃথকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাইবারযুদ্ধে লিপ্ত। রাশিয়া মূলত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুবিধা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। চীন তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার দখল করছে। ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র চীনের টিকটক ও হুয়াওয়েকে নিষিদ্ধ করেছে। এসব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র খুব বেশি স্বস্তিতে নেই। সামরিক বিশেষজ্ঞরা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সাইবারযুদ্ধকে হুমকি বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনকে সতর্ক করে দিয়েছে। বিভিন্ন ওয়েবসাইটে যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে নিরীহ বেসামরিক লোকদের হত্যা, যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের নির্যাতনসহ বিভিন্ন বিষয়ে লাগাতার প্রচারণা চলে।

সবারই কমবেশি জানা, রাশিয়ার তথ্য চুরি ট্রাম্পকে জিততে সহায়তা করার জন্য বলেও অভিযোগ রয়েছে। এত দিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করত। তথ্য চুরি করত। এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিজেরই তথ্যই চুরি হচ্ছে, ফাঁস হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে এডওয়ার্ড স্নোডেন হুইসেল ব্লোয়ারের কাজ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকেও তথ্য হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব এবং এগুলো বাজারে ছেড়ে দিয়ে জনমত পাল্টে ফেলা সম্ভব। রাশিয়ার দেখানো পথেই হাঁটছে ইরান, চীনসহ অন্যান্য দেশ। তবে যার যার কৌশল ভিন্ন। চীন গত মাসে সাইবার সার্বভৌমত্বের ডাক দিয়েছে। চীন অভিযোগ করেছে, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের কথা বলে যুক্তরাষ্ট্র ভিন্ন দেশের নাগরিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে। চীন চায় জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি সাইবার নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া গড়ে তোলা হোক। চীন অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে অনেক এগিয়েছে। তাই চীন যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণায় জাতিসংঘের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে চায়। তবে ইরানের মতো অন্যান্য দেশ আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সাইবার যুদ্ধেই বেশি আগ্রহী। শুধু ইরান না, এই সাইবারযুদ্ধে আরবের অনেকেই যোগ দিয়েছে। নিয়মিতই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে হানা দিচ্ছে হ্যাকাররা। ওয়েবসাইটগুলো থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন তথ্য। এ লড়াইকে অনেকটা ধর্মযুদ্ধের মতোই মনে করছে আরব দেশগুলোর সাইবারযোদ্ধারা। এদের অনেকেই মনে করে, ফিলিস্তিনসহ আরবে অন্যায্য যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে পশ্চিমারা।

এমনকি ওয়েবসাইট ছাড়াও ফেসবুক ও টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া সমালোচনা করা হয়। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ট্রল ও প্রচারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রচারণা বা প্রপাগান্ডার পথটা দেখিয়েছিল রাশিয়া। সোভিয়েত আমল থেকে রাশিয়া শিক্ষা নিয়ে প্রচারণার কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। সোভিয়েত আমলে বিপ্লব ও বিপ্লবী তত্ত্ব এবং ধারণা দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করা সম্ভব বলে সোভিয়েত নীতিনির্ধারকরা মনে করতেন। কিন্তু রাশিয়া সে অবস্থান থেকে সরে এসে পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলই অবলম্বন করেছে। রাশিয়ার প্রথম পদক্ষেপ ছিল পশ্চিমাদের নিয়ে বিভ্রান্তিকর সংবাদ পরিবেশন করা। যেমন রাশিয়ার ট্যাবলয়েড কমসোমলিসকিয়া প্রাভদা ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ফরাসি রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ নির্বাচনী প্রচারণায় সমকামীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন। নির্বাচনের পরপর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ম্যাক্রোঁ ফ্রান্সকে ঘৃণা করেন। ২০১৬ সালে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদন আরব অভিবাসী দ্বারা এক রুশ-জার্মান মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যার সংবাদ প্রকাশ করে হইচই ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এই সংবাদগুলো ইউরোপের জন্য বিব্রতকর ছিল। এ ধরনের সংবাদ প্রচার করে রাশিয়ার গণমাধ্যমগুলো এখন জনসাধারণের আগ্রহের শীর্ষে অবস্থান করছে।

বিশ্বায়নের যদি কোনো জাদু থেকে থাকে, তাও ঠুনকো হয়ে গেছে। বিশ্ব পরিস্থিতির পর্যবেক্ষকরা সাপ্লাই চেইন পুনর্গঠনের কথা বলছেন, উৎপাদনের গ্লোবালাইবেশনের নিরাপত্তাহীনতা থেকে অধিকতর নিরাপদ লোকালাইজেশনের ওপর আবার দৃষ্টি নিবদ্ধ করছেন।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

 

"