জিয়াউদ্দিন রাজু

  ২৫ নভেম্বর, ২০২০

ঝুঁকির সামগ্রী অবাধে

রাজধানীতে বাসে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা হাত পরিশোধক বিক্রি করেন মো. আজাদ। আজিমপুর থেকে কুড়িলগামী একটি বাসে দেখা হলে জানতে চাওয়া হয় তার বেচা মাস্কগুলো কয় স্তরের। তিনি বলেন, এসব কিছুই তিনি জানেন না। হাতে থাকা স্যানিটাইজারের শিশির গায়ে লেখা নেই প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নাম। তবে তার পণ্যগুলোর বিক্রি বেড়েছে বলে তিনি জানান।

কারওয়ানবাজারে ভ্যানে করে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক, গ্লাভস, গগলস বা চশমা বিক্রি করেন শাহ আলমগীর। তিনি একটি বাসা থেকে এগুলো সংগ্রহ করেন। তবে ওই বাসার ঠিকানা বলতে নারাজ। তার কাছে থাকা স্যানিটাইজারের শিশির গায়ে দাম লেখা থাকলেও বিক্রি করেন তিনি দর-কষাকষি করে। কোনটি কোন কোম্পানির বা কী দিয়ে তৈরি সে বিষয়ে কোনো ধারণাই নেই তার।

শীতের শুরু থেকেই দেশে বাড়ছে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু। এ অবস্থায় জনগণকে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় বাধ্য করতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। ফলে চাহিদা বেড়েছে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা হাত পরিশোধকসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রীর। আর এ সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে এক ধরনের অসাধু ব্যবসায়ী। তাদের তৈরি করা মানহীন মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিই) অবাধে বিক্রি হচ্ছে রাজধানীর বিভিন্ন ফুটপাতে। এসব সামগ্রীর প্রধান টার্গেট স্বল্প আয়ের মানুষ। ফুটপাতে প্রকাশ্যে এসব সামগ্রী বিক্রি বাড়লেও কোনো নজরদারি নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা অন্য কোনো সংস্থার। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে মানুষ মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ নানা সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করছে। দাম কম হওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষ ফুটপাতের পণ্যগুলোই বেশি কিনে থাকে। কিন্তু মানহীন উপাদানে তৈরি হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও মাস্ক ভাইরাস থেকে সুরক্ষা দিতে পারে না বরং থেকে যায় স্বাস্থ্যঝুঁকি।

ফুটপাতে বিক্রি হওয়া স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার কতটুকু বাস্তবসম্মত জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘মানহীন সুরক্ষাসামগ্রী ভাইরাস থেকে সুরক্ষা দিতে পারে না বরং এগুলো ব্যবহারে রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে ব্যবহৃত মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার ফুটপাতসহ যেখানে সেখানে পাওয়া যায়। মানসম্মত হ্যান্ড স্যানিটাইজার ইথানল দিয়ে তৈরি হয় তবে ফুটপাতে যেগুলো পাওয়া যাচ্ছে তার বেশির ভাগই মিথানল দিয়ে তৈরি। ইথানল স্যানিটাইজারে জীবাণু মরে তবে মিথানল স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।’ মাস্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মাস্ক সাধারণত তিন স্তরের হলেই মানসম্মত হয়। তবে আমাদের ফুটপাতে খুবই নিম্নমানের মাস্ক বিক্রি হচ্ছে। এই করোনার মধ্যে এসব মাস্ক ব্যবহার করা উচিত নয়।’ তিনি বলেন, ‘মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার অবশ্যই নিয়মকানুন মেনে তৈরি করা এবং অনুমোদিত স্থানে বিক্রি করা উচিত। না হলে জনজীবন ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (এম আই এস) অধ্যাপক ডাক্তার হাবিবুর রহমান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘তিন স্তরের কাপড় দিয়ে মাস্ক তৈরি করলে ভালো। ফুটপাতে সবাই মানসম্মত মাস্ক বা স্যানিটাইজার বিক্রি করে তা হয়তো বলব না। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এগুলো নির্দিষ্ট একটা স্থানে তৈরি করে ফুটপাত পর্যন্ত নিয়ে ব্যবসা করে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলেই তৎক্ষণাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ে অভিযান পরিচালনার জন্য আমরা বলে থাকি।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া জানান, ‘ফুটপাতের এসব পণ্য দেখাশোনার দায়িত্ব ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের।’ তিনি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘আমরা সব সময় এগুলো তৈরির ক্ষেত্রে সঠিক নিয়ম নির্দেশনা দিয়ে থাকি তবে এগুলো দেখভালের দায়িত্ব ঔষধ প্রশাসনের। তারাই অভিযান পরিচালনা করে।’

রাজধানী বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, ফুটপাত অথবা ভ্রাম্যমাণ ভ্যান ও যাত্রীবাহী বাসে বিক্রি হচ্ছে স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রধান দুই সামগ্রী মাস্ক ও স্যানিটাইজার। বিভিন্ন ওষুধের দোকানে এবং নামসর্বস্ব অনলাইন শপেও পাওয়া যায় এসব পণ্য। কাপড় দিয়ে তৈরি এক বা দুই স্তরের মাস্ক বিক্রি হচ্ছে। ‘ইথানল’ দিয়ে স্যানিটাইজার তৈরির কথা থাকলেও তা তৈরি হচ্ছে বিষাক্ত ‘মিথানল’ দিয়ে। পিপিইগুলো দেখতে রেইনকোট কিংবা মশারির মতো।

পিডিএসও/হেলাল

ঝুঁকি,করোনাভাইরাস,সংক্রমণ
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়