জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

জল-জ্যোৎস্নায় শেয়ালের আনাগোনাহ

প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

তহিদুল ইসলাম

নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারিতে বিপর্যস্ত পুরো বিশ্ব। প্রাণঘাতী এই ভাইরাস মানবসভ্যতার জন্যও এক মহাবিপর্যয়। ইতোমধ্যে এই মহামারিতে আক্রান্ত হয়েছেন সোয়া চার কোটিরও বেশি মানুষ। আর মৃতের সংখ্যাও ১১ লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যেই প্রাদুর্ভাবের ১০ মাস পার হলেও কমার কোনো লক্ষণ নেই; বরং অনেক দেশে সংক্রমণ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। বদলে গেছে মানুষের জীবনাচরণ। তবে এই ভাইরাসটি প্রাণ-প্রকৃতির জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। মানুষ যেখানে ঘরমুখী হয়েছে, সেখানে পশুপাখিরা দখলে নিয়েছে লোকালয়। সামাজিক মাধ্যমে চোখ রাখলেই শহরের ব্যস্ত সড়কে হরিণের অবাধ বিচরণ, পর্যটকশূন্য সৈকতে ঝাঁকে ঝাঁকে ডলফিনের খেলাধুলা, জনশূন্য রাস্তায় নীলগাইয়ের লাফালাফির মতো দুর্লভ দৃশ্য চোখে পড়ে।

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আর সাংস্কৃতিক রাজধানীখ্যাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসে হেমন্তের আমেজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বরাবরের মতোই কাক্সিক্ষত অতিথি পাখির জলকেলিতে মুখর হয়ে উঠতে শুরু করে জলাশয়। দেখা মিলছে ঝাঁকে ঝাঁকে হাজারো বাহারি অতিথি পাখি। যদিও প্রাণ-প্রকৃতির জন্য বিখ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয় অন্য শিক্ষাঙ্গনের মতো প্রায় সাত মাস বন্ধ। বর্তমানে সীমিত পরিসরে দাফতরিক কাজ চললেও আবাসিক হল বন্ধ থাকায় ক্যাম্পাসে লোকসমাগমও নেই বললেই চলে। তা ছাড়া আগের মতো যানবাহনের হর্ন, কোলাহল আর ভ্রমণপিপাসুদের আনাগোনাও নেই। এই সুযোগে পশুপাখিদের বিচরণ বেড়েছে। রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় দেখা মিলছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কোভিড-১৯ ভাইরাসের আগে রাতে শিয়ালের ডাক শোনা গেলেও দেখা পাওয়া বেশ দুষ্কর ছিল। তবে এখন দিনেও হরহামেশা এই নিশাচর প্রাণীটি দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া হারিয়ে যেতে বসা বিশালদেহী সব গুঁইসাপও এখন অবাধে লোকালয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্থলে যেমন নিশাচর বনবিড়াল, মেছোবাঘ, গন্ধগোকুল, বাঘডাশার মতো প্রাণীদের দেখা মিলছে, বাচ্চাসমেত জলমোরগ, ছোট সরালির দেখা মিলছে লেকগুলোতে।

নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাজ্জাদুল আলম বলেন, লকডাউনের সময় বিকালে সাইকেল নিয়ে বের হলেই শিয়ালের দেখা মিলত। প্রায়ই দেখতাম রাস্তার ওপর দল বেঁধে বিচরণ করছে। লোকজন সেভাবে না থাকায় ওরা খুব সাহসী হয়ে উঠেছিল। দেখা যেত, ওদের দিকে যাচ্ছি অথচ সেদিকে ওদের ভ্রুক্ষেপ নেই। বাসার সামনে বিশালদেহী গুঁইসাপ দেখতাম। এত বড় গুঁইসাপ কখনো আমার চোখে পড়েনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. কামরুল হাসান জানান, প্রতি বছরই এই ক্যাম্পাসে ছোট সরালি আসে ও বাচ্চা উৎপাদন করে। তবে এ বছর এদের বাসা তৈরি করা এবং আনাগোনা এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। এত বেশি বাচ্চা দেওয়ার ঘটনা অতীতে দেখা যায়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত মার্চে বন্ধ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় এক জনমানবহীন এলাকায় পরিণত হয়। এটিই আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেয় বিচরণ ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে চাপে থাকা বুনো পশুপাখিদের জন্য। ঝোঁপঝাড় ছেড়ে লোকালয়ে আসতে শুরু করে প্রাণীরা। এমনকি যেসব প্রাণীর গত কয়েক বছরে দেখা যায়নি, সেসব প্রাণী এখন বিচরণ করতে দেখা গেছে। অনুকূল পরিবেশ থাকায় প্রাণীদের বংশবৃদ্ধিও লক্ষণীয় হারে বেড়েছে।

অধ্যাপক মো. কামরুল হাসান বলেন, পশুপাখিদের সংখ্যা যে হুট করে বেড়ে গেছে, এটা বলা যাবে না। এরা আগে থেকেই ছিল, তবে লোকজন কম থাকায় দৃষ্টিগোচর বেশি হচ্ছে। খোলা জায়গায় এদের বিচরণ বেশি হচ্ছে, এ কারণে চোখে পড়ছে। যেহেতু কোলাহল কম, লোকজনের চলাচল কমে গেছে, ফলে এদের আবাসস্থলের পরিমাণ বেড়ে গেছে। এরা খুব স্বাচ্ছন্দ্যে চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জীববৈচিত্র্যের দিক দিয়ে এটা জাহাঙ্গীরনগরের জন্য আশাব্যঞ্জক।

তবে ক্যাম্পাস খোলার পর যেন আবার পশুপাখিদের আবাস্থল হুমকির মুখে না পড়ে, সেদিকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এই বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে যখন লোকজন বাড়বে, প্রাণচাঞ্চল্য বাড়বে, তখন আমরা যেন ক্যাম্পাসের ঝোপঝাড়গুলো নষ্ট না করি, অকারণে পরিষ্কার না করি। এই জায়গাগুলোতে নিশাচর প্রাণীরা দিনের বেলা আশ্রয় নিয়ে থাকে, পাখিরা প্রজননের কাজে ব্যবহার করে। ফলে যতটুকু জায়গা আমরা বুনো হিসেবে রেখে দিয়েছি, সেসব জায়গা যেন প্রাণীদের বসবাসের অনুকূলে থাকে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। সবাই যদি বন্যপ্রাণীদের প্রতি সদয় হয়, তাহলে এখন যেসব প্রাণী দেখা যাচ্ছে, আগেও যারা ছিল, করোনার পরও তারা টিকে থাকবে।

 

 

 

"