সালাহ্উদ্দিন শুভ, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার)

  ১১ জুন, ২০২১

প্রকৃতির এক বিস্ময় ‘হামহাম’ জলপ্রপাত

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত হামহাম জলপ্রপাত। চোখ জুড়ানো এই দৃশ্য দেখতে পাবেন সেখানে টলমলে স্বচ্ছ পানির ধারা গড়িয়ে পড়ছে শক্ত পাথরের মতো পাহাড়ের শরীর লেপটে। নির্জন, শান্ত পাহাড়ের প্রায় দেড় শ’ ফুট উঁচু থেকে কলকল শব্দ বয়ে যাচ্ছে সমতলে। নাম না জানা লতাপাতা, গুল্ম, বাঁশবন, বুনোফুল ও ফলের গাছ আগলে রেখেছে পরম মমতায় সৃষ্টির এক বিস্ময়কে চোখ জুড়ানো ‘হামহাম জলপ্রপাত’। প্রায় ১৫০ ফুট বা তার অধিক উপর হতে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ পানি আছড়ে পড়ছে বড় বড় পাথরের গায়ে। সেই পানি থেকে সৃষ্ট জলকনা তৈরি করছে কুয়াশার আবরন।

বৃহস্পতিবার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা বিষয়ক ১০ দিনের কর্মশালার অংশ হিসেবে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, মৌলভীবাজারস্থ বিভাগীয় বনকর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর নেতৃত্বে হাম হাম জলপ্রপাতে যান- মৌলভীবাজারের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা মির্জা মেহেদী সরোয়ার, ফরেস্টার, বনপ্রহরী, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে স্বেচ্ছাসেবী সদস্য, শিক্ষক, সাংবাদিক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ ৩০ জন সদস্যরা।

হাম হাম জলপ্রপাত এটি মূলত ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তের কাছাকাছিতে অবস্থিত। এই সময়ে নয়নাভিরাম হামহাম জলপ্রপাত একনজর দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকদের আগমনে মুখরিত হয়ে উঠছে জলপ্রপাত এলাকা। দীর্ঘ পাহাড়ের আঁকাবাঁকা উঁচু-নিচু গহীন অরন্যের পথ বেয়ে এই জলপ্রপাত দেখতে প্রতিদিন আগমন ঘটছে বহু পর্যটকের। বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার পর্যটকদের ঢল নামে বেশি। যাওয়ার পথের দু-পাশের বনের দৃশ্য যে কোন পর্যটককে মুগ্ধ করতে সক্ষম। বন,পাহাড়, ঝিরিপথ দিয়ে যাওয়ার পথে দেখা মিলবে নানান ধরনের গাছগাছালি, বিভিন্ন পশু ও পাখির।

উপজেলার সীমান্তবর্তী চাম্পারায় চা বাগান পার হয়ে আসতে হবে কলাবন পাড়া। কলাবন গ্রামের শেষপ্রান্ত থেকে রাজকান্দি সংরক্ষিত বনের এলাকা শুরু। এই কলাবন থেকেই বনের মধ্যেই ট্র্যাকিং করতে হবে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। কলাবন পাড়া থেকে গাইড নিয়ে যেতে হবে। গাইড না নিলে রাস্তা হারিয়ে পড়তে পারেন মহা বিপদে। কারণ, রাস্তায় কোনো সমস্যা হলে কাউকে না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। পাথরের পাহাড়ের ঝিরি পথে হেঁটে যেতে যেতে সুমুধুর পাখির কলরব ও ঝিঝি পোকার শব্দে মনকে ভাললাগার অনুভূতিতে ভরিয়ে দেবে। এভাবেই হাটতে হাটতে একসময় পৌঁছে যাবেন আপনার কাক্ষ্খিত হামহাম জলপ্রপাতের কাছাকাছি। কিছু দূর এগুলেই শুনতে পাবেন হামহাম জলপ্রপাতের শব্দ।

সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৩৮ কি.মি. পূর্ব-দক্ষিণে রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কুরমা বনবিটের গহীন অরণ্যঘেরা দূর্গম পাহাড়ি আকাবাকা এলাকায় অবস্থিত এই জলপ্রপাতটি। এটির নাম ও উচ্চতা নিয়ে রয়েছে ভিন্নমত। স্থানীয় বাসিন্দারা একে 'হামহাম ঝর্না' বা অনেকে 'হাম্মাম' ঝর্না আবার কেউ হাম-হাম বলে ডাকে। এটির উচ্চতা কারো মতে ১৫০-১৬০ ফুট আবার কেউ ১৭০ ফুটের কথা বলেন। 

এদিকে ঘুড়তে আসা পর্যটক আহাদ মিয়া প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘কার না ভালো লাগে এই জায়গায় আসতে একটু কষ্ট হলেও ভালো লাগে ভেতরের ঝর্না দেখে। কিন্তু ,একটা বড় সমস্যা শুধু এখানে কোন হোটেল না থাকায়। আমরা সেখানে গিয়ে একজন বাবুর্চিকে দিয়ে রান্না করে ৩০ জন মানুষ খেয়েছি। যদি সেখানে কোন ভালো হোটেল থাকতো তাহলে ঘুরতে আসা পর্যটকদের জন্য আর কোন সমস্যা হতো না। তিনি আরও বলেন, যদি সেখানকার উপজেলা প্রশাসন হোটেল মোটেল ও থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতেন তাহলে পর্যটন শিল্পে আরও উন্নতি হবে।’

এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন ও সাংবাদিক রুহুল ইসলাম হৃদয় প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, ‘ভোর হতেই এখানে পর্যটকরা আসতে থাকেন। কিন্তু সবাই হামহাম যাওয়াতে সফল হননা। অনেকেই ফিরে আসেন কিছু রাস্তা পাড়ি দেয়ার পর। শিক্ষক ও সাংবাদিক আরও বলেন, রাস্তায় কয়েক দফায় বেশ কিছু আগত পর্যটক ক্লান্ত হয়ে কাঙ্গিত হামহাম ঝর্ণা না দেখেই বাড়ির পথে রওয়ানা দিচ্ছেন। মূলত তরুণরাই হামহাম যাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে। ঘুরতে আসা পর্যটকদের মধ্যে ৮০ ভাগই তরুণ-তরুণী। দৃঢ় মনোবল থাকলে হামহাম ঝর্ণার রূপ দেখা সম্ভব বলে মনে করেন তারা। কিন্তু এই সময়ে এখন হাম হাম জলপ্রপাতে পানি নেই, আরও কিছুদিন পর ঝর্নার পানি স্বাভাবিক ভাবে পড়তে দেখা যাবে।’

পিডিএসও/ জিজাক

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
জলপ্রপাত,হামহাম
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close