ভাড়া বাসায় ‘চাকরির প্রস্তুতি’ নিচ্ছেন জাবি শিক্ষার্থীরা

বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় বেড়েছে ভাড়া বাসার চাহিদা

প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২০, ১৬:১১

তহিদুল ইসলাম, জাবি
ফাইল ছবি

নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারির কারণে আট মাস ধরে বন্ধ রয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। তবে সাম্প্রতিক কালে সপ্তাহে তিনদিন দাপ্তরিক কার্যক্রম চললেও স্ব-শরীরে ক্লাস-পরীক্ষা হচ্ছে না, বন্ধ রয়েছে আবাসিক হল। ফলে লম্বা সময় ধরে শিক্ষার্থীরা একাডেমিক কার্যক্রম থেকে কার্যত দূরে রয়েছেন। আর ক্লাস-পরীক্ষার চাপ না থাকায় তারা অলস সময়টাকে কাজে লাগাচ্ছেন ‘চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিতে’।

আর এজন্য শিক্ষার্থীরা বেছে নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকাগুলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী আশপাশের এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছেন। আর এতে করে এসব এলাকাগুলোতে ভাড়া বাসার চাহিদা বেড়ে গেছে।

আগে আবাসিক হল ছাড়ার পর সাবেক শিক্ষার্থীরা এসব এলাকায় থেকে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতেন। তবে দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় এখন বর্তমান শিক্ষার্থীরাও এখানে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছেন। এদের মধ্যে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও সদ্য স্নাতকোত্তর সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

বাংলা বিভাগের ৪৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী রিফাত হোসাইন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা এখন আশপাশের এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছে। এর প্রধান কারণ চাকরির পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি। করোনার কারণে এখন চাকরির পরীক্ষা সেভাবে হচ্ছে না। কিন্তু পরিস্থিতি ভালো হলেই পুরোদমে পরীক্ষা শুরু হয়ে যাবে। আর করোনার কারণে বিগত সময়ের তুলনায় চাকরির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বাড়বে বলে সবার ধারণা। ফলে কেউই বাড়িতে বসে সময় নষ্ট করতে চাচ্ছে না। তাছাড়া বাড়িতে পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়া যায় না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন গেরুয়া, ইসলাম নগর, আমবাগাম, পানধোয়া, বটতলা বাজার, জামসিং, রেডিও কলোনি, সাভার প্রভৃতি এলাকায় শিক্ষার্থীরা থাকছেন। তবে এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম পার্শ্বে অবস্থিত গেরুয়া, ইসলামনগর ও আমবাগাম এলাকায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। কেউবা দলবেঁধে মেস আকারে আবার কেউবা বিচ্ছিন্নভাবে রুম নিয়ে থাকেন। তবে ঠিক কত সংখ্যক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকছেন সে সম্পর্কে জানা যায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের অন্তত ১০ টি ভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। তাদের তথ্যমতে, ৪২ থেকে ৪৪ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রদের প্রায় সবাই ভাড়া বাসায় থাকেন। ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ৬০-৭০ ভাগ। এরপর ৪৫ থেকে ৪৮ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কম। তবে সব ব্যাচ মিলিয়ে এই সংখ্যাটা অন্তত অর্ধেক হবে বলে তাদের ধারণা।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, গত ঈদুল ফিতরের পরেই শিক্ষার্থীরা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকার উদ্দেশ্যে এসব এলাকায় আসতে শুরু করেন। যদিও কিছু শিক্ষার্থী করোনাকালেও এসব এলাকায় ছিলেন। তবে ঈদুল আযহার পর এই সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ে। আর যারা এতদিনেও আসেননি, তাদের অনেকে এখন থাকার জন্য বাসা খুঁজছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য ভাড়া বাসা খোঁজার সুবিধার্তে ইসলামনগর, আমবাগাম ও গেরুয়া এলাকাভিত্তিক ‘টু-লেট ফর জেইউইয়ানস্’ নামক একটি ফেসবুক গ্রুপ রয়েছে। এই গ্রুপে গত ১০ নভেম্বর থেকে পরবর্তী ১০ দিনের পোস্টগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪টি করে পোস্টে ফ্লাট, রুম বা সিটের সন্ধান চাওয়া হয়েছে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করলেই প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থীর দেখা মেলে, যারা আশেপাশে থাকেন। এদের কেউবা গল্প-গুজব করে অবসর কাটাতে আবার কেউবা পড়াশোনার কাজে তুলনামূলক ফাঁকা এই ক্যাম্পাসকে ব্যবহার করছেন। গত বৃহস্পতিবার আল-বেরুনী হলের সামনে পরীক্ষায় বসেছিলেন একদল শিক্ষার্থী।

এদের একজন ইতিহাস বিভাগের ৪৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী সালমান মোল্লা বলেন, করোনার কারণে লম্বা সময় ধরে বাড়িতে থাকায় পড়াশোনা সেভাবে হয়নি। ফলে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকায় কোরবানি ঈদের পরেই শিক্ষার্থীরা চলে এসেছেন। আর যারা আশেপাশে থাকছেন তাদের অনেকে এভাবে প্রায়ই গ্রুপ করে পরীক্ষায় অংশ নেন। সাধারণত ৩ থেকে ৬ দিন অন্তর অন্তর পরীক্ষাগুলো হয়। গ্রুপে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই নির্দিষ্ট সিলেবাস দিয়ে দেন, নিজেরাই প্রশ্ন করেন এবং নিজেরাই উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে নম্বর ঘোষণা করেন। এতে করে সিরিয়াসনেস বাড়ে এবং প্রস্তুতি ভালো হয়।

তবে সবাই যে শুধু চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতেই বাড়ি ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে অবস্থান করছেন তা নয়। অনেকে টিউশনি বা অন্য অনেক কারণেও থাকছেন।

সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের ৪৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী জামিনুর রহমান বলেন, পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তায় এখন অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের টিউটর দিয়ে পড়াচ্ছেন। ফলে যারা টিউশনি করে খরচ চালাতে পারেন তাদের অনেকে চলে এসেছে। পুরনো টিউশনি টিকিয়ে রাখতে আমাকেও চলে আসতে হয়েছে। আমি না আসলে অভিভাবকরা সন্তানদের অন্য কারো কাছে পড়াতেন।

শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলামের অভিজ্ঞতা আবার জামিনুরের মত সুখকর নয়। পড়াশোনার জন্য ঈদুল আযহার পরেই এই শিক্ষার্থী গেরুয়ায় অন্য ছাত্রদের সঙ্গে একটি ভাড়া বাসায় উঠেছেন। তবে পূর্বে যে টিউশনি করে খরচ চালাতেন করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সেটি হারিয়ে এখন আর্থিক সংকটে ভুগছেন।

তিনি বলেন, আগে যখন হলে থাকতাম, টিউশনি করতাম। তা দিয়েই চলত। এখন বাইরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছি। খরচ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। উল্টো টিউশনি নেই। করোনার কারণে অভিভাবকরা পড়াতে চাচ্ছেন না। আবার এই বয়সে বাড়িতে টাকা চাইতেও লজ্জা লাগে।

এদিকে এসব এলাকাগুলোতে শিক্ষার্থীদের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসা-বাড়ির মালিকরা ভাড়া বাড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা হলেও বাসা মালিকরা ব্যাচেলর ভাড়া দিতে অনিহা দেখাচ্ছেন। এতে করে উপযুক্ত বাসা পেতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

বাংলা বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী জোবায়ের হোসেন বলেন, গেরুয়া, ইসলামনগর ও আমবাগাম এলাকায় এখন বাসার চাহিদা পূর্বের যেকোন সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে চাহিদা বেশি থাকায় বাড়িওয়ালারা ভাড়া বাড়িয়েছেন। আগে যে রুম ৩ হাজার টাকায় পাওয়া যেত এখন সেটা হয়ে গেছে ৫ হাজার টাকা। তার উপর বাসা মালিকরা ব্যাচেলর ভাড়া দিতে চায় না।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী থাকায় মাঝেমধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনার ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি আমবাগামে স্থানীয় কিশোরদের সঙ্গে সংঘর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী আহত হন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নিরাপত্তা প্রহরীর সাথে এক শিক্ষার্থীর বিতণ্ডাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধনও হয়েছে।

এসব ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয় সে বিষয়ে সজাগ থাকতে শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ উল হাসান। তিনি বলেন, স্থানীয় কোন সমস্যায় যেন শিক্ষার্থীরা জড়িয়ে না পড়ে সেদিকে শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি রাখতে হবে। কারণ ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোন ঘটনার সূত্রপাত হলেও পরে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক রূপ লাভ করে। আর জায়গাগুলো যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে অবস্থিত, আমাদেরও হস্তক্ষেপ করার এখতিয়ার থাকে না।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মো. নূরুল আলম বলেন, করোনার মধ্যে আবাসিক হলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব না। একারণে যেহেতু হল খুলে দেয়া সম্ভব না। আমি বলবো যে যেখানেই থাকুক ভালোভাবে থাকুক। ভালোভাবে পড়াশোনা করুক।

পিডিএসও/এসএম শামীম